বোকা বাকশোর কথকতা
টেলিভিশন তার এক শ বছরে পা দিল। মাত্র এক শ। মানুষের বিশাল ইতিহাসের কাছে এই একটি শতক বিন্দুবৎ। তবু এই একটি শতকেই টিভি আমূল বদলেছে, মানুষকেও বিচিত্র উপায়ে বদলে দিয়েছে। বিশ্বযুদ্ধ ও তদপরবর্তী পৃথিবীতে টিভি প্রথম ছিল বৈঠকখানার কেন্দ্রে–ঘরের মানুষ গোল হয়ে ঘন হয়ে স্থির হয়ে দেখত। একসময় টিভি গিয়ে ঢুকল শোবার ঘরে–সকল শৈত্যে-স্থবিরতায়-যোগাযোগহীনতায় সে টেনে দিল একটি সেতু-আর কিছু না হোক যুগল পাশাপাশি বসে টিভি দেখতে লাগল।
এরপর টিভি চলে এল আরও সন্নিকটে, একা একাই লোকে নিজের গ্যাজেটে টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখতে পেল। দেখা গেল–সমাজ খণ্ডিত হয়েছে, পরিবার বিভাজিত হয়েছে, মানুষ আরাও একা হয়েছে... তবু টিভি তার সঙ্গ ত্যাগ করেনি, রেলকামরার জানালায় দেখা আকাশের চাঁদের মতো সে হনহনিয়ে ছুটে চলেছে মানুষের সঙ্গে।
এককালে টিভিতে নির্ধারিত অনুষ্ঠানের জন্যে মানুষ প্রতীক্ষা করত, এখন মানুষ টিভির এই অসংখ্য চ্যানেলের বিচিত্রমুখী দশদিকগামী অনুষ্ঠানমালা থেকে পালিয়ে হাঁপ ছাড়ে। তবু 'হোম অ্যালোন' মুভির শিশুশিল্পী ম্যাকলে কুলকানের মতো আমরা অনেকেই দিব্যি বলে উঠতে পারি 'টিভি ইজ মাই লাইফ!' এমন এক দাঁড়ের হীরামন এই টেলিভিশন, যে খাবে-দাবে না কিন্তু কলকলাবে। কুমোরের আঙুলের মতো সতত আপনার জীবনের ভেজা মাটির পিণ্ড ছুঁয়ে থাকবে, আকার দেবে আপনার মনমানস-সংস্কৃতি-রাজনীতি সচেতনতাকে।
শুরুর কথা
কভেন্ট গার্ডেনে জন বেয়ার্ডের স্টুডিওর টেলিভাইজর থেকে আজ অবধি কত বিশাল সব যান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা আর মাইলফলক পেরিয়ে আজকের টিভি ঘরে ঘরে নাচ-গান, জাদু, নাটক, সিনেমা, শিক্ষামূলক ডকুমেন্টারি, যুদ্ধ, জাতের গরিমা-লাঞ্ছনা, যুদ্ধাপরাধ ইত্যাদি কত কী দেখাচ্ছে বোঝাচ্ছে। উত্তাল সপ্রশ্ন মন, রোমান্সে দোলায়িত মন, অপরের দুঃখে সজল মন সবই টিভি উৎপাদন করতে সক্ষম। শুরুর দিকে–১৯৩০ সালের জুলাই মাসে বিবিসি প্রযোজক লান্স সিভকিং প্রথম টিভি নাটক সম্প্রচার করলেন, নাম 'দ্য ম্যান উইথ দ্য ফ্লাওয়ার ইন হিজ মাউথ'–ফুলমুখে লোকটা। নাটকের প্রথম দৃশ্যে পর্দায় পথতরু শোভিত একটি অ্যাভিনিউ আঁকা। যদিও পরে কথা বলতে থাকা মানুষের মুখ দেখা যাচ্ছিল, একটি লোক আরেকটি লোককে নিজের মুখের টিউমারের নাম শোনাচ্ছিল–'এপিথিলিওমা… শুনলেই যেন মনে হয় কবিতার চরণ তাই না?'
