রাজস্ব ঘাটতির ঝুঁকি: ২০২৯ সালের মধ্যে সরকারের ঋণ বাড়তে পারে ১২.৩৪ লাখ কোটি টাকা
রাজস্ব ঘাটতিকে দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। রাজস্ব আহরণে ঘাটতি অব্যাহত থাকলে আগামী তিন অর্থবছরে সরকারের ঋণের পরিমাণ ১২ লাখ কোটি টাকার বেশি বেড়ে ৩৩.৭৮ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত মিডিয়াম টার্ম ম্যাক্রোইকোনমিক পলিসি স্টেটমেন্টে বলা হয়েছে, জিডিপির আকার বৃদ্ধির কারণে সরকারি ঋণ জিডিপির ৩৯ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকলেও দেশের নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের প্রেক্ষাপটে এই ঋণের বোঝা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান রাজস্ব ঘাটতির ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৯ সালের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় প্রায় ৯৬ হাজার কোটি টাকা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগও প্রায় ৮৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঋণসংক্রান্ত ঝুঁকি মোকাবিলায় সুকুক বন্ডের পাশাপাশি আগামী অর্থবছর থেকে স্বল্পমেয়াদি ইসলামিক ট্রেজারি বিল চালুর পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর মাধ্যমে ঋণের গড় মেয়াদ বৃদ্ধি এবং পুনঃঅর্থায়ন ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আর্থিক খাতে চলমান তারল্য সংকটের কারণে এ কৌশল বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ থাকবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় ঋণবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে এ লক্ষ্য অর্জন নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে রয়েছে সংশয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য টিবিএসকে বলেন, নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা 'পরাবাস্তব'।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এক বছরের মধ্যে এত বড় পরিমাণ রাজস্ব আদায় অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। রাজস্ব আদায় প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে এবং সরকারি ব্যয় অপরিবর্তিত থাকলে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর চাপ আরও বাড়বে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা এবং ঋণ পরিশোধের চাপ সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অবশ্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী শুক্রবার বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সংস্কার আনা হবে। সংস্থাটিকে পুনর্গঠন করে দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে দুর্নীতি কমানো হবে। পাশাপাশি দেশের দোকান ও রেস্তোরাঁগুলোকে কর নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হলে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, সরকার ধীরে ধীরে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাবে। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এবং সেই বিনিয়োগ থেকে দীর্ঘমেয়াদে অধিক রাজস্ব অর্জন করা।
সরকারি ঋণ বাড়লে প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৬.৪৫ শতাংশে
অর্থ বিভাগের ফিসক্যাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট স্টেটমেন্টে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে বাজেট লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় গড়ে ১৬ শতাংশ কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ঘাটতি আরও বেড়েছে। একই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সরকারকে অধিক ঋণ নিতে হলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হতে পারে, যা বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
অর্থ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এ কারণে ২০২৯ সালে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রায় ৮৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা কমে যেতে পারে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭.৫ শতাংশের পরিবর্তে ৬.৪৫ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় করজাল সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতির যৌক্তিকীকরণ, কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন এবং কর আদায়ে জবাবদিহিতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
বাজেট নথির সঙ্গে প্রকাশিত অর্থ বিভাগের সর্বশেষ ফিসক্যাল রিস্ক স্টেটমেন্ট (এফআরএস) অনুযায়ী, এসব ঝুঁকি পৃথকভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও একাধিক ঝুঁকি একসঙ্গে আঘাত হানলে প্রবৃদ্ধি, বাজেট ঘাটতি এবং ঋণ পরিস্থিতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সরকার জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশের মধ্যে বাজেট ঘাটতি সীমাবদ্ধ রাখার নীতি অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছে। এর মাধ্যমে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ এড়িয়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হবে। তবে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক ঋণের প্রকৃত ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
ঋণ পরিস্থিতি
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের মূলধন পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ২.৬১ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ অর্থবছরে এ ব্যয় বেড়ে ৩.২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর ২০২৯ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের মূলধন পরিশোধের পরিমাণ ৪.২৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়া, ঋণের মেয়াদ পূর্ণ হওয়া এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৯১ শতাংশ ডলার, স্পেশাল ড্রইং রাইটস (এসডিআর) এবং জাপানি ইয়েনে কেন্দ্রীভূত। এর মধ্যে ডলার ও এসডিআরভিত্তিক ঋণের অংশই প্রায় ৭১ শতাংশ।
ফলে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হলে বৈদেশিক ঋণের ঋণসেবা ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় ভবিষ্যতে হেজিং বা বিনিময় হার সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
সরকারের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৯ অর্থবছরে মোট সরকারি ঋণের ৫৫.৭ শতাংশ আসবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ৪৪.৩ শতাংশ বৈদেশিক উৎস থেকে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি ঋণের অনুপাত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত নিরাপদ সীমার মধ্যে রয়েছে। তবে নিম্ন রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতের কারণে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ঋণের ফাঁদে আটকা পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে আলোচনা ও উদ্বেগ রয়েছে।
সরকারি প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৯ অর্থবছরে নিট বাজেট ঘাটতি ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। তবে জিডিপির অনুপাতে ঘাটতি অর্থায়ন ৩.৫ থেকে ৩.৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই অর্থায়নের বড় অংশ আসবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। ২০২৫ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ নিট অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৯ অর্থবছরে বেড়ে ১ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে। তবে জিডিপির অনুপাতে এর অংশ প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি স্থিতিশীল থাকবে।
অন্যদিকে বৈদেশিক নিট অর্থায়ন ৫৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৯ অর্থবছরে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হবে। তবে জিডিপির অনুপাতে এর অংশ প্রায় ১.৬ শতাংশে স্থিতিশীল থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
