অনুবাদ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ইলান স্তাভান্সের সঙ্গে আলাপচারিতা
নাওয়াটল ভাষায় রচিত কবিতার খণ্ড খণ্ড অংশগুলোকে জড়ো করে এক সুতোয় গাঁথা কিংবা সেই কবিতার স্প্যানিশ অনুবাদে লুকিয়ে থাকা সাংস্কৃতিক পক্ষপাত খুঁজে বের করা—এমন সব তুলনাহীন এবং জটিলতর সাহিত্যিক সংকট নিয়ে যার কাজ করেন ইলান স্তাভান্স। কাব্য ও অনুবাদ তত্ত্বের নানা মতবাদ নিয়েও রয়েছে তার গবেষণা। তার নিজের সাহিত্য ও সমলোচনামূলক কাজেও এসব গবেষণার প্রয়োগ করেন। সম্প্রতি তিনি ওয়ার্ল্ড লিটেরেচারের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বৈপ্লবিক আবির্ভাব নিয়ে আলোচনা করেন, ইজেলের পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন নুসরাত জাহান।
প্রশ্ন: গবেষক, অনুবাদক, প্রকাশক ও শিক্ষক—এই চার পরিচয় ভাষা ও সাহিত্যে এআইয়ের প্রভাব বুঝতে আপনাকে এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সাহিত্যকর্ম অনুবাদের ক্ষেত্রে বৃহত্তর ল্যাঙ্গুয়েজ-মডেলের জেনারেটিভ এআই টুলগুলোর ব্যবহার নিয়ে আপনি কি কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন? করে থাকলে আপনার প্রাথমিক অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
ইলান স্তাভান্স: বাচ্চারা ঘরের কাছে লজেন্সের দোকান খুঁজে পেলে যেমন অভিজ্ঞতা হয়, আমারটাও তেমনই ছিল। এআই টুল তো অনেক রকমের। কোনো টুল সর্বজনীন, ডিজিটাল জগতের সর্বত্র বিনা বাধায় চষে বেড়াচ্ছে, আবার কোনোটি ব্যবহারকারীর রুচি অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রয়েছে। তবে 'আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেনস' বা 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' এই নাম নিয়ে আমার বেশ আপত্তি। মেরিয়াম-ওয়েবস্টার অভিধানের মতে, বুদ্ধিমত্তা হলো অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নিজের চারপাশকে প্রভাবিত করার অথবা বিমূর্ত ধারণা নিয়ে চিন্তা করার দক্ষতা। সে হিসেবে এই টুলগুলোকে পুরোপুরি জ্ঞানসম্পন্ন বলা যায় না। এগুলো মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে খুশি করার জন্য ইন্টারনেটে যা কিছু পায়, সেসবকেই নতুন করে সাজিয়ে বা নতুন মোড়কে তুলে ধরে মাত্র। সবটাই মূলত তথ্য, জ্ঞান নয়। কারণ, জ্ঞান হলো তথ্যের সঙ্গে অভিজ্ঞতার যোগ। এআই কি শিখতে পারে? এআই কি নতুন পরিস্থিতি বুঝতে পারে? সংকট সমাধানে এআই কি উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়োগ করতে পারে?
