কর বহির্ভূত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬৬ হাজার কোটি টাকা; বাড়বে সরকারি সেবার ফি ও নাগরিক ব্যয়
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর বহির্ভূত (নন-ট্যাক্স) রাজস্ব থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এটি বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি।
বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে এই খাত থেকে ৪৬ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল। তবে সংশোধিত বাজেটে সেই লক্ষ্য বাড়িয়ে ৬৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছিল। নতুন বাজেটে সরকার সংশোধিত লক্ষ্যের চেয়ে আরও ১ হাজার কোটি টাকা বেশি আয়ের পরিকল্পনা করেছে।
নন-ট্যাক্স রাজস্ব বলতে সাধারণত কর বা শুল্ক ছাড়া সরকারি অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া আয়কে বোঝায়। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ, ঋণের সুদ, বিভিন্ন সরকারি সেবার ফি, টোল, জরিমানা, ইজারা, রয়্যালটি এবং সরকারি সম্পদ বিক্রির আয়।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, করের পরিবর্তে এসব উৎস থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর অর্থ হলো জনগণকে বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের সময় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। কারণ পাসপোর্ট, লাইসেন্স, নিবন্ধন, টোল বা বিভিন্ন সেবার ফি বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি নাগরিকদের ওপর পড়ে।
সরকারের এই করবহির্ভূত রাজস্বের সবচেয়ে বড় অংশ আসবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর লভ্যাংশ ও মুনাফা থেকে। এ খাত থেকে সর্বমোট ২৩ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা পাওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, বিভিন্ন সরকারি করপোরেশন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্বৃত্ত মুনাফা এই আয়ের প্রধান উৎস।
এছাড়া সরকারি ঋণের সুদ থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় হবে। সরকার বিভিন্ন সংস্থা ও প্রকল্পকে যে ঋণ দিয়েছে, তার বিপরীতে ৫ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা সুদ পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
পাসপোর্ট, ভিসা, কোম্পানি নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবার ফি থেকে ৫ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা আয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে জরিমানা, দণ্ড ও বাজেয়াপ্ত সম্পদ থেকে আসবে ৬৮৮ কোটি টাকা। টেলিযোগাযোগ, ডাক, হাসপাতাল ও অন্যান্য সরকারি সেবা থেকে ৯ হাজার ৬২০ কোটি টাকা আয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা নন-ট্যাক্স রাজস্বের অন্যতম বড় উৎস হিসেবে বিবেচিত।
এছাড়া সরকারি জমি, ভবন ও অন্যান্য সম্পত্তি ভাড়া ও ইজারা দিয়ে ৬৩০ কোটি টাকা এবং সেতু, মহাসড়ক ও টানেলের টোল থেকে ১ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
সরকারি প্রকাশনা, পুরোনো যানবাহন, যন্ত্রপাতি বা অন্যান্য অব্যবহৃত সম্পদ বিক্রি করে ৩ হাজার ৫১২ কোটি টাকা আয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
রয়্যালটি, লাইসেন্স ফি, খনিজ ও জ্বালানি সম্পদ ব্যবহারের চার্জ এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়সহ অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা পাওয়ার আশা করছে সরকার।
সীমিত পরিসরে কিছু সরকারি সম্পদ বিক্রি বা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে মূলধনী প্রাপ্তি খাতে ১০৮ কোটি টাকা আসবে বলে বাজেটে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কর আদায়ের পাশাপাশি সরকারি সেবা, সম্পদ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বাড়িয়ে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে চাইছে সরকার। তবে এসব আয়ের বড় অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের দেওয়া ফি, টোল ও সেবামূল্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় ভবিষ্যতে নাগরিকদের সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
