গ্রামীণ ঋণে এনজিওর প্রাধান্য বাড়ছে, কমছে কৃষি খাতের অংশ
গত দুই দশকে দেশের গ্রামীণ এলাকায় ঋণ নেওয়া পরিবারের হার ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে গত এক দশকে গ্রামীণ ঋণের মধ্যে কৃষি খাতের অংশ ২৫ শতাংশ থেকে কমে ১৬ শতাংশে নেমেছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে খাদ্যব্যবস্থায় অর্থায়নবিষয়ক এক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি) যৌথভাবে কর্মশালাটির আয়োজন করে। এতে সহায়তা দেয় আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা পরামর্শক গোষ্ঠীর (সিজিআইএআর) বেটার ডায়েটস অ্যান্ড নিউট্রিশন সায়েন্স কর্মসূচি।
গ্রামীণ এলাকায় নেওয়া প্রতি চারটি ঋণের তিনটিই আসে বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও পরিচালিত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে। মূল্যস্ফীতির প্রভাব বাদ দিলে এনজিওগুলোর দেওয়া ক্ষুদ্রঋণের মধ্যমা (মেডিয়ান) আকার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপও বেড়েছে।
এনজিওগুলোর ঋণে ফ্ল্যাট পদ্ধতিতে ১৫ শতাংশ সুদ বা সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়, যা কার্যকর হিসাবে প্রায় ২৭ শতাংশের সমান। অন্যদিকে, ব্যাংকঋণের গড় সুদহার প্রায় ১০ শতাংশ। আর স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিলে বছরে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে হয়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যয় করেন, এমন ঋণগ্রহীতার হার ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের মধ্যে এই হার ৭৯ শতাংশ।
এ ছাড়া এনজিও থেকে ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি মহাজনদের কাছ থেকেও ঋণ নিচ্ছেন, এমন ঋণগ্রহীতার হার ২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে।
ঋণ পেতে সমস্যায় ক্ষুদ্র কৃষকেরা
কর্মশালায় উপস্থাপিত গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, আধা একরের কম জমিতে চাষাবাদ করা কৃষকদের একরপ্রতি ঋণের পরিমাণ ২০১০ সালে ছিল ৬ হাজার টাকা, যা ২০২২ সালে বেড়ে ১৩ হাজার ৫০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, এ সময়ে তাদের ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
অন্যদিকে, ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে জমির মালিকানাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় নগদ টাকায় জমি ইজারা নিয়ে চাষাবাদ করা অনেক কৃষক ব্যাংকঋণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
কৃষিঋণের বেশির ভাগ অর্থ ব্যয় হচ্ছে সার, বীজ, গবাদিপশু কেনা ও জমি ইজারা নেওয়ার কাজে। বিপরীতে কৃষিকাজে যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়াতে বিনিয়োগ হচ্ছে খুবই কম।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, কৃষিকাজে যুক্ত ২ শতাংশেরও কম পরিবারের নিজস্ব ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার রয়েছে। অন্যদিকে, কৃষিযন্ত্রপাতি কেনার মোট খরচের মাত্র ২ থেকে ৭ শতাংশ অর্থায়ন করে ব্যাংকগুলো।
ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সূচিও কৃষকদের আয়ের মৌসুমি চক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ব্যাংক ও মহাজনদের কাছ থেকে নেওয়া কৃষিঋণের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রে ফসল কাটার পর এককালীন বা বছরে একবার ঋণ পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। অথচ এনজিওগুলোর দেওয়া ঋণের মাত্র ৪ থেকে ৬ শতাংশে এ ধরনের সুবিধা পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, কৃষি খাতের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদের অবদান ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। দেশে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে গবাদিপশুর মালিক ক্ষুদ্র কৃষকেরা হলেও কৃষিঋণের ৫ শতাংশেরও কম অর্থায়ন পায় এ খাত।
গবেষণায় দেখা গেছে, ছয় মাসে গরু মোটাতাজাকরণে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা অর্জন করা সম্ভব।
অর্থায়ন ব্যবস্থায় আরও বিস্তৃত সংস্কার চান বিশেষজ্ঞরা
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের বলেন, শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, খাদ্যপণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণসহ পুরো খাদ্যব্যবস্থায় অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব কৃষিকাজেও সহায়তা দিতে হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা চালু এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ঋণের বোঝা বাড়তে থাকলে কৃষকেরা কৃষিকাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।
ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (এমআরএ) নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ক্ষুদ্রঋণ খাতের পুঞ্জীভূত উদ্বৃত্ত ২০০৬ সালের ৩ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
তিনি ঋণের অর্থায়ন ব্যয় ও সার্ভিস চার্জ পর্যালোচনার আহ্বান জানান। ক্ষুদ্রঋণের সার্ভিস চার্জ ২৪ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সঞ্চয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো গেলে ঋণের খরচ কমানো সম্ভব।
কৃষিসচিব মো. সেলিম খান কৃষিযন্ত্রপাতি কেনার জন্য সহজে ঋণ পাওয়ার সুযোগ এবং ফসল কাটার মৌসুমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণ পরিশোধের সময়সূচি নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেন।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, শুধু ঋণের পরিমাণ বাড়ালেই কৃষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। এ জন্য ঋণের খরচ কমানো, পরিশোধের শর্তে নমনীয়তা আনা এবং কার্যকর ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
