বাসভাড়া থেকে কৃষিখাত: লিটারে ২০ টাকা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর চাপ ছড়াচ্ছে অর্থনীতিতে
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করা কোটি কোটি বাংলাদেশির জন্য লিটারপ্রতি জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা বৃদ্ধি— পারিবারিক বাজেটের ওপর আরও একটি নতুন বড় ধাক্কা হিসেবেই এসেছে।
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব কেবল ফিলিং স্টেশন বা জ্বালানি পাম্পগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; নিত্যদিনের যাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত বাসভাড়া, মোটরসাইকেল চালকদের বাড়তি জ্বালানি বিল, কৃষকদের অতিরিক্ত সেচ খরচ এবং চরম জ্বালানি সংকটে ধুঁকতে থাকা কারখানাগুলোর ওপর বাড়তি লজিস্টিকস ব্যয়ের বড় চাপ তৈরি করেছে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত আট মাসে এটি জ্বালানি তেলের দামে দ্বিতীয়বারের মতো বৃদ্ধি। এমন এক সংকটময় সময়ে এই দর সামঞ্জস্য করা হলো, যখন জাতীয় মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের অনেকটা উপরে অবস্থান করছে। অন্যদিকে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে, মজুরি বৃদ্ধির হার জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
এমন অবস্থায়, জ্বালানির দাম বাড়ানোর ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে তাৎক্ষণিকভাবেই।
রাজধানী ঢাকার বেশ কয়েকটি প্রধান রুটে সাধারণ গণপরিবহন মালিকরা ইতোমধ্যেই ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন; দূরপাল্লার বাস পরিচালনাকারীরা টিকিটের দাম বাড়িয়েছেন, এবং পণ্য পরিবহন বা ফ্রেইট অপারেটররাও পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর আগাম ঘোষণা দিয়েছেন।
পেশাদার রাইড-শেয়ারিং মোটরসাইকেল চালকদের জন্য তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি কঠিন এক উভয়সংকট হয়ে এসেছে; আর সেটি হলো– হয় নিজেদের পকেট থেকে পরিচালন ব্যয় মিটিয়ে আয় কমিয়ে দেওয়া, না হয় যাত্রীদের ওপর বাড়তি ভাড়া চাপিয়ে পরবর্তীতে গ্রাহক হারানোর ঝুঁকিতে পড়া।
"সারা দিন বাইক চালিয়ে যে আয় হয়, তা দিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবারের থাকা-খাওয়ার সংস্থান করতেই হিমশিম খেতে হয়। এখন জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় কীভাবে সংসার চালাব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না," নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন চট্টগ্রামের একজন রাইড-শেয়ারিং মোটরসাইকেল চালক জসীম উদ্দীন।
তাঁর মতো অসংখ্য রাইডারের জন্য পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির এই নতুন ধাক্কা সামলানোর আর কোনো উপায় অবশিষ্ট নেই।
রাজধানীতে 'পাঠাও'- এর চালক আল আমিন জানান, প্রতিদিন তাঁর তেলের খরচ ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাবে, যার ফলে প্রতি মাসে তাঁর বাড়তি খরচ দাঁড়াবে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকা।
সমস্যাটি কেবল পেশাদার রাইড শেয়ারিং চালকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।
চাকরি বা অফিসের কাজ, সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া এবং দৈনন্দিন কেনাকাটা বা প্রয়োজনে যারা মোটরবাইকের ওপর নির্ভর করেন, সেই সাধারণ যাত্রীদের ওপরও এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চেপেছে।
নিয়মিত মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, "বাচ্চাদের স্কুলে আনা-নেওয়া ও জরুরি বিভিন্ন কাজে আমাকে প্রতিদিন বাইক ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু তেলের যেভাবে দাম বাড়ছে, তাতে আমার মাসিক বাজেটের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হবে।"
অর্থনীতিজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বাড়তি ব্যয়ের ঢেউ