প্রথম টিভি নাটক দেখতে খানিকটা সচিত্র রেডিও নাটকের মতো হলেও নাকি ব্যগ্র দর্শককে টেনে রাখতে ব্যর্থ হয়নি। বিবিসি টেলিভিশন সার্ভিস তার সম্প্রচার শুরু করে ১৯৩৬-এ, দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের এই সময়টুকু ব্রিটিশ টিভি নাটক যথারীতি গভীরভাবে রেডিওর শ্রুতিনাটক প্রভাবিত ছিল। ১৯৩৭-এ প্রথম বিবিসি টিভিতে উইম্বলডন সম্প্রচার করে, ১৯৩৮-এ যোগ হয় 'স্পেলিং বি' নামক কুইজ শো। ১৯৩৯-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিবিসি টেলিভিশন শেষবারের মতো ডিজনির কার্টুন দেখিয়ে সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়, টিভি রিসিভার বানানোই বন্ধ হয়ে যায়, ১৯৪৬-এ আবার শুরু হয় তার যাত্রা, সেই একই মিকিমাউসের কার্টুন দেখিয়ে।
ত্রিশের দশকেই সিনেমা টেলিভাইজড হতে শুরু করে। ছয় পর্বে ভাগ হয়ে ষাট মিনিটের নির্বাক চলচ্চিত্র আসে দশ মিনিটের সাপ্তাহিক পুরিয়া হিসেবে। 'দ্য ক্রুকেড সার্কল' যখন টিভিতে সম্প্রচারিত হয়, তখন মুষ্টিমেয় লোকের কাছে টিভি আছে। চল্লিশের দশকের শুরুতে বব হোপ আশা ব্যক্ত করেন, এমন একটি যন্ত্রের মাধ্যমে পুলিশের কার্যক্রম আরও সফলভাবে পরিচালিত হতে পারবে–সহজেই হারানো বিজ্ঞপ্তি প্রচারিত হতে পারবে–বাড়ির কাজের লোকটি ফেরারি আসামি কি না, তা-ও জানা যাবে; ফুটবল খেলা দেখবার উল্লাস আর উত্তেজনা উপভোগের আশায় খেলার মাঠে টিকেট কেনার হুজ্জোত পোহাতে হবে না, টেলিভিশন ঘরেই এনে দেবে ফুটবল খেলার মাঠ; ছবিঘরও চলে আসবে ঘরে।
হলিউডের বড় বড় স্টুডিও তখন তাদের সিনেমাগুলো টেলিভিশনে মুক্তি দিতে চাইত না–নিজের রেভিনিউয়ের একটা বড় অংশ টিভিকে দিতে গররাজি ছিল তারা, তবে পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি এসে তাদের এই গড়িমসির প্রবণতা চলে যায়। ১৯৩৩ এর মুভি 'কিংকং'-এর প্রিমিয়ার হয় ১৯৫৬-এর নেটওয়ার্ক টেলিভিশন পর্দায়। কলম্বিয়া পিকচার্স তাদের ১৯৪৮-এর আগের মুভিগুলো টিভিতে দেখাতে রাজি হয়। এমজিএম পিছিয়ে থাকেনি, সিবিএস নেটওয়ার্কে আড়াই লাখ ডলারের বিনিময়ে তারা টেলিভিশনেই প্রথম দেখায় ফিচার ফিল্ম 'দ্য উইজার্ড অব অজ'।
টিভি তার মায়াজালে জড়িয়ে নিল ছোট শিশুদেরও। ১৯২৮-এ 'ফিলিক্স দ্য ক্যাট' পরীক্ষামূলকভাবে সম্প্রচারিত হলো, ১৯৩৮-এ এনবিসি দেখাল আট মিনিট দীর্ঘ প্রথম কার্টুন–'উইলি দ্য ওয়ার্ম'। ডিজনি কার্টুন 'ডনাল্ডস কাজিন গাস' শুরু হলো কাছাকাছি সময়ে। তবে নিয়মিত কার্টুন দেখানো শুরু হলো এর বছর দশেক পর, নাম 'ক্রুসেডার র্যাবিট'। ওয়াল্ট ডিজনির অ্যানিমেটেড মুভিগুলোর আদলে এল ওয়ার্নার ব্রাদার্সের 'লুনি টুনস' আর 'মেরি মেলডিজ', বাগস বানি, ড্যাফি ডাক, স্পিডি গঞ্জালেস আর টুইটিবার্ডের আনন্দময় উন্মাদ দুনিয়া। কে ভুলতে পারে দুষ্টু 'পেপে লে পিউ' আর 'সিলভেস্টার'কে।