তারপরও বলব এগুলো দুর্দান্ত প্রযুক্তি। যেমন ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (এনএলপি), যা চ্যাটবটকে মানুষের ভাষা বুঝতে ও অনুবাদ করতে সাহায্য করে। জেনারেটিভ অ্যাডভার্সারিয়াল নেটওয়ার্ক (জিএএন), যেখানে তথ্য তৈরির জন্য দুটি নিউরাল নেটওয়ার্ক একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। থিওরি অব মাইন্ড এআই, যা মানুষের অনুভূতি, বিশ্বাস ও উদ্দেশ্য বোঝার মতো ব্যবস্থা তৈরি করে। এবং সেলফ অ্যাওয়ার এআই, যা নিজে চেতনা সম্পন্ন হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এসবের মধ্যে কিছু কিছু নিঃসন্দেহে অন্যদের চেয়ে বেশ উন্নত।
এসব প্রযুক্তির নাগাল পাওয়া আমাকে ভাবায় অনেক আগের উদ্ভাবনের কথা। বিশেষত ১৪৪০ সালের দিকে যখন জোহানেস গুটেনবার্গ প্রথম মুভেবল টাইপ ব্যবহারের মাধ্যমে মেকানিক্যাল প্রিন্টিং প্রেস চালু করেছিলেন। কিংবা ১৮২০-এর দশকে জোসেফ নিসেফোর নিপ্স কর্তৃক ক্যামেরা উদ্ভাবন, ১৮৫৫ সালে প্রিন্টিং টেলিগ্রাফ, ১৮৯৫-এ সিনেমাটোগ্রাফের প্রচলনের কথাও আমার মনে পড়ে। এমনকি ১৯৮৩ সালের ১ জানুয়ারি যখন ট্রান্সমিশন কনট্রোল প্রটোকল বা ইন্টারনেট প্রটোকলকে অফিশিয়ালি গ্রহণ করা হলো, যা বিভিন্ন যোগাযোগ নেটওয়ার্ককে একত্র করে জন্ম দিয়েছিল আজকের ইন্টারনেট। পৃথিবী এসবের সঙ্গে চিরতরে বদলে গেছে। আজ আমরা জীবনকে যাপন করছি একরকম উল্কার গতিতে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে গ্রেট বুকস সামার প্রোগ্রামে আমি প্রায় সত্তরজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে এআই নিয়ে আলোচনা করেছি। তাদের সামনে আমি ইচ্ছে করেই একটি চিন্তাজাগানিয়া বিষয়ের অবতারণা করি। এআই এবং ঈশ্বরের মধ্যে কি কোনো মিল আছে?
সাহিত্য অনুবাদের ক্ষেত্রে এআই টুল ব্যবহার করার কোনো সুবিধা বা উপকারিতা আপনি দেখেন কি? আপনার পরের বই ফিকশনাল ট্রান্সলেসনসে তো একদল কাল্পনিক অনুবাদককে দেখা যায়।
আমার ফিকশনাল ট্রান্সলেসন (২০২৬) বইটিতে আংশিকভাবে এআই ব্যবহৃত হয়েছে, তবে তা বইটার সময়েরই ফল। বইটিতে বারোজন কাল্পনিক অনুবাদকের কাজ সংকলিত হয়েছে। কলম্বিয়ার জাসিন্তা কান্দেলারিয়া, সেনেগালের ডেলফিন দিয়ায়ে, কাতালুনিয়ার আলবার্ট ইনেস, বেলারুশের আলিয়াকসেই কোভালেঙ্কো প্রমুখ। তারা আমারই বানানো কিছু কবিতার অনুবাদ করেছেন। তবে কবিতাগুলো আমি বানিয়েছি গেটে, কাভাফি, ভ্যালেরি, রিলকে, হিকমত, পেসোয়া ও বোলানিওর মতো বিখ্যাত কবিদের ভাষাশৈলীর অনুকরণে।
একটু পরিষ্কার করে বলুন! আপনি নিজেই কবিতাগুলো বানিয়েছেন, তাদের অনুবাদও করেছেন, এমনকি সেসব অনুবাদকদের চরিত্রও আপনারই বানানো? দারুণ ব্যাপার! যেন প্রতিটিই একেকটি 'ডিপফেক'। আমার তো বোর্হেসের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।
