আবার বেসরকারিকরণ নাকি রিক্যাপিটালাইজেশন: একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে বাংলাদেশ ব্যাংক
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একীভূত করা পাঁচ ব্যাংক—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে আবার বেসরকারিকরণ করা হবে নাকি একীভূত করে জনগণের করের টাকা দিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে রি-ক্যাপিটালাইজ করা হবে, তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ বিষয়ে স্টেকহোল্ডাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় বাংলাদেশ গভর্নর এ তথ্য জানান। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
গভর্নর বলেন, 'ব্যাংক রেজল্যুশন বিল পাশ হওয়ার পর এই পাঁচটি ব্যাংকের বিষয় আমরা ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুইভাবেই দেখতে পারি। এখন হয় করদাতাদের টাকা থেকে পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের পাওনা ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের দিতে হবে, যা কয়েক বছর লাগতে পারে। নাহয় একটা নির্দিষ্ট সময় পরে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে রি-ক্যাপিটালাইজ করতে হবে।''
তিনি আরও বলেন, রি-ক্যাপিটালাইজ করার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে এবং প্রচুর বিনিয়োগ হবে। 'আমাদের ফিসক্যালে সেই স্পেস কতোটুকু আছে, তা আপনারা জানেন। এটা নিয়ে আমরা আপনাদের সঙ্গে পরামর্শ করব যে, এখনই কি প্রাইভেটাইজ করার চেষ্টা করব, নাকি এখনই আমরা রি-ক্যাপিটাইলজ করার চেষ্টা করব।'
অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ সংশোধন করে সরকার ব্যাংকগুলোর পুরনো মালিকদের এসব ব্যাংকের মালিকানায় ফেরত আসার সুযোগ রেখে বিল পাশ করেছে, যার মধ্য দিয়ে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংককে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে রূপান্তর করা হলেও ব্যাংকগুলোকে আবার প্রাইভেটাইজেশন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, তা তুলে ধরে গভর্নর বলেন, পাঁচ ব্যাংকে সরকার প্রথম তারল্য সহায়তা দেয় ৪৭ হাজার কোটি টাকা। এরপরে এর পরিশোধিত মূলধন আরও ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয় এবং ডিপোজিট প্রকেটশন ফান্ড থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়। এই ৩২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৩ হাজার কোটি টাকা ওই ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হয়েছে।'
এই পাঁচ ব্যাংকে আমানত আছে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বাংকগুলোর পারফর্মিং লোনের পরিমাণ মাত্র ৩২ হাজার কোটি টাকা। নন-পারফর্মিং লোনের পরিমাণ ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা।
গভর্নর বলেন, 'অন্যান্য দেশে এমন নন-পারফর্মিং ব্যাংকগুলোকে যেভাবে রেজল্যুশন করা হয়, সেখানে এগুলোকে একটা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তারা সেখান থেকে তা আদায় করে। কিন্তু দুঃখজনক যে, আমাদের এই পাঁচটা ব্যাংকের এসব নন-পারফর্মিং লোনের বিপরীতে অনেকগুলোতেই উপযুক্ত নিরাপত্তা জামানত নেই এবং এগুলোকে ঋণ বলাটাও সঠিক হবে কি না জানি না। এই টাকাগুলো চুরি হয়ে গেছে।'
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ১৭ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ওয়েজ এন্ড মিনস এবং ওভারড্রাফট থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা গত ২২ এপ্রিল কমে ১১ হাজার ১০৩ কোটি টাকায় নেমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, এ তথ্য সঠিক নয়।
তিনি বলেন, 'আমাদের কান্ট্রি রেটিং কমে গেছে। এতে আমাদের ঋণের খরচ, বেসরকারি খাতের ঋণের খরচ বেড়ে গেছে। এর মধ্যে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে, মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দিয়েছে, যা সঠিক নয়।'
ডেপুটি গভর্নর হাবীবুর রহমান বলেন, গত দুই বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের কোনো ট্রেজারি বিল, বন্ড কিনেনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের ব্যাংক। সেখানে অনবরত সরকারের আয়ের টাকা জমা হতে থাকে এবং সরকার তার প্রয়োজনে টাকা খরচ করে থাকে। এখানে টাকা ছাপিয়ে ঋণ দেওয়া বা ছাপানো টাকা ছিঁড়ে ফেলার কোনো ইস্যু নেই। মূল বিষয় হলো, সার্কুলেশনে থাকা কারেন্সি বাড়ছে কি না।
