মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপ জরুরি: সায়মা হক বিদিশা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাজস্ব নীতি বা বাজেট একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, কিন্তু এটাই সবকিছু না। এককভাবে কেবল এই নীতি দিয়ে এই সংকটের সম্পূর্ণ সমাধান করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে উৎসে কর কমিয়ে কিছুটা স্বস্তি আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এটা আসলে খুব নগণ্য একটি প্রচেষ্টা মূল্যস্ফীতি কমানোর ক্ষেত্রে। তবে আমরা আশা করি, এই উদ্যোগের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে।
"এর পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক ও বিভিন্ন ধরনের কর কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেগুলো সার্বিকভাবে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে ডোমেস্টিক প্রোডাকশন বা অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে কিছু প্রণোদনা দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে, যাতে দেশীয়ভাবে খাদ্য ও কৃষিপণ্য সংগ্রহ জোরদার করা যায়। এসব পদক্ষেপের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির একটি ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে।"
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যদি বাজেটের আকার বড় হয়, অর্থাৎ এটি একটি সম্প্রসারণমূলক বাজেট হয়, তাহলে এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। আমরা দেখছি, কিছু খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে, কিন্তু সম্প্রসারণমূলক বাজেট অনেক সময় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বিপরীতমুখী সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। সুতরাং এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ দেখার বিষয়।
বিদিশা বলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মুদ্রানীতি। নীতি সুদের হারে কোনো পরিবর্তন আসছে কি না, সেটি লক্ষ্য করা জরুরি। কারণ নীতি সুদের হার প্রায় ১০ শতাংশে দীর্ঘদিন ধরে স্থির রয়েছে। এটিকে পরিবর্তনের জন্য চাপ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে, যারা ব্যবসার খরচ কমাতে চান। ফলে এই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা দরকার।
তিনি বলেন, এর পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটকে কেন্দ্র করে অনেক সময় যতটা দাম বাড়ার কথা, তার চেয়ে বেশি মধ্যস্বত্বভোগীরা দাম বাড়িয়ে দেয়। তাই একটি কার্যকর, সুশাসিত বাজার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত প্রয়োজন।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ খাত। এখানে কী ধরনের সমন্বয় প্রয়োজন এবং তা কীভাবে করা হবে, সেটি গভীরভাবে দেখা দরকার। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, উৎপাদন খরচ বাড়ে ,যা সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক আরো উল্লেখ করেন, "টিসিবির আওতা কতটা বাড়ানো হচ্ছে—সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য টিসিবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদি এর আওতা বৃদ্ধি করা হয় এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষকে কিছুটা সহায়তা দেওয়া যায়, তাহলে সেটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হবে।"
তিনি বলেন, "মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ শুধুমাত্র বাজেট বা করনীতির মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর সঙ্গে মুদ্রানীতি, কঠোর বাজার ব্যবস্থাপনা এবং রাজস্ব নীতির সঠিক সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। এই সমন্বয়ের মাধ্যমেই মূল্যস্ফীতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।"