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, এই মূল্যবৃদ্ধির ক্ষতিকর প্রভাব ক্রমান্বয়ে গৃহস্থালি, কৃষি, শিল্প এবং পরিবহন খাতের ওপর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, "ব্যক্তিপর্যায়ে মানুষকে সরাসরি উচ্চ যাতায়াত খরচের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তবে যারা সরাসরি জ্বালানি তেল কেনেন না, লজিস্টিকস ব্যয় বৃদ্ধির কারণে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায়— সেই পরিবারগুলোও সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।" তিনি উল্লেখ করেন, এর ফলে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি আনুপাতিক ক্ষতির মুখে পড়বে।
অর্থনীতিতে সেই নেতিবাচক প্রভাবের ছড়িয়ে পড়া রূপ ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ঢাকায় বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রীরা ভাড়া ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়ার কথা জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম রোড থেকে যাত্রাবাড়ীগামী হিউম্যান হলার লেগুনার ভাড়া ২০ টাকা থেকে বেড়ে ২৫ টাকা হয়েছে। অন্যদিকে সায়েদাবাদ থেকে দক্ষিণাঞ্চলগামী দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে এবং চট্টগ্রামগামী কিছু বাসে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ১০০ টাকা পর্যন্ত।
পণ্য পরিবহন বা ফ্রেইট নেটওয়ার্কগুলোতেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। রাজশাহীর এক ট্রাক চালক জানান, বগুড়া থেকে চট্টগ্রামে কৃষিপণ্য পরিবহনে এখন ট্রিপপ্রতি অতিরিক্ত ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকা বেশি খরচ হবে। এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত অবধারিতভাবেই সবজির খুচরা বাজারেও আঘাত হানবে।
ট্রাকচালক মোহাম্মদ শামীম হোসেন বলেন, "অতিরিক্ত পরিবহন খরচ ব্যবসায়ীরা তো অবশ্যই সবজির দামের সাথে যোগ করবেন। ফলে শেষমেষ সাধারণ ভোক্তাকেই বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে।"
দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে ঢাকা অভিমুখী ট্রাকের ভাড়া ২২,০০০-২৩,০০০ টাকা থেকে একলাফে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত উঠে গেছে। আবার চট্টগ্রামগামী পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া চালানপ্রতি বেড়ে ৩৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, লজিস্টিকসের এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের পকেট থেকেই খসবে।
নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার তীব্র আশঙ্কা
রোববার পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় মুদি পণ্য, ব্রয়লার মুরগি এবং তাজা শাকসবজির খুচরা দর– মোটের ওপর স্থিতিশীল থাকলেও দোকানদাররা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, পাইকারি বাজার থেকে নতুন চালানের পণ্য আসার সাথে সাথেই তার সঙ্গে বাড়তি পরিবহন খরচ খুচরা মূল্যে যুক্ত হবে।
নিউমার্কেটের মুদি দোকানদার মিরাজ আহমেদ জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে পণ্যের দামে এখনো কোনো পরিবর্তন আসেনি।
তিনি বলেন, "জ্বালানির দাম বাড়ায় আমাদের দোকানে থাকা পণ্যের দাম এখনো বাড়েনি। তবে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে গেলে– আগামী দিনগুলোতে কিছু জিনিসপত্রের দাম অবশ্যই বাড়তে পারে।"
কাঁচামরিচ, বেগুন, ব্রয়লার মুরগি এবং মাছের মতো মূল নিত্যপণ্যের দর এমনিতেই চড়া থাকায় ভোক্তারা আশঙ্কা করছেন যে, পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে এগুলোর দাম আরও বাড়লে– অনেক পরিবারের দৈনিক পুষ্টির চাহিদা মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
হাতিরপুলে বাজার করতে আসা বেসরকারিখাতের চাকুরিজীবী হাফিজ উদ্দিন জানান, জ্বালানির দরবৃদ্ধি বাজারে কেমন প্রভাব ফেলে, ভোক্তারা এখন তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন। তিনি বলেন, "পরিবহন খরচ বাড়লে সবজির দাম নিশ্চিতভাবেই বেড়ে যাবে।"
কৃষকের কাঁধে আরও খরচের বোঝা