এমজিএম নিয়ে এল 'টম অ্যান্ড জেরি' কার্টুনস। পঞ্চাশের দশকে এল 'মাইটি মাউস' (বিটিভির সুবাদে ত্রিশ বছর পর এটা হয়ে উঠবে আমাদের প্রিয় কার্টুনগুলোর একটি), এমজিএম ১৯৫৭-এ তার কার্টুন স্টুডিও বন্ধ করে দেবার পর দুটি লোক সরাসরি টিভির জন্য কার্টুন নির্মাণ করতে শুরু করলেন, পৃথিবীময় লক্ষ লক্ষ শিশু তাদের শৈশবের রঙিন বিকেলের জন্য এই দুজন মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। এঁরা হলেন উইলিয়াম হান্না আর যোসেফ বারবারা। ষাটের দশক নাগাদ চলে এল 'দ্য ফ্লিন্টস্টোনস', নিয়মিত কার্টুন শো। শুধু কি কার্টুন? বিবিসি ১৯৫৭-এ শুরু করল 'ফর দ্য স্কুলস'- কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সংস্কৃতি, চাষাবাদ আর জীববিদ্যা নিয়ে প্রোগ্রাম।
বোকা বাকশো
টেলিভিশনকে কেন বোকা বাকশো ডাকা হতো? প্রথমত, টিভি আসত বাকশোর সাইজে। আহাম্মকরা সেটা আয়েস করে বসে দেখত, যা দেখায় তাই নেশাড়ুর মতো গোগ্রাসে দেখত। টিভি বিনোদনে একটা পরোক্ষ ব্যাপার আছে, এ তো ফুটবল নয় যে ঘেমে নেয়ে মাঠে খেলতে হবে, নাচ-গান নয় যে নিজে মকশো করতে হবে, এমনকি দর্শকের মতামত দেবারও কোনো উপায় নেই এতে। অন্যে করবে, টিভি দর্শক কেবল পা নাচিয়ে বা এলিয়ে পড়ে সেটা দেখবে, সে অলস ভোক্তামাত্র। পঞ্চাশের দশকে তাই টিভি একরকম আহাম্মুকি বিনোদন হিসেবে বিবেচিত হতো, ওটাকে ইংরেজিতে ইডিয়ট বক্স ডাকতে শুরু করেছিল লোকে।
হরেক রকম বাজি ও বারুদের কারখানা টিভির পেটের ভিতর, অতএব মূর্খতার সঙ্গে সনামসখা হতে টিভি আপত্তি শুরু করল। বোকা বাকশোর স্টেরিওটাইপ থেকে টিভি অক্লেশে বের হতে পারল তার অসংখ্য শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, খবর, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ইতিহাসভিত্তিক এবং নেচার ডকুমেন্টারি দিয়ে।
বিশ্বব্যাপী যে সাংস্কৃতিক যোগসূত্র টিভি বুনে দিয়েছে, তা অভাবনীয়, অতুলনীয়–বিটিভি প্রসঙ্গে সেটা এ লেখায় বিস্তারিত লিখব। বিবিসির জন রিথ একবার বলেছিলেন, রেডিও ওয়েভ দিয়ে অজ্ঞানতার মেঘ কাটাবার উপায় হচ্ছে টিভিতে ক্ল্যাসিক সিরিয়াল সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা। বিবিসি তার বিনোদনযাত্রা শুরুই করেছিল ডিকেন্সের 'আ ক্রিসমাস ক্যারল' আর অ্যান্থনি হোপের 'দ্য প্রিজনার অব জেন্ডা' দিয়ে। সংস্কৃতি, বিনোদন, চিন্তা, উদ্ভাবন, আচরণ সবেতেই টিভি নিজেকে জড়িয়েছে, জন রিথ যে মেঘকাটা রেডিওওয়েভ চেয়েছিলেন–তা বাস্তবায়িত হয়েছে, হচ্ছে। টিভি নিজেই অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি আর্টফর্ম।
