টানা ছয় মাস ৫ শতাংশের নিচে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি
টানা ছয় মাস ধরে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ, এপ্রিলে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, মে মাসে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, জুনে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং জুলাইয়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম থাকার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণের কথা বলছেন ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদেরা। তাদের মতে, নতুন ব্যবসা ও বিনিয়োগ কম থাকায় ঋণের চাহিদাও কম। পাশাপাশি বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার না হওয়ায় নতুন সক্ষমতা তৈরিতে বড় অঙ্কের ঋণের প্রয়োজন হচ্ছে না।
এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে অভ্যন্তরীণ ভোগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি রয়েছে। চলতি বছর নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বেশি অর্থ ব্যয় করেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নীতি সুদের হারও বেশি। ফলে ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানো সম্ভব হচ্ছে না এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়েছে।
ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইন মনে করেন, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য গতি আসার সম্ভাবনা কম।
তিনি বলেন, "চাহিদা অনেক কমে গেছে। চাহিদা কম থাকার কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহারও কমে গেছে। যেহেতু বিভিন্ন খাতে বাজারে এখনও যথেষ্ট অব্যবহৃত সক্ষমতা রয়েছে, তাই চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে নতুন সক্ষমতা তৈরির জন্য বড় বিনিয়োগের প্রয়োজনও এখনই তৈরি হচ্ছে না। এ ধরনের বিনিয়োগ বাড়তে হয়তো আরও এক বছর সময় লাগতে পারে।"
সোহেল আর কে হুসেইন বলেন, "বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংকঋণ বা লিভারেজ ইতোমধ্যে অনেক বেশি। একই সঙ্গে গত চার-পাঁচ বছর ধরে অভ্যন্তরীণ ভোগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি রয়েছে। ফলে বড় আকারের নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ প্রকল্প এখনও সেভাবে দেখা যাচ্ছে না।"
লিভারেজ বলতে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব মূলধনের তুলনায় কী পরিমাণ ঋণ নিয়ে ব্যবসা বা বিনিয়োগ করছে, তা বোঝায়। উচ্চ লিভারেজ অর্থ বেশি ঋণনির্ভরতা।
সোহেল আর কে হুসেইন আরও বলেন, "বর্তমানে যে মূলধনী বিনিয়োগ হচ্ছে, তার বড় অংশই নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পরিবর্তে মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ বা বিদ্যমান সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য। সরকারি পর্যায়ে পণ্য, তেল ও গ্যাসসহ কিছু খাতে বিনিয়োগ রয়েছে। তবে বেসরকারি খাতে বিভিন্ন কারণে এখনও বড় ধরনের বা উল্লেখযোগ্য উন্নতি আমরা দেখতে পাচ্ছি না।"
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, "মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় নীতি সুদের হার আগের চেয়ে বেশি রয়েছে। তাই এখন ঋণ প্রবৃদ্ধি হঠাৎ করে বাড়ানোও তুলনামূলকভাবে কঠিন। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে হবে, তা না হলে নীতি সুদের হার কমানো সম্ভব হবে না। কারণ সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করা যাবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে।"
তিনি বলেন, "নির্বাচিত সরকার আসার পরও নতুন ব্যবসা করার জন্য ব্যবসায়ীরা আস্থা পাচ্ছেন না। তা ছাড়া দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যা এখন আবার প্রকট হয়ে উঠেছে। অবকাঠামোগত সমস্যা বলতে শুধু রাস্তাঘাট, বন্দর কিংবা সেতু নয়; জ্বালানির দামও অনেক বেড়েছে। আবার অনেক কারখানা বেশি দাম দিয়েও জ্বালানি পাচ্ছে না। ফলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বাড়ছে।"
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, বর্তমানে দেশের বড় শিল্পগ্রুপগুলোর অনেকেই চাপের মধ্যে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন কমিয়েছে, ফলে তাদের ব্যাংকঋণের প্রয়োজনও কমেছে।
তিনি বলেন, দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের সংকট চলছে। পাশাপাশি আগের সরকারের আমলে নানা অনিয়মের কারণে বর্তমানে ১৫টির কিছু বেশি ব্যাংকের অবস্থা ভালো থাকলেও বাকিগুলোর আর্থিক অবস্থা দুর্বল। ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও আগের তুলনায় কমেছে। ঋণের চাহিদা বাড়লেও অনেক ব্যাংক আগের মতো ঋণ দিতে পারবে না।
ব্যাংকঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উপায় কী
ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্প পুনরুজ্জীবিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন ব্যাংকারেরা।
তাদের মতে, এ জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, সুদের ব্যয় কমানো এবং নতুন বিনিয়োগকারী আনার মাধ্যমে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এতে ধীরে ধীরে ঋণের চাহিদাও বাড়বে।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, "মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে হবে, তা না হলে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে না।"
সোহেল আর কে হুসেইন বলেন, "বর্তমান আর্থিক সংকটের মধ্যে যেসব ঋণ এখনও পারফর্মিং, কিন্তু সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের কারখানা বন্ধ বা প্রায় বন্ধ হয়ে আছে কিংবা ব্যবসায়িকভাবে কঠিন অবস্থায় রয়েছে, তাদের পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এ জন্য নতুন বিনিয়োগকারী আনা এবং বিভিন্ন ধরনের সহায়তা বা প্যাকেজ প্রয়োজন।"
তিনি বলেন, রুগ্ণ শিল্পের জন্য নেওয়া ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ব্যাংকগুলো কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারলে তা গ্রাহকদের জন্য সহায়ক হবে। অনেক গ্রাহকের লিভারেজ বা ব্যাংকঋণের পরিমাণ অনেক বেশি এবং সুদের হারও বেশি। এ প্যাকেজের আওতায় সুদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো গেলে তাদের পরিচালন ব্যয় কমবে এবং ব্যবসা পুনরায় চালুর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে প্যাকেজটি বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগবে বলে মনে করেন তিনি। সোহেল আর কে হুসেইন বলেন, "যেসব প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি করা হয়েছে, সেগুলোর অবস্থা মূল্যায়ন করতে হবে, তাদের প্রয়োজন নির্ধারণ করতে হবে এবং গ্রাহকদেরও কিছুটা এগিয়ে আসতে হবে। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগবে।"