বোর্হেস তো সারা জীবন বিশ্বাস করতেন যে তিনি নিজেই নকল, তার গোটা জীবনই কারও কল্পনা। আবার ফার্নান্দো পেসোয়ার কথাই ধরুন। রিকার্দো রেইস, আলভারো দে কাম্পোস, বের্নার্দো সোয়ারেস এবং আলবের্তো কাইরো... এ রকম সত্তরটিরও বেশি কাল্পনিক সত্তার উদ্ভব ঘটিয়েছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর পর, ১৯৮২ সালে প্রকাশিত 'দ্য বুক অব ডিসকোয়ায়েট' গ্রন্থে পেসোয়া নিজেই লিখে গেছিলেন, আমি বাস্তবতার জন্য তৈরি হইনি।
বহু বছর ধরে পড়ে পড়ে আমি এসব মহান কবিদের অনুকরণ করে কবিতা লিখেছি। তবে এগুলো নকল নয়। কারণ, আমি যদি নিজেকে পাবলো নেরুদা বা ভিসওয়াভা শিম্বর্সকার মনে করে কবিতা লিখি, সেটি তাদের কোনো কবিতার অনুলিপি হয় না; বরং সম্পূর্ণ নতুন কবিতা হয়ে ওঠে।
বইটিতে শুধু কাল্পনিক অনুবাদই নয়, সেই অনুবাদগুলোর জন্য বানানো মূল কবিতাগুলোকেও তাদের নিজ নিজ ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন মধ্যযুগীয় স্প্যানিশ, আঠারো শতকের গ্রিক, টার্কিশ, পোলিশ, লাদিনো ইত্যাদি ভাষা। এর একটি উদাহরণ হলো রুশ কবি আনা আখমাতোভার (১৮৮৯-১৯৬৬) নামে রচিত কবিতা 'দ্য ফিয়ারফুল আওয়ার'।
ফিকশনাল ট্রান্সলেসনস বইয়ের অনুবাদকদের একজন, আলবার্ট ইনেস একজন কাতালান লেখক, বার্সেলোনার লা ভ্যানগারডিয়া পত্রিকায় কলাম লেখেন। তিনি এআই প্রযুক্তির বড় সমর্থক। তবে বইটির অন্য অনুবাদকদের অনেকেই এই প্রযুক্তি সম্পর্কে সন্দিহান।
এআই আমাদের যান্ত্রিকভাবে সাহিত্যকর্ম অনুবাদে সহায়তা করে। তাতে গভীরতার অভাব প্রায়ই স্পষ্ট। তবে তাই বলে এগুলোর কোথাও কানো উপযোগিতা নেই, এমনটাও নয়।
তবে এখানে সতর্কতার বিষয়ও আছে। একবার কোনো কিছু এআইয়ের মাধ্যমে অনুবাদ করা হলে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটা তার বিশাল ভান্ডারের আরেকটি তথ্যে পরিণত হয়। ফলে ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, ভবিষ্যতের অনুবাদকর্মের জন্য একটি রেকর্ড থেকে যায়। আমার পরিচিত অনেক অনুবাদকই প্রথম খসড়াটা এআই দিয়ে করেন। এরপর তাকে নিজের ঢঙে গড়ে নেন।
এআইয়ের হাতে পড়া পৃথিবীতে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কোনটা মানুষ আর কোনটা কৃত্রিম, এইটা বিচারের বুদ্ধি। এমনও হতে পারে যে একসময় কৃত্রিম জিনিসপত্রই মানুষের সৃষ্টিকে ছাপিয়ে যাবে। কারণ, মানুষ হিসেবে আমাদের একঘেয়েমিতে আক্রান্ত হতে হয়। ভালো খারাপ যা-ই হোক, এআই একঘেয়েমির সঙ্গে পরিচিত না।
ভবিষ্যতে এআই আরও উন্নত হলেও কি একই রকম কাজ করবে? তখন আমরা কীভাবে বুঝব কোন কবিতা, অনুবাদ বা অনুবাদক আসল আর কোনটি ডিপফেক?
