জোট নিয়ে দোটানা: নির্বাচন সামনে এখনও সিদ্ধান্তহীনতায় এনসিপি
আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দিন যত এগোচ্ছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মীরা আসনভিত্তিক প্রার্থী নির্ধারণ ও মাঠ গোছানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। বড় দুই দল বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অধিকাংশ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করে প্রচারণায় নেমে পড়লেও, জুলাই অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এ দিক থেকে এখনও বেশ পিছিয়ে। আসনভিত্তিক এনসিপির প্রার্থীদের এখনো তেমনভাবে প্রচারণায় যেতে দেখা যাচ্ছে না।
জোটে না গিয়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে এনসিপি। এ অনিশ্চয়তা দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঝে দ্বিধা তৈরি করেছে। দলীয় সূত্র বলছে, এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের ঘোষণা চলতি সপ্তাহেই আসতে পারে। এরপরই প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নামতে পারবেন।
গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ক্ষমতা বা আসন–বণ্টনে এনসিপি কোনো আপস করবে না এবং তারা ৩০০ আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিয়েছে। মনোনয়নপত্র জমাদানের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে ১,৪৮৪টি ফরম বিক্রি করেছে এনসিপি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, "আসনের ক্ষেত্রে আমরা কখনো আপস করব না। কারও সঙ্গে আলোচনা বা জোটে গেলে তা আমরা প্রকাশ্যেই বলব—এখানে গোপন কিছু নেই। আমরা অভ্যন্তরীণ ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় অংশ নিচ্ছি, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ। গণমাধ্যমকে অনুরোধ করছি, এসব আলোচনা বিকৃতি ছাড়া ন্যায়সংগতভাবে উপস্থাপন করার জন্য।"
পরোক্ষভাবে বিএনপি ও জামায়াতকে ইঙ্গিত করে নাহিদ বলেন, আগাম ঠিক করা জোট বা প্রভাবিত নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং জুলাই আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া জনগণের প্রত্যাশাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
জোটের বিষয়ে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে। আমাদের প্রত্যাশার সঙ্গে যাদের অবস্থান সবচেয়ে বেশি মিলবে, শেষ পর্যন্ত তাদের সঙ্গেই জোটে যাওয়া হতে পারে। আমাদের মূল চাওয়া—গণতান্ত্রিক আচরণ, দলের স্বচ্ছতা এবং সংস্কারের বিষয়ে অঙ্গীকার।"
তিনি বলেন, "বিএনপি গণতান্ত্রিক হলেও তাদের দলে চাঁদাবাজি ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ আছে। সংস্কারের বিষয়েও বেশ কিছু জায়গায় ভিন্নমত রয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতে সততা ও স্বচ্ছতা থাকলেও দলটি গণতান্ত্রিক নয়। তবে সংস্কারের অধিকাংশ বিষয়ে তারা একমত।"
তাই শেষ পর্যন্ত যাদের সঙ্গে এনসিপির মিল বেশি হবে, তাদের সঙ্গেই জোটবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে বলে জানান নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
এদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার একটি আসনে মনোনয়ন সংগ্রহ করা এক এনসিপি প্রার্থী টিবিএসকে বলেন, "বিএনপি বা জামায়াতের সঙ্গে জোট হবে কি না—এই অনিশ্চয়তার কারণে আমরা রাজনৈতিক মাঠে পিছিয়ে যাচ্ছি। দল থেকেও প্রচারণার জন্য কোনো 'গ্রিন সিগনাল' পাচ্ছি না। কারণ, শেষ পর্যন্ত যদি জোট হয় বা আসন সমঝোতা হয়, তাহলে অন্য আসন থেকেও নির্বাচন করতে হতে পারে। কিন্তু বড় দুই দল বিএনপি ও জামায়াত নির্বাচনী প্রস্তুতিতে অনেক এগিয়ে গেছে।"
এনসিপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে বেশ কিছু বিষয়ে সমঝোতার আলোচনা চলছে। তাদের দাবি, গণতান্ত্রিক চর্চা, স্বচ্ছতা, চাঁদাবাজিমুক্ত সংগঠন ও জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কার—এই নীতিগুলোকে যারা বেশি গুরুত্ব দেবে, এনসিপি শেষ পর্যন্ত তাদের সঙ্গেই জোটে যেতে আগ্রহী।
তবে দলীয় সূত্র জানায়, এনসিপি কোন দলের সঙ্গে জোট করবে তা মূলত নির্ভর করছে কোন দল কত আসন ছাড়তে প্রস্তুত। এক্ষেত্রে জামায়াত এনসিপিকে প্রায় ৫০টি এবং বিএনপি প্রায় ২০টি আসন দেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে আলোচনা হয়েছে।
এনসিপির শীর্ষ এক নেতা টিবিএসকে বলেন, "বিএনপির সঙ্গে অনেক বিষয়ে আমাদের ভিন্নমত রয়েছে। তাই শেষ পর্যায়ে জামায়াতের সঙ্গে জোট হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে দলের একটি অংশ জামায়াতের সঙ্গে জোটে যেতে রাজি নয়। কিন্তু বিএনপির সঙ্গে গেলে খুব বেশি আসন ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই। জামায়াতের ক্ষেত্রে প্রায় ৫০টি আসন নিয়ে আলোচনা চলছে।"
দলের একাধিক নেতা আশঙ্কা করছেন, এরকম সিদ্ধান্তহীনতা চলতে থাকলে এনসিপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যেতে পারেন—একাংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকবেন, আরেকাংশ জামায়াতের দিকে এবং বাকিরা স্বাধীনভাবে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেবেন। এতে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী অনেকেই অনানুষ্ঠানিকভাবে অন্য দলে যোগ দেওয়ার দিকেও ঝুঁকতে পারেন।
এনসিপির সম্ভাব্য অনেক প্রার্থী শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, অনিশ্চয়তার কারণে তারা স্থানীয় সংগঠকদের সঙ্গে দেখা করতে পারছেন না, ঘরে ঘরে প্রচারণায় যেতে পারছেন না, এমনকি ভোটারদের কাছেও নিজেদের পরিচয় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আসন বণ্টনের সিদ্ধান্তের পর যদি তাদের অন্য আসনে পাঠানো হয়, তাহলে আগাম প্রচারণার সব প্রস্তুতি অকেজো হয়ে যাবে।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী টিবিএসকে বলেন, "আমরা প্রথম ধাপে প্রায় ১০০টি আসনের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করব এবং পরে ধাপে ধাপে বাকি তালিকা দেওয়া হবে। এখানে আমরা সৎ, গ্রহণযোগ্য ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের প্রাধান্য দিচ্ছি। যারা হাসিনার পাতানো ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের তালিকার বাইরে রেখেই আমরা প্রার্থী বাছাই করব।"
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত এনসিপির জন্য এ নির্বাচনে ঝুঁকি বেশ বড়। অভ্যুত্থানটি প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে নতুন শক্তির জন্য জায়গা তৈরি করেছিল। তবে এখন নির্বাচন সামনে সিদ্ধান্তহীনতায় দলের প্রথম সারির নেতাদের প্রভাব ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক সমীকরণের এই সময়ে এনসিপির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জুলাই অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
