নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য, মন্ত্রিসভা ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ আজ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আজ শপথ নেবেন। একই সঙ্গে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি সরকার গঠন করবে এবং নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরাও শপথ নেবেন।
বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার এ উপলক্ষে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় দুই পর্বে এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হবে। এই আয়োজনকে দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংসদ সচিবালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে নির্বাচিত এমপিরা শপথ নেবেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দীন তাদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি গতকাল সাংবাদিকদের জানান, সংসদ সদস্যরা 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ' এর সদস্য হিসেবে আলাদা শপথ গ্রহণ করবেন। জুলাই সনদের আলোকে এই কাউন্সিল সংবিধানে সংস্কার আনবে।
তবে বিএনপির আইনপ্রণেতারা এখনই সংবিধান সংস্কার কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথ নাও নিতে পারেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ গতকাল গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধান সংশোধন চূড়ান্ত হওয়ার পর এমন শপথ হতে পারে।
পরে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, 'স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার না থাকায়, সিইসির নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ পড়ানোর সাংবিধানিক এখতিয়ার রয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার কাউন্সিলের শপথ পড়ানোর কোনো আইনি এখতিয়ার তার নেই।'
এই প্রথমবারের মতো মূল শপথ অনুষ্ঠান সংসদ ভবনের উন্মুক্ত দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজন করা হচ্ছে, যা প্রতীকী তাৎপর্য বহন করছে।। বিশ্লেষকরা একে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হিসেবে দেখছেন। এর আগে এখানে জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির জানাজা এবং খালেদা জিয়ার জানাজাও এই স্থানেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
বিকেলে দ্বিতীয় পর্বে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নেবেন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও অন্য মন্ত্রীদের শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি। শেখ হাসিনার শাসনামলে নিয়োগ পাওয়া বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। শপথের পরপরই মন্ত্রিসভা কার্যকর হবে এবং নতুন সরকারের অধীনে সচিবালয় কাজ শুরু করবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান জানিয়েছেন, নতুন মন্ত্রীদের জন্য সরকারি বাসভবন প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে, সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে।
গতকাল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি সাংবাদিকদের বলেন, অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে একাধিক সমন্বয় সভা হয়েছে এবং নিরাপত্তা, প্রটোকল ও বিদেশি অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে।
দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার অতিথি উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতা, সুশীল সমাজের সদস্য ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
দক্ষিণ প্লাজায় অস্থায়ী মঞ্চ, ভিভিআইপি গ্যালারি, শপথ-পরবর্তী অভ্যর্থনা এলাকা, মিডিয়া কর্নার ও নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এক জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
গতকাল সংসদ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিকেলে প্রায় ১০০ কর্মী মঞ্চ সাজানো ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন। নিরাপত্তা ও সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি বিএনপি প্রতিনিধিদেরও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করতে দেখা গেছে।
পরিদর্শনকালে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সাংবাদিকদের বলেন, প্রথমবারের মতো খোলা জায়গায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে দল বিশেষভাবে উচ্ছ্বসিত।
জনগণের রায়কে আমানত উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'একটি দেশপ্রেমিক সরকার হবে, সম্পূর্ণভাবে জনগণের সরকার হবে। দায়িত্ব নিয়েই সকলের এই আমানত শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে যেন আমরা রক্ষা করতে পারি— সেই দায়িত্বটুকু আমরা পালন করবো। জনগণের পাশে থেকে আমরা তারেক রহমানের নেতৃত্বে কাজ করছি এবং করবো, ইনশাআল্লাহ।'
তিনি আরও বলেন, সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হবে এবং তা করা কঠিন হবে না।
নতুন মন্ত্রিসভা
নতুন মন্ত্রিসভার আকার নিয়ে আলোচনা চলছে। গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভার জন্য মোট ৩৭টি সরকারি বাসভবন প্রস্তুত করা হয়েছে—৩৬টি মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর জন্য এবং একটি প্রধানমন্ত্রীর জন্য। এর মধ্যে ২৪টি বাংলো এবং ১২টি অ্যাপার্টমেন্ট, যা বেইলি রোড, মিন্টো রোড ও হেয়ার রোড এলাকায় আছে। এই এলাকা ঢাকার 'মন্ত্রিপাড়া' নামে পরিচিত। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন এখনো চূড়ান্ত হয়নি; এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে নতুন সরকার।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, টেকনোক্র্যাট এবং তরুণ নেতাদের সমন্বয় থাকতে পারে। দলের চেয়ারপার্সন তারেক রহমান গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়—যেমন অর্থ, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার এবং শিক্ষা—এর জন্য যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগে বিশেষ নজর দিচ্ছেন।