অসম্ভব। আর সমস্যাটাও সেখানেই। এই যুগান্তকারী বিপ্লবের একটি অনিবার্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো, আসলের কাছাকাছি অসংখ্য রকমের নতুন নকলের উদ্ভব। আসল আর নকলের দ্বন্দ্ব সব সময়ই মানবসভ্যতার একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য ছিল। কিন্তু এখন সেটা আমাদের ডিএনএর ভেতরে প্রোথিত হয়ে যাচ্ছে।
আপনি আর আমি সহজেই একটি সাধারণ ক্যাম্পবেল স্যুপের ক্যান এবং শিল্পী অ্যান্ডি ওয়ারহলের সেই ৩২ সিরিজের রাজনৈতিক প্রপাগান্ডামূলক চিত্রকর্মের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি। এআই এসে এই পার্থক্যকেই অর্থহীন করে তুলেছে। সে আসল আর কাল্পনিক দুই ধরনের স্যুপের ক্যানই তৈরি করতে পারে। সেই স্যুপের ক্যানের আসল ও নকল দুই ধরনের অ্যান্ডি ওয়ারহল শিল্পকর্মও বানাতে পারে। এমনকি সেগুলোর অসংখ্য নতুন রূপও সৃষ্টি করতে পারে। যেগুলো হয়তো সত্যিকারের স্যুপের ক্যান এবং স্যুপের ক্যানের চিত্রকর্ম—দুইটির অপেক্ষাই বেশি আকর্ষণীয়।
তাহলে কি এআই মানব অনুবাদকদের কর্মসংস্থানও কমিয়ে দিচ্ছে?
যারা বিশেষত্বহীন, এআই মূলত তাদের সরিয়ে দেবে। সিনেমা ও টেলিভিশনের আবির্ভাবের পরও যেমন মঞ্চনাটক বিলুপ্ত হয়নি, কিংবা ই-বুক আসার পরও মুদ্রিত বই হারিয়ে যায়নি, তেমনি উৎকৃষ্ট অনুবাদের মূল্য ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।
এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বলি। তাহলে বুঝবেন মানুষের জ্ঞানের ব্যাপকতাকে ধারণ করতে এআই এখনো কতটা পিছিয়ে। ২০২৫ সালের ৮ মে, রবার্ট ফ্রান্সিস প্রেভোস্ট চতুর্দশ পোপ লিও নির্বাচিত হন। তার কিছুক্ষণ পরেই আমি চ্যাটজিপিটিকে তাঁর একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখতে বলি।
তখনো সে এ বিষয়ে প্রস্তুত ছিল না। আমাকে উত্তর দিল চতুর্দশ পোপ লিও নাকি ভ্যাটিকান সিটির একটি কাল্পনিক চরিত্র! এরপর সে পোপ ফ্রান্সিসের স্থলাভিষিক্ত সেই কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে বানিয়ে বানিয়ে নানান তথ্য উগড়াতে থাকে। এআই যুগের সাহিত্যও কী তবে এ রকমই হতে পারে?
আঞ্চলিক, সাংস্কৃতিক বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের নিগূঢ় জটিলতা কিংবা কোনো কিছুর বহুমাত্রিক অর্থ, অনুবাদের মধ্যে এসব ধারণ করাটা কতটা কঠিন বলে আপনার মনে হয়? এসব ক্ষেত্রে গদ্য এবং কাব্য কীভাবে পৃথক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে? এআই ব্যবহারের ফলে এদের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে? আপনি তো সম্প্রতি কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে কনভারসেশনস অন ডিকশনারিস: দা ইউনিভার্স ইন আ বুক নামে একটি বইও প্রকাশ করেছেন।