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তের অন্যতম বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে কৃষিখাত, কারণ দেশের সেচ ব্যবস্থা ও যান্ত্রিক চাষাবাদ মূলত ডিজেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ সেচ পাম্পই ডিজেল-চালিত। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বোরো ধান উৎপাদনের মোট খরচের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশই যায় সেচ বাবদ। এর অর্থ হলো, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি কৃষকের উৎপাদন খরচে বড় আঘাত হানবে।
সিপিডির ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, "ডিজেলনির্ভর কৃষিখাত বাড়তি সেচ, যান্ত্রিকীকরণ এবং পরিবহন খরচের মুখে পড়বে। এটি সম্ভাব্যভাবে খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু বিপরীতে কৃষকের লভ্যাংশ বা প্রাপ্তি কমিয়ে দেবে।"
যেসব কৃষক কিছু ফসলের সঠিক দাম না পেয়ে এমনিতেই লোকসানের মুখে রয়েছেন, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নওগাঁর কৃষক আহসান হাবিব বলেন, চাষাবাদের জন্য এখন সেচ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, কিন্তু প্রতিনিয়ত জ্বালানির দাম বেড়েই চলেছে। তিনি জানান, একদিকে ধানের দাম কমে গেছে, আলুর পর্যাপ্ত ক্রেতা নেই। অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়েই চলেছে—ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বিক্রয়মূল্যের পতন—এই দুইয়ের চাপে পিষ্ট হচ্ছেন কৃষকরা।
এই উভয়সংকট অত্যন্ত স্পষ্ট: বাজারদর যখন মন্থর থাকে, তখন কৃষকরা চাইলেই তাদের অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন না। ফলে একদিকে পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয়ের কারণে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের বাড়তি দাম গুণতে হলেও, অন্যদিকে কৃষকের নিজস্ব লাভ বা আর্থিক প্রাপ্তি নাটকীয়ভাবে কমে যায়।
উভয় দিক থেকেই চাপে ব্যবসায়ীরা
প্রস্তুতকারক, রপ্তানিকারক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য জ্বালানি তেলের এই দরবৃদ্ধি ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ে আরেকটি নতুন মাত্রা যোগ করল—এমন এক সময়ে যখন কাঁচামালের উচ্চমূল্য, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট এবং বাজারে চাহিদার মন্থর গতির সাথে তারা লড়াই করছেন।
স্পিনিং ও ডাইং মিলের মালিকানা প্রতিষ্ঠান– মোশাররফ গ্রুপ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন টিবিএসকে বলেন, "জ্বালানি তেলের নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমার প্রতিষ্ঠানের প্রতি মাসে অতিরিক্ত প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ বাড়বে।"
তিনি জানান, বর্তমানে গ্যাস সংকটের কারণে তাঁর স্পিনিং মিলে মাসে গড়ে ৬০ লাখ টাকার বেশি ডিজেল লাগে। আর ডাইং কারখানায় লাগে ৭৫ লাখ থেকে ৮০ লাখ টাকার ডিজেল। তেলের দাম সাম্প্রতিক বৃদ্ধির কারণে শুধু ডিজেল বাবদই তাঁর মাসিক খরচ বেড়ে যাবে প্রায় ৩০ লাখ টাকা।
মোশাররফ বলেন, গ্যাস সংকটে ডিজেল ব্যবহারের কারণে এমনিতেই খরচ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এই নতুন দরবৃদ্ধি সার্বিক উৎপাদন খরচকে আরও বাড়িয়ে দেবে। "কিন্তু আমরা ক্রেতাদের ওপর এই অতিরিক্ত খরচ চাপিয়ে দিতে পারছি না, কারণ বাজারে চাহিদা বাড়ছে না," আক্ষেপ করে বলেন তিনি।
তিনি আরও যোগ করেন, আগের তুলনায় গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লেও তা পূর্ণ সক্ষমতায় কারখানা চালানোর জন্য মোটেই সেটা পর্যাপ্ত নয়। "আমার কারখানায় ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন থাকলেও, আমরা পাচ্ছি মাত্র ২.৫ পিএসআই। ফলে বাধ্য হয়েই আমাকে ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে," বলেন তিনি।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, "ব্যবসায়ীরা এমনিতেই চরম প্রতিকূলতা ও চাপের মধ্য দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এমন এক কঠিন সময়ে কারও সাথে কোনো আলোচনা বা পরামর্শ না করে জ্বালানি তেলের দাম ১৫ শতাংশের বেশি বাড়িয়ে দেওয়াটা দেশের প্রতিটি খাতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।"
তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, জ্বালানির উচ্চমূল্য উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়াবে। এতে অনেক প্রতিষ্ঠাই তাদের ব্যবসার পরিধি বা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হবে।
শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, উৎপাদন, লজিস্টিকস, কৃষি, সেবাখাত এবং দ্রুত বিক্রি হয় এমন নিত্যব্যবহার্য ভোগ্যপণ্য বা এফএমসিজি খাত— এমনিতেই এই উত্তাল সময়ে মারাত্মক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
রপ্তানিমুখী খাতের বিষয়ে তিনি বলেন, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে, তখন এই মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসার সার্বিক খরচ বা 'কস্ট অব ডুইং বিজনেস' আরও বাড়িয়ে দেবে। বিশেষ করে জেনারেটর বা কোল্ড স্টোরেজের ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও মারাত্মক হতে পারে।
বেনাপোল দিয়ে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানিকারক শ্যামল দাস জানান, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়ায় কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা বজায় রাখার ব্যয় এবং পণ্য চট্টগ্রামে পৌঁছানোর খরচ অনেক বেড়ে যাবে।
শামস মাহমুদ বলেন, "রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর জন্য, যা ইতোমধ্যেই হ্রাসমান সক্ষমতা নিয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে— এই দরবৃদ্ধি ব্যবসার চলতি বাড়তি ব্যয়ের পাল্লাকে আরও ভারী করবে।"
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদাও মনে করেন, জ্বালানি তেলের এই সাম্প্রতিক দরবৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বা প্রতিযোগিতার শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিকল্প কোনো পথ কি খোলা ছিল?
ড. ফাহমিদা উল্লেখ করেন যে, রাজস্বে মারাত্মক ঘাটতির কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের সামনে অন্য বিকল্প সীমিত হলেও, অন্তত দুটি মূল বিকল্প বিবেচনার সুযোগ ছিল। আর সেগুলো হচ্ছে– জ্বালানি তেলের ওপর আরোপিত উচ্চ আমদানি শুল্ক সাময়িকভাবে হ্রাস করা এবং তেলের চাহিদা দক্ষতার সাথে ব্যবস্থাপনা করা।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক সরকারের অন্যতম রাজস্বের উৎস হলেও, তা সাময়িকভাবে কমালে সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির তীব্রতা কমানো যেত এবং পরিবহন, কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর অর্থনৈতিক চাপ অনেকটাই শিথিল হতে পারত।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, "অবশ্যই শুল্ক কমালে সরকারের রাজস্ব কমত এবং যার জন্য বিকল্প অর্থায়নের প্রয়োজন হতো। তাই সরকারের উচিত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) প্রকৃত আমদানি ব্যয়, পরিচালন ব্যয়, প্রদত্ত ট্যাক্স এবং লোকসানের সঠিক হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করা।"
"বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যখন অপ্রত্যাশিতভাবে বাড়ে, তখন শুল্ক সাময়িকভাবে সমন্বয় বা সংশোধন করা যেতে পারে। আবার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে তা পুনরায় পর্যালোচনা করা যেতে পারে। এতে ভোক্তাদের স্বস্তি দেওয়া ও রাজস্ব চাহিদা মেটানোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য পাওয়া যেত," বলেন তিনি।
ফাহমিদা খাতুন একই সাথে জ্বালানি চুরি ও অপচয় রোধ করতে এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে জ্বালানি বণ্টনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
*প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন টিবিএস-এর বগুড়া প্রতিনিধি খোরশেদ আলম, যশোর প্রতিনিধি আবদুল কাদের, সিলেট প্রতিনিধি দেবাশীষ দেবু, ফরিদপুর প্রতিনিধি সঞ্জীব দাস, খুলনা প্রতিনিধি আউয়াল শেখ এবং রাজশাহী প্রতিনিধি বুলবুল হাবিব।
