অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কমেছে ২৬ শতাংশ
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) বৈদেশিক ঋণের অর্থ ছাড়ের পরিমাণ কমেছে ২৬.২ শতাংশ।
সোমবার (৩০ মার্চ) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে উন্নয়ন সহযোগীরা মোট ৩.০৫৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ছাড় করেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ছাড়ের পরিমাণ ছিল ৪.১৩৪ বিলিয়ন ডলার।
ইআরডির কর্মকর্তারা বলেন, নির্বাচনের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কম থাকায় বৈদেশিক ঋণের ছাড় কম হয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রশাসন নির্বাচনমূখী থাকায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি ছিল না, যা বৈদেশিক ঋণ ছাড়ে প্রভাব ফেলেছে।
কর্মকর্তারা আরও বলেন, চলতি অর্থবছরের শুরুর দিকে ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসনে অস্থিরতা ছিল। একইসঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে আস্থার সংকট ছিল। এতে অর্থবছরের প্রথম থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি ছিল না।
এছাড়া ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে অনেক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক, প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা চলে যান। পরে নতুন করে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতে সময় চলে যায়। এই পরিস্থিতি চলতি অর্থবছরের প্রথমার্থেও ছিল। এ কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থছাড় ব্যাহত হয়েছে।
এদিকে ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে যে উন্নয়ন সহযোগীরা ছাড় করেছে, প্রায় একই পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগীদের পরিশোধ করেছে।
ইআরডির তথ্যমতে, জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে বাংলাদেশ বিগত সময়ে নেওয়া ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ২.৮৯৯ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে, যেখানে একই সময়ে অর্থছাড় ছিল ৩.০৫ বিলিয়ন ডলার।
গত অর্থবছরের একই সময়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগীদের পরিশোধ করেছিল ২.৬৩৬ বিলিয়ন ডলার।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, বিগত সময়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে যেসব ঋণ নিয়েছে, সেসব ঋণের অনেকগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে পরিশোধও বেড়েছে। তবে পুরো অর্থবছর বিবেচনা করলে এখনো অর্থছাড়ের চেয়ে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেশি হবে না। যেমন গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ৪.০৮৬ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। কিন্ত এই সময়ে ছাড় হয় ৮.৫৬ বিলিয়ন। একইভাবে চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের পরিশোধ বাড়লেও তা অর্থছাড়কে ছাড়িয়ে যাবে না।
ইআরডির তথ্য বলছে, অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশ আসল পরিশোধ করেছে ১.৯৪৩ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১.৬৯২ বিলিয়ন ডলার।
আলোচ্য সময়ে সুদ বাবাদ উন্নয়ন সহযোগীদের পরিশোধ করা হয়েছে ৯৫৫.৮ মিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৯৪৪.১ মিলিয়ন ডলার।
এদিকে জুলা-ফেব্রুয়ারি সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ২.৪৩১ বিলিয়ন ডলারর প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রতি ছিল ২.৩৫৩ বিলিয়ন ডলার।
ইআরডি সূত্র জানায়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও সরকার পতন, প্রশাসনে অস্থিতরা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থার সংকেটর কারণে গত অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ প্রতিশ্রুতি কম ছিল। চলতি অর্থবছরে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও অন্তর্বর্তী সরকার বৈদেশিক ঋণ নিয়েছে খুবই সতর্কভাবে। এ কারণে চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতিতে এখনও গতি কম দেখা যাচ্ছে। তবে আশা করা হচ্ছে, নতুন নির্বাচিত সরকারের সময়ে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি বাড়বে।
ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, সাধারণত উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলো একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বড় ধরনের ঋণ প্রতিশ্রুতি বা অর্থ ছাড় কম হয়েছে। এর প্রভাবে গত অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কমেছে। যদিও চলতি অর্থবছরের আট মাসে প্রতিশ্রুতি বেড়েছে, তবে তা উল্লেখযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, বিগত বছরগুলোতে নেওয়া বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এখন বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগের সরকারের আমলে নেওয়া ঋণের পরিশোধকাল শুরু হওয়ায় পরিশোধের পরিমাণ বাড়ছে। বর্তমানে অর্থ ছাড় ও পরিশোধ প্রায় সমান পর্যায়ে, যা রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।
তার মতে, নতুন ঋণ প্রবাহ না বাড়লে ভবিষ্যতে এই চাপ আরও বাড়বে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় জ্বালানি, পরিবহন ও বিমা খরচ বেড়েছে। বিকল্প উৎস থেকে উচ্চমূল্যে তেল ও এলএনজি আমদানি করতে হওয়ায় রিজার্ভে চাপ পড়ছে। বর্তমানে রিজার্ভ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার, যা ৪০-৪৫ বিলিয়নে উন্নীত হলে স্বস্তি আসতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে বাজেট সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করছে, যাতে রিজার্ভের ওপর চাপ কমানো যায়।
মুজেরী বলেন, সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। বৈদেশিক সহায়তা বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ, রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে।
এদিকে ইআরডির তথ্য অনুসারে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে সবেচেয়ে বেশি অর্থছাড় করেছে রাশিয়া। এই উন্নয়ন সহযোগী ৭৫৫.১৬ মিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে এই আট মাসে। রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পেই এই ঋণ ব্যবহার করা হচ্ছে। এই সময়ে ৬৩৬ মিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক। এছাড়া এডিবি ৫৬৬.১৯ মিলিয়ন ডলার, চীন ২৫৭.৭২ মিলিয়ন ডলার, জাপান ১৮৯.৩৬ মিলিয়ন ডলার ও ভারত ১৫২.৮৯ মিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সর্বোচ্চ ১.২৬৯ বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি এসেছে এডিবির কাছ থেকে। বিশ্বব্যাংকর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি এসেছে ৪১৬.২৫ মিলিয়ন ডলার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর কাছ এই সময়ে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে ৩৯২.০৭ মিলিয়ন ডলার।