পাবলিককে সে যা খাওয়াবে, তা-ই খাবে, এমন দায়সারা ভূমিকা থেকেও বের হয়ে এসেছে টিভি। স্মার্ট টিভি আর অনডিমান্ড স্ট্রিমিংগুলোই তার প্রমাণ। মানুষের ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে সম্মান দিতে টিভিকে বদলাতে হয়েছে, মিথষ্ক্রিয় হতে হয়েছে। পক্ষপাতদুষ্ট খবরের নিপুণ হাতমকশো আর বিজ্ঞাপনের মিষ্টি প্রতারণা আজও মূর্খ লোককে জড়ো করতে সক্ষম হয়তো, তবে বেশিক্ষণের জন্য নয়। বোকামো একালে বেশিক্ষণ টেকে না বলেই হয়তো টিভির এই দুর্নাম খানিকটা ঘুচে গেছে। আমজনতার বোকা বাকশোতে তাকে আর বাক্সবন্দী করা যাবে না।
অলস সময়ে, মানসিকভাবে বিকল মুহূর্তে অথবা অসুখের বিবশ বেলায় লোকে আগে অপলক কী দেখত? পুকুরের নিথর পানিতে পোকার খেলা? নাকি আকাশে নেই হয়ে যেতে থাকা মেঘের ভেলা? মাঠের কিনারে দিগন্তের রেখা? এখন অনেককাল হলো শহরে-জনপদে তেমন পুকুর নেই, আকাশ নেই, দিগন্ত নেই, কিন্তু মানুষকে তো খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকতে হবে... তাই সে নির্বিবাদে টিভির পর্দায় একদৃষ্টে চেয়ে থাকে। 'অর্থ নয় কীর্তি নয় সচ্ছলতা নয়' মুহূর্তে সে খুঁজে নেয় টেলিভিশনকে।
অনর্গল কলরবের কার্নিভালের দিকে চেয়ে চেয়ে বিপন্নতার কাল ক্ষয় করে। যার কেউ নেই, সে ক্রিসমাস টিভির সর্বরোগহর বি-গ্রেড মুভিতে প্রেমিক-প্রেমিকার মিলন দ্যাখে বিভোর হয়ে। অন্যের হাসি, প্রেম, সুখকল্লোল দেখে আপন বিষাদ ভোলে। মন্দ কি!
টেলিভিশনের স্বর্ণযুগ
টিভির প্রথম স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১৯৪৭-এ। বিশ্বযুদ্ধকালীন বিরতির পর টিভি স্টুডিওগুলো বিপুল বেগে তখন বাজারে নেমেছে। সাধারণ মানুষের হাতে টিভি সেট কিনবার পয়সা এসেছে। এ যুগে টিভি নানান গেমশো সরাসরি সম্প্রচার করা শুরু করে, বিনোদন হিসেবে যুক্ত হয় কুইজ শো, প্যানেল শো, লাইভ ড্রামা ও স্টুডিও পারফরম্যান্স, লেটনাইট টকশো, আর ব্লু কলার সিটকম। শেকসপিয়ারের নাটক থেকে চাইকস্কির ব্যালে-টিভি সকলি সম্প্রচার করতে শুরু করে, সিন্ডারেলা থেকে পিটার প্যান সক্কলেই হাজির টেলিভিশনে। রেডিওর শনিবার বিকেলের ম্যাটিনিকে প্রতিস্থাপন করে টিভি ওয়েস্টার্নস।
শহরের উন্নাসিক বৈঠকখানা থেকে গ্রামের আসরে মেতেছিল টিভি অনুষ্ঠান। গ্রাম্য সিটকম, ভ্যারাইটি শো আর হলিউডের কেচ্ছায় ভরে গেছিল টিভি। ১৯৬১ সালে একটি বক্তৃতায় ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের চেয়ারম্যান নিউটন মিনো বললেন, 'টিভি অনুষ্ঠান যখন উৎকৃষ্ট, তখন সে থিয়েটার-ম্যাগাজিন কিংবা খবরের কাগজের চেয়ে শ্রেয়। কিন্তু টিভি অনুষ্ঠান যখন বাজে হয়, তখন তা আর সব আবর্জনাকে ছাড়িয়ে যায়।
