জাতিসংঘে বিশ্বব্যাপী এআই প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণের আহ্বান ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহীদের
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ও মানবজাতির জন্য এই অনিয়ন্ত্রিত বিকাশের সম্ভাব্য হুমকি এড়াতে—বিশ্বব্যাপী এই শিল্পের জরুরি তদারকি ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীরা। তারা সতর্ক করে বলেছেন, সঠিক তদারকি না থাকলে এআই গোটা বিশ্বের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে।
গতকাল বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনের ফাঁকে নিরাপত্তা পরিষদে (ইউএনএসসি) আয়োজিত এক বিশেষ বৈঠকে এই আহ্বান জানান তারা। ফ্রান্সের উদ্যোগে আয়োজিত এই বৈঠকে বিশ্বব্যাপী সংকট মোকাবিলায় নিয়োজিত ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদের সামনে শীর্ষ এআই উদ্যোক্তারা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
বৈঠকে জনপ্রিয় এআই চ্যাটবট ক্লড-এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) দারিও আমোদেঈ বলেন, "যদি এটি সঠিকভাবে পরিচালনা করা না হয়, তাহলে আমার মনে হয়—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গোটা মানবজাতির জন্যই বড় ধরনের ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।"
একই সুর মেলান তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান। নিরাপত্তা পরিষদকে তিনি সতর্ক করে বলেন, সঠিক পদক্ষেপ না নিলে মানবজাতি এআইয়ের ভবিষ্যতের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে।
বিশ্বনেতাদের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে অল্টম্যান বলেন, "এআইকে যদি গণতান্ত্রিক করতে হয়, তাহলে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কেবল সান ফ্রান্সিসকোর কয়েকটি গবেষণাগারে বসে নিলে চলবে না। এই সিদ্ধান্তগুলো অবশ্যই জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকারগুলোর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হতে হবে।"
বৈঠকে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যসহ নিরাপত্তা পরিষদের একাধিক সদস্য রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এই উদ্বেগের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তারা বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখনই এগিয়ে আসতে হবে এবং এই প্রযুক্তিকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তার একটি সাধারণ বৈশ্বিক রূপরেখা তৈরি করতে হবে।
ওপেনএআই-এর তৈরি এআই এজেন্ট-এর সাম্প্রতিক আক্রমণের শিকার হওয়া ওপেন-সোর্স এআই প্ল্যাটফর্ম 'হাগিং ফেস'-এর সিইও ক্লেমেন্ত দেঁলাজে নিরাপত্তা পরিষদকে জানান, আক্রান্ত হওয়ার পর তারা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই নিজেদের রক্ষা করেছেন। তিনি বলেন, ওপেনএআই-এর আক্রমণ প্রতিহত করতে তারা একটি চীনা এআই মডেলের সহায়তা নিয়েছেন, কারণ মার্কিন টুলগুলোর তুলনায় ওই চীনা মডেলে বিধিনিষেধ কম ছিল।
দেঁলাজে বলেন, "আমরা এআই দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলাম, কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমরা এআই দিয়েই আত্মরক্ষা করেছি।"
বিধিনিষেধে অনীহা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রে হলেও, দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এআই শিল্পে নতুন কোনো কড়াকড়ি বা নিয়ন্ত্রণ আরোপে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছে। নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি মাইকেল ক্র্যাটসিওস স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে এআই-এর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বা বিশ্বব্যাপী শাসনের যেকোনো প্রচেষ্টাকে আমরা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করি।"
অন্যদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন। তিন দিনের এই সফরে তিনি এআই নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আলোচনা করতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন শক্তিশালী এআই টুল তৈরির— প্রযুক্তিগত এক তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিযোগিতার কারণে উভয় দেশের কেউই—এ মুহূর্তে এআই রেসে নতুন করে বড় কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করতে চায় না।
তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জাতিসংঘ-বিষয়ক প্রধান ড্যানিয়েল ফোর্টি বলেন, এআই যে বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে—তা জাতিসংঘে ক্রমশ স্বীকৃত হচ্ছে। এআই প্রযুক্তিতে শীর্ষ দেশগুলো সহযোগিতার চেয়ে—এখাতের প্রবৃদ্ধির দিকে বেশি নজর দিলেও—আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন তৈরির প্রয়োজনীয়তা সবাই উপলব্ধি করছে।
এআই প্রযুক্তির সামরিক ব্যবহার, উদীয়মান অর্থনীতির শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং প্রযুক্তির মুক্ত ব্যবহার নিশ্চিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ইতোমধ্যে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। সাধারণ পরিষদ গত বছর এআই সম্পর্কিত দুটি নতুন সংস্থা গঠন করে—'ইনডিপেনডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্টিফিক প্যানেল অন এআই' এবং 'গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্নেন্স'।
ইনডিপেনডেন্ট সায়েন্টিফিক প্যানেলের সহ-সভাপতি এবং প্রখ্যাত কানাডীয় এআই বিশেষজ্ঞ ইয়োশুয়া বেনজিও বৈঠকে সতর্ক করে বলেন, "এআইয়ের বিপদগুলো এখন বাস্তব এবং আসন্ন। নিরাপত্তা পরিষদ আজ এমন এক নজিরবিহীন হুমকির মুখে পড়েছে, যা কোনো একক সদস্য রাষ্ট্র বেছে নেয়নি বা একাকী তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। কারণ এই প্রযুক্তি আমাদের ভৌগোলিক সীমান্তকে তোয়াক্কা করে না।"