এআই অনেক কাঠখোট্টা, পানসে এবং অবাস্তব। সাদামাটা ভাষায় বলতে গেলে মেশিন-লার্নিং অ্যালগরিদম মূলত প্যাটার্ন শনাক্তকরণের মাধ্যমে কাজ করে। তাই এর প্রশিক্ষণের আকার যত বড় হয়, ফলাফলও তত উন্নত হয়। কিন্তু এআই সব সময়ই সর্বজনীন বা বৃহত্তর অর্থে সাধারণ বিষয়গুলোকেই গুরুত্ব দেয়। প্রমিত ও সাম্রাজ্যবাদী ভাষাতেই তার কাজ করতে সুবিধা। সেফারদিক ইহুদিদের আদি ভাষা কিংবা লাদিনো ভাষার বিভিন্ন সংস্করণ নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করেন। উত্তর দেবে, এ্যাঁ?! আক্কাদীয়, বাঘাতি, উইনহায়েক বা আনুকির মতো ভাষার ক্ষেত্রেও এআই তেমন কাজের না।
উপভাষা, আঞ্চলিক বাচনভঙ্গি, বিভিন্ন সহায়ক ভাষা এবং অনুরূপ ভাষাগত ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মার্ক টোয়েন তার 'এডভেনচারস অব হাকেলবেরি ফিন' (১৮৮৪) উপন্যাসে কথ্য ভাষার যে মিশ্রণ ব্যবহার করেছেন, তা এক অসাধারণ সাহিত্যিক সৃষ্টি। যদিও আদতে সেটা মিসিসিপি নদীতীরের কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের মুখের ভাষার নির্লজ্জ আত্মসাতের ফল।
আবার জুনো দিয়াজের 'দ্য ব্রিফ ওয়ানডারাস লাইফ অব অসকার ওয়াও'-এ (২০০৭) ব্যবহৃত স্প্যাংলিশ (স্প্যানিশ ও ইংরেজির মিশ্র ভাষা) ডিজিটাল জগতে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু সেই জগতে এই ভাষার আর বিবর্তন বা বিকাশ ঘটে না। কেবল পূর্ব লস অ্যাঞ্জেলেস, সান হুয়ান, স্প্যানিশ হারলেম, শিকাগোর লা ভিলিতা এবং সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত বিভিন্ন নগর এলাকাতেই সেই ভাষা আজও আমাদের চমকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এআই নতুন কোনো ভাষাতত্ত্ব নিয়ে আসে না, বরং আগে যা ছিল, তারই জাবর কাটতে থাকে।
কনভারসেশন অন ডিকশনারিস বইটি ২২টি ভাষার ২২ জন অভিধানপ্রণেতার সঙ্গে ২২টি আলাপচারিতার সংকলন। এতে তারা তাদের নিজ নিজ ভাষায় অভিধানের ঐতিহাসিক বিকাশ নিয়ে কথা বলেছেন। প্রাচীন গ্রিক, আরবি, চীনা, ইংরেজি, এসপেরান্তো, ফরাসি, জার্মান, হিব্রু, আইরিশ, ইতালীয়, জাপানি, নাহুয়াতল, স্প্যানিশ, কিচে, ইয়িদ্দিশ, স্প্যাংলিশ, ফ্রাংলে, পোর্তুনিওলের মতো সংকর ভাষাসহ নানা ভাষার অভিধানচর্চার ইতিহাস এখানে উঠে এসেছে।
প্রতিটি ভাষারই অভিধান গড়ে ওঠার স্বতন্ত্র ঐতিহ্য আছে। তবে আমার কাছে অভিধানই হলো ভাষার বিকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। অভিধানের ধারণাটিই বিস্ময়কর। একটি ভাষার সব শব্দকে দুই মলাটের ভেতরে ধরার প্রচেষ্টা। স্বাভাবিকভাবেই, সম্পূর্ণ বা অখণ্ড বলে কোনো অভিধান নেই। যত উচ্চাভিলাষীই হোক না কেন, সব অভিধানই সীমাবদ্ধ। সময়ের সঙ্গে তা পুরোনো হয়ে যায়, এমনকি হয়তোবা বিস্মৃতও।
আপনি এআইয়ের পক্ষপাতের কথা বলছিলেন। আদিবাসী ভাষার প্রথম দিককার স্প্যানিশ অনুবাদের মধ্যে থাকা পক্ষপাত বা সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ কি এআই দিয়ে শনাক্ত করা সম্ভব? যদি সম্ভব হয়, তাহলে কীভাবে? একজন গবেষক হিসেবে সেখানে আপনার ভূমিকা কী হবে?