সমস্ত বই, ম্যাগাজিন, খবরের কাগজ, লাভক্ষতির খতিয়ান পাশে সরিয়ে রেখে কেউ যদি আজকের জমানায় ক্রমাগত টিভি দেখে যায়-সে আবিষ্কার করবে, সে এক দিগন্তব্যাপী পতিত জমিনে দাঁড়িয়ে আছে। গেমশো, অবিশ্বাস্য সব পরিবারের পটভূমিতে ফরমুলা কমেডি, রক্তপাত-খুন-জখম-অত্যাচার, ওয়েস্টার্ন ভালো মানুষ বনাম ওয়েস্টার্ন খারাপ মানুষ, গুন্ডা-খুনি-গুপ্তচরের দল আর কার্টুন। তার সঙ্গে অসংখ্য বিজ্ঞাপনের চিৎকৃত বয়ান। সামান্য সত্যিকারের বিনোদনের বিপরীতে একঘেয়েমির অসামান্য আয়োজন।' মিনো চাইলেন, জনমানুষের এ তরঙ্গদৈর্ঘ্য যেন জনমানসের উত্তরণে সমর্পিত হয়।
ষাটের দশকের মাঝামাঝি দেখা গেল–এনবিসি, এবিসি আর সিবিএস ভরে গেছে একই রকম অনুষ্ঠানে, যেন দর্শকেরা অসংস্কৃত গেঁয়ো মানুষ, কাউবয় আর স্পাই ছাড়া কাউকে দেখতে চায় না। ষাটের শেষাশেষি সিবিএস কিছু প্যানেল গেমশো বন্ধ করে দেয়। সত্তরের দশকে এসে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেয় ব্রডকাস্ট টিভি, তারা 'দ্য বেভারলি হিলবিলিজ', 'পেটিকোট জাংশন', 'গ্রিন একর'-এর মতো গ্রামীণ বিষয়ভিত্তিক সিটকম সম্প্রচার বন্ধ করে দেবে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো রক্তক্ষয়ী সমসাময়িক ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে যেতে রাজি নয় সত্তরের তরুণসমাজ। পৃথিবীময় মানুষ জেগে উঠছে ব্যথায়, প্রশ্নে, যুক্তিতে, রক্তক্ষয়ে, টিভি শুধু ফুল ফোটালে কি আর চলে!
আশির মাঝামাঝি থেকে নব্বই দশকের শেষ দিক এবং ২০০০ সাল হয়ে একবিংশ শতকের শুরুর সময়কে ধরা হলো টিভির দ্বিতীয় সোনালি যুগ (সময়কাল নিয়ে নানান বিবাদ আছে)। নব্বইয়ে রমরমিয়ে এল কেবল চ্যানেল। ডিসকভারি চ্যানেলের ডকুমেন্টারি, বিবিসির প্ল্যানেট 'আর্থ সিরিজ' দিয়ে তুঙ্গে উঠল এ যুগের সুবর্ণ-গরিমা। এল 'দ্য ওয়েস্ট উইং'-এর মতো রাজনৈতিক ড্রামা, 'সেক্স অ্যান্ড দ্য সিটি'র মতো রোম্যান্টিক কমেডি-ড্রামা, 'দ্য ওয়্যার' বা 'দ্য সোপ্রানোজ'-এর মতো অপরাধভিত্তিক ড্রামা, 'ব্যাটলস্টার গ্যালাক্টিকা'র মতো মিলিটারি সায়েন্স ফিকশন টিভি সিরিজ, 'গ্রেজ অ্যানাটমি'র মতো মেডিক্যাল ড্রামা, 'ব্যান্ড অব ব্রাদার্স'-এর মতো ওয়ার-ড্রামা।
পঞ্চাশের দশকের রঙিন টিভির অর্ধশতক পর টিভির ইতিহাসে এসেছে আরেক চাঞ্চল্যকর উৎকর্ষ–তার নাম ডিজিটাল টিভি প্রযুক্তি, এসেছে এইচডিটিভি, অনলাইন ভিডিও প্ল্যাটফর্ম, টিভি স্ট্রিমিং, ওয়েব টিভি। এক ধাক্কায় টিভির সম্প্রচার সময় ঘণ্টা বেড়ে গেছে, কনটেন্ট নির্মাণে এসেছে জোয়ার।
টিভি রিমোটের বোতামের নাগালে চলে এসেছে নেটফ্লিক্স। নেটফ্লিক্স, আমাজন ভিডিওর মতো কোম্পানিগুলো মুখিয়ে আছে মৌলিক কনটেন্টের আশায়। নেটফ্লিক্সে ফুল সিজন রিলিজ দেওয়া হচ্ছে, কাঙাল দর্শকও পড়েছে শাকের খেতে, গোগ্রাসে গিলছে। অতিমারি অনেক কিছুকে ধসিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছে, কেবল-টিভির রাজত্ব তার একটি। বলা হচ্ছে, টিভির সুবর্ণযুগ সমাপ্ত হয়েছে ২০১০ দশকের শেষ দিকে।
