ঋণ খারাপ হওয়ার আগেই প্রভিশন রাখা নিয়ে উদ্বেগ, কর্মকর্তাদের বোনাসে শিথিলতা চাইল বিএবি
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অভ ব্যাংকসের (বিএবি) প্রতিনিধিরা। বৈঠকে গভর্নর ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
অন্যদিকে বিএবির পক্ষ থেকে বলা হয়, যেসব ব্যাংক মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে, তাদের কর্মকর্তাদের বোনাস দেওয়ার জন্য বিশেষ ছাড় ও আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী ঋণ খারাপ হওয়ার আগে প্রভিশনিং করতে হলে ব্যাংকের ওপর চাপ তৈরি হবে বলে জানিয়েছেন উদ্যেক্তা পরিচালকরা। বৈঠকে উপস্থিত থাকা একজন টিবিএসকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গত বছরের ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক নির্দেশনায় বলা হয়, কোনো ব্যাংক যদি আর্থিক লোকসান বা মূলধন ঘাটতির মধ্যে থাকে, তবে তারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস দিতে পারবে না।
বৈঠকে থাকা ওই কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, গভর্নর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং ব্যাংকগুলোর ওপর তদারকি আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন
বিএবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রতিটি ব্যাংকের চ্যালেঞ্জ ভিন্ন ভিন্ন। বর্তমান নিয়মে প্রভিশন বা মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের বোনাস ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানে যে কড়াকড়ি রয়েছে, তা শিথিল করার দাবি জানায় সংগঠনটি। তাদের মতে, সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে ঘুরে দাঁড় করাতে হলে ব্যাংক কর্মকর্তাদের উৎসাহিত রাখা প্রয়োজন, তাই তাদের সুবিধা বন্ধ করা ঠিক হবে না।
দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক প্রতিবেদনের মান আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি (ইসিএল) পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস-৯) অনুযায়ী এখন থেকে কোনো ঋণ খারাপ হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ক্ষতির কথা বিবেচনা করে ব্যাংকগুলোকে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে বলে জানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন এই ব্যবস্থা চালু হবে ২০২৮ সাল থেকে।
এমন সার্কুলারের পরিপ্রেক্ষিতে বিএবি গভর্নরকে জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি পলিসির আওতায় ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে ১০ বছরের দীর্ঘ সময়সীমা ও গ্রেস পিরিয়ড দেওয়ার পর আবার সেই ঋণের বিপরীতে নতুন করে প্রভিশন রাখা অনেক ব্যাংকের জন্যই কঠিন হয়ে পরবে। বিশেষ করে আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী প্রভিশন করা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হবে না বলে তারা মনে করে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ব্যাংক কোম্পানি আইনে স্বতন্ত্র পরিচালকের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়েছে, সে বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিএবি চেয়ারম্যান। সামনে এই বিষয়ে পরিবর্তন আনতে গেলে স্টেকহোল্ডার বা অংশীজনদের সঙ্গে আরও আলোচনার প্রস্তাব দেন তিনি।
বৈঠকে উপস্থিত একজন চেয়ারম্যান টিবিএসকে জানান, 'আমরা ইতমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে একটি চিঠি দিয়েছি। সেখানে আন্তর্জাতিক উদাহরণ তুলে ধরেছি।'
তিনি বলেন, 'বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বা ড্রাইভ থাকা জরুরি। তাই স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোর ভারসাম্য রক্ষা করা দরকার।'
গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক শেষে বের হয়ে বিএবি চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার সাংবাদিকেদের বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে নিয়মিত ইন্টারঅ্যাকশন হলে পলিসিগুলো সঠিকভাবে নেওয়া যাবে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে গ্যাপ তৈরি করলে সঠিকভাবে পলিসি নেওয়া সম্ভব হবে না। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করতে বলা হয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকের মনোভাব নিয়ে গভর্নর যথেষ্ট পজিটিভ বলে মনে হয়।'
আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে এখন আগাম প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে; তাতে ব্যাংকের ওপর কেমন প্রভাব পড়বে—এমন প্রশ্নের জবাবে বিএবি চেয়ারম্যান বলেন, 'এটা মাত্র সার্কুলার দেওয়া হয়েছে, যা ২০২৮ সাল থেকে কার্যকর করা হবে। এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি যে কীভাবে প্রভিশন সংরক্ষন করা যায়। আন্তর্জাতিকভাবে এ নীতিই অনুসরণ করা হয়, যা নতুন কিছু না। তবে বাংলাদেশের সাপেক্ষে ওটা কতটুকু কার্যকর করা যায়, সেটা দেখার বিষয় । কারণ আমাদের যে অবকাঠামো অবস্থা, সেটা তো বাইরের দেশের মতো না।'