মানুষের কোনো কাজই নিরপেক্ষ নয়। আর তাই মানুষের প্রয়োজনে তৈরি কোনো কৃত্রিম ব্যবস্থাও পক্ষপাতহীন না।
এআই দিয়ে অনুবাদ করার সবচেয়ে জটিল নৈতিক সমস্যাগুলো কী হতে পারে? বিশেষ করে যেসব ঐতিহাসিক রচনা অসম্পূর্ণ, অথবা আদৌ সম্পূর্ণ কি না, তা অনিশ্চিত তাদের বেলায়? বা আদিবাসী ভাষা এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল লেখার ক্ষেত্রে?
সব আয়নার মতো এআইও একটি মিথ্যা আয়না। আমরা নিজের মুখের যে ছবি তুলি, তা সেলফি হোক বা অন্য কারও তোলা ছবি, তাকে অসংখ্যবার সম্পাদনা, উন্নত বা বিকৃত করা যায়, প্রকৃত অবয়বের কাছাকাছি বা কমবেশি করা যায়। কিন্তু কোনোটাই কখনোই আমাদের প্রকৃত মুখ হয়ে উঠতে পারে না। কারণ, বাস্তব মুখটি কেবল এই মহাবিশ্বে অস্তিত্বশীল, অনাড়ম্বর, ক্ষণস্থায়ী এবং অধরা। রেমব্রান্ট বা ভ্যান গঘের যে আত্মপ্রতিকৃতি, তা কখনোই রেমব্রান্ট বা ভ্যান গঘ নন। অনুবাদের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। প্রতিটি অনুবাদই মূল রচনার অনুমান মাত্র।
ইংরেজিতে দোন কিহোতে দে লা মানচা উপন্যাসের প্রায় ২৪টি আলাদা অনুবাদ রয়েছে। বলা যায়, শেক্সপিয়ারের মাতৃভাষা ইংরেজি ২৪ রকমের দোন কিহোতে দ্বারা সমৃদ্ধ। কিন্তু স্প্যানিশ ভাষায় দোন কিহোতে ওই একটাই। সেটাই একমাত্র মূল রচনা। যদিও সেই মূল রচনা আবার নিজেকে আদি রচনাটির অস্পষ্ট লিপির ওপর স্থাপিত বলে মনে করে, যা-ও কিনা আরবি থেকে অনূদিত।
আমাদের সময়টা এখন বাড়াবাড়ির। চিকিৎসা, প্রযুক্তি, মানবিক যোগাযোগ—সবখানেই এআইয়ের আগমনকে সমস্ত মুশকিলের একমাত্র আসান হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এটা হয়তো আমাদের সভ্যতাকে বদলেই দেবে; কিন্তু একটা কাজ কখনোই করতে পারবে না। মানুষকে সুখী করা।
সুখ বা সন্তুষ্টির অনুভূতি আসে ভারসাম্য থেকে। আমাদের দক্ষতা আর আমাদের সীমাবদ্ধতার মধ্যকার অবিরাম দ্বন্দ্ব থেকেই সন্তুষ্টি জন্ম নেয়। এআই তথ্যপ্রবাহের গতি বাড়িয়ে দিবে। হয়তো মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়ার আগে বিলুপ্তপ্রায় ভাষার সংরক্ষণে সাহায্য করতে পারবে। একই সঙ্গে এটি উন্মুক্ত বাজারব্যবস্থায় চিন্তা ও শব্দের দ্রুত বিস্তারের মাধ্যমে সরকারব্যবস্থাকে অস্থিতিশীলও করে তুলতে পারবে। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক সরকারগুলোকে।
এআই তার সম্ভাবনা এবং ঝুঁকি দুই দিক থেকেই অসাধারণ। অস্ত্র নিয়ে আলোচনার মতোই, এআইয়ের চূড়ান্ত ব্যবহারও নির্ভর করে আমাদের ওপরই। কারণ, বন্দুক মানুষ মারে না, মানুষই মানুষকে মারে।