টিভির একশতকীয় শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত
এই উত্তাল টিভি শতকে যেসব আনন্দ-বেদনা-সংকটের মুহূর্তে টিভিকে ঘিরে সারা দুনিয়া এক হয়েছিল, সেসব কী কী? ১৯৪৭-এ টিভি পর্দায় ১৫ মিনিটের নীরব কার্টুনে দেখানো হলো রাজকন্যা এলিজাবেথ রাজপুত্র ফিলিপকে বিয়ে করছেন। পরের বছর লন্ডন অলিম্পিকের উদ্বোধনী পর্ব দেখানো হলো ৩৫ মিনিটের একটি অনুষ্ঠানে।
১৯৫১-তে সিবিএস সম্প্রচার করল 'দ্য আমোস ন অ্যান্ডি শো', সব কটি চরিত্র কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান–চরিত্রগতভাবে অলস, ভোঁতা, নীতিহীন, এনএএসিপির (ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অভ কালারড পিপল) প্রচণ্ড প্রতিবাদের মুখে এই শো বন্ধ করা হলো। রানি এলিজাবেথের রাজসিংহাসনে অভিষেক হলো ১৯৫৩ সালের গরমকালে, শাদাকালো টিভিতে সাতাশ মিলিয়ন বিমুগ্ধ ব্রিটিশ দেখলেন, আন্তর্জাতিকভাবেও সম্প্রচারিত হলো সেই রাজকীয় অনুষ্ঠান।
১৯৫৪-এ সম্প্রচারিত হলো প্রথম সোপ অপেরা- 'দ্য গ্রোভ ফ্যামিলি'। ১৯৫৫ সালে প্রথমবারের মতো বিজ্ঞাপন দেখা গেল ব্রিটিশ টিভিতে–টুথপেস্টের বিজ্ঞাপন, এ বছরই বিবিসির 'ওথেলো'তে প্রথমবারের মতো টিভি পর্দায় পরস্পরকে 'আন্তর্জাতিক' চুমো খেলেন শাদা ও কালো মানুষ।
ইউরোভিশন সঙ্গীত প্রতিযোগিতা প্রথম টেলিভাইজড হলো ১৯৫৬ সালে। রানি এলিজাবেথ ক্রিসমাসে প্রথমবারের মতো টিভিতে প্রজাদের রাজ-অভিবাদন জানালেন। ষাটের শুরুতে আরম্ভ হলো দীর্ঘতম ধারাবাহিক 'করোনেশন স্ট্রিট', আজও তা চলছে। ১৯৬৩ সালে টিভিতে জন এফ কেনেডির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া দেখল বিহ্বল আমেরিকা। একই বছর 'ডক্টর হু' সিরিজ শুরু হলো।
প্রথমবারের মতো টিভিতে লাইভ ব্রডকাস্টের সময় এক নাট্যসমালোচক 'ফাক' শব্দটি উচ্চারণ করলেন ১৯৬৫ সালে, রানির কাছে চিঠি লিখল ক্ষুব্ধ জনতা, বিবিসি ক্ষমা চাইতে বাধ্য হলো। ১৯৬৬-এর বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনাল আজও সর্বোচ্চসংখ্যক দর্শকের দেখা ব্রিটিশ টিভি অনুষ্ঠান। ১৯৬৯-এ চন্দ্রে অ্যাপোলো ১১ তথা মানুষের অবতরণ দেখল পৃথিবীময় সাড়ে ছয় শ মিলিয়ন টিভির দর্শক, একই বছর নশ্বর এ ধরাধামে রাজপরিবারের দিনলিপি দেখানো হলো একটি ডকুমেন্টারিতে–রানি এলিজাবেথ পরে এর সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন।
১৯৭০-এ বিবিসি প্রোডাকশনে এক পুরুষ চুমু খেলেন আরেক পুরুষকে, নারীও নারীকে টিভি পর্দায় প্রথম চুমু খেলেন একই বছর। ১৯৮১ সালে সারা পৃথিবীর টিভি দর্শক প্রেমে পড়ল উনিশ বছরের এক রাঙা রাজকন্যার, নাম তাঁর প্রিন্সেস ডায়ানা, বিয়ে করলেন যুবরাজ চার্লসকে।