একজন শিক্ষক হিসেবে শ্রেণিকক্ষে এআইয়ের আবির্ভাব আমাকে উদ্দীপ্ত করে আবার উদ্বিগ্নও করে। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনায় কোনো না কোনোভাবে এআই ব্যবহার করছে—এমনটা বলা হয়। শিক্ষকদের অনুপাতটিও হয়তো কাছাকাছি, যদিও সব সময় স্বীকার করা হয় না। প্রযুক্তিকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত টেক্সাসের অস্টিন শহরে আলফা স্কুল নামে সম্পূর্ণ বেসরকারি শিক্ষার এক নতুন হুজুগ উঠেছে। সেখানে শিক্ষার্থীরা দিনের খুব অল্প কিছু সময় শিক্ষকের সঙ্গ পায়। বাকি সময় তারা এআইচালিত পর্দার সামনে কাটায়। টেক্সাস থেকে শিক্ষার এই মডেল মিয়ামি, নিউইয়র্কের মতো শহরগুলোতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
আমার দুশ্চিন্তা হলো, তথ্য এবং জ্ঞানের মধ্যকার পার্থক্য ক্রমে মুছে যাচ্ছে। তথ্য উন্মুক্ত এবং সর্বজনীন। সাধারণ কিছু দক্ষতা থাকলে যে কেউ তা পেতে পারে। কিন্তু জ্ঞান শুধু অভিজ্ঞতা লব্ধ বিষয় নয়, একরকম অন্তর্দৃষ্টিগত উপলব্ধিও। তথ্য আমাদের ভেতরে হজম হয়ে, ব্যক্তিগত হয়ে তারপর জ্ঞান হয়ে ওঠে।
অন্যভাবে বললে, তথ্যের কোনো শেষ নেই, কিন্তু জ্ঞান সীমিত। জ্ঞান ভুলকে অনুমোদন, এমনকি উদ্্যাপনও করে। জ্ঞানকে তার পূর্ণরূপে কখনোই পুনরুৎপাদন বা নকল করা সম্ভব নয়। করলে তা আবারও নিছক তথ্যে পরিণত হয়।
শ্রেণিকক্ষ হলো সেই জায়গা, যেখানে আমরা নিজের চিন্তাকে বদলাই। শ্রেণিকক্ষের প্রকৃত চালিকাশক্তি হলো সন্দেহ। সবকিছু জানা অসম্ভব। অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমেই আমরা নিজেদের সীমাবদ্ধতার বিষয়ে শিখতে পারি। শ্রেণিকক্ষেই মানব বুদ্ধিমত্তা নিশ্চিতভাবে নিজেকে প্রতিফলিত করতে বা আত্মপর্যালোচনা করতে পারে।
এই আত্মপর্যালোচনা অন্য মানুষের সংস্পর্শের ওপর নির্ভরশীল। মানব বুদ্ধিমত্তা কেবল সমবয়সীদের সঙ্গেই নয়, বরং অন্য প্রজন্মের, বড়দের সঙ্গে আদান-প্রদানের মাধ্যমেও বিকশিত হয়। শিক্ষকেরাই হচ্ছেন সেই বড়রা।
আজকাল শিক্ষকদের প্রতি এক গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। অথচ শিক্ষকেরা অভিজ্ঞ। তারা নিজেরাও একসময় শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ক্রমাগত প্রচেষ্টা ও প্রমাদের মধ্য দিয়ে শিখেছেন। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে যে মূল্যবোধের হস্তান্তর হওয়ার কথা, তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। শিক্ষকদের প্রতি অবিশ্বাস সেই সংশয়েরই লক্ষণ। আমাদের ভাঙাচোরা এ শতচ্ছিন্ন সময়ের এ এক বেদনাদায়ক সমালোচনা।
এআই একটি যন্ত্র। মানব বুদ্ধিমত্তা একটি জীবন্ত সত্তা। আমি কৃতজ্ঞ যে আমার জীবনের শেষ পর্যায়ে এআইয়ের উত্থান ঘটছে। না হলে স্বাধীনতা বলতে যা বুঝে এসেছি, তার অনেকটাই সংকুচিত হয়ে যেত।
(ঈষৎ সংক্ষেপিত)