১৯৮৫ সালে ষোলো ঘণ্টার চ্যারিটি কনসার্ট 'লাইভ এইড' কাঁপিয়ে দিল বিশ্ব, দেড় বিলিয়ন মানুষ দেখলেন মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য। ১৯৮৯-এ বার্লিন ওয়ালের ভাঙন সরাসরি সম্প্রচারিত হলো টিভির পর্দায়। শিশিরভেজা চেহারার সেই সে রাজকন্যা মানুষের হৃদয়ের রানি হতে চেয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন ১৯৯৭-এ, প্রিন্সেস ডায়ানার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্প্রচারিত হবার সময় কমার্শিয়াল চ্যানেলগুলো সেদিন তাদের বিজ্ঞাপন প্রচার করা বন্ধ রাখল।
ভুটান পৃথিবীর শেষ দেশ হিসেবে টিভি দেখবার সুযোগ পেল ১৯৯৯-এ। আর ২০০১-এ টিভিতে টুইন টাওয়ার ধসে যেতে দেখল মানুষ, আন্তর্জাতিক বিদ্বেষে এর পর থেকে আর কোনো রাখঢাক রইল না।
বিটিভি–বাংলাদেশ টেলিভিশন
এবার আসি ব্যক্তিগত প্রিয় প্রসঙ্গ বিটিভিতে। আমি সেই প্রজন্মের মানুষ, যার শৈশব একক হাতে বিটিভির তৈরি। হান্না-বারবারার 'ফ্লিন্টস্টোনস', 'স্কুবি-ডু', 'দ্য জেটসনস', 'ক্যাপ্টেন কেভম্যান', 'স্পাইডারম্যান', 'দ্য স্মার্ফস' থেকে 'হংকং ফুঈ'–পরে 'কিসিফার', 'কেয়ারবিয়ার', 'ফ্যাট অ্যালবার্ট', 'দ্য নিউ অ্যাডভেঞ্চারস অব গিলিগ্যান', আরেকটু বড় হলে 'থান্ডারক্যাটস', 'হিম্যান', 'ফ্ল্যাশ গর্ডন', 'ডিফেন্ডারস অব দ্য আর্থ'...সমস্ত কার্টুনই দেখিয়েছে বিটিভি। হয়তো বাকি পৃথিবী দেখবার দশ-বিশ-ত্রিশ বছর পরে, কিন্তু নিজের অভুক্ত শিশুদের জন্য আঁচলভরা খুদ কুড়িয়ে আনা মায়ের অধ্যবসায়ে।
'এনশান্ট স্পিরিটস অব ইভল, ট্রান্সফর্ম দিস ডিকেয়িং ফর্ম টু মাম-রা দি এভারলিভিং'...থান্ডারক্যাটসে দুর্বৃত্ত মাম-রার এই ভয়ানক হুংকার শুনলে আজও আমার সেই শিশুবেলার মতোই ভয়ে বুক কাঁপে, যেন চোখের সামনে দেখতে পাই–বহুকালমৃত প্রেত আবার বিশালকায় অমর দানব রূপে ফিরে আসছে! আজও আমি ইউটিউবে খুঁজি হাতে আঁকা প্রিয় কার্টুন সিরিজ–'দ্য ইয়ারলিং', 'ভলট্রন- ডিফেন্ডার্স অব দ্য ইউনিভার্স'।
কার্টুনের পর দেখেছি 'ব্রিং দেম ব্যাক অ্যালাইভ' বা 'দ্য গোল্ডেন মাংকি'র মতো মজাদার সিরিজ, 'হাকলবেরি ফিন', 'ব্ল্যাক বিউটি', 'দ্য পাওয়ারস অব ম্যাথিউজ স্টার', 'ফ্যামিলি টাইজ', 'সিলভার স্পুন', 'বিল কসবি শো', শেলি দুভ্যালের 'ফেয়ারিটেল থিয়েটার' রূপকথাসমগ্র, 'পারফেক্ট স্ট্রেঞ্জার্স'।
বিটিভিতে আমার ছিল 'লিটল হাউজ অন দ্য প্রেইরি' আর 'ভয়েজার্স!', ভাইয়ের ছিল 'নাইট রাইডার'। মুভি অব দ্য উইকে আমরা দেখতে পেয়েছি হলিউডের সুবর্ণযুগের প্রায় সমস্ত মুভি, বিশ্বযুদ্ধকে ভিত্তি করে নির্মিত মুভি দেখে চোখের জল মুছেছি। একে একে চিনেছি গ্রেগরি পেক, ক্যারি গ্র্যান্ট, গ্যারি কুপার, অ্যান্থনি কুইন, ওমর শরিফ, সোফিয়া লরেন, এলিজাবেথ টেলর, পল নিউম্যান... বিটিভির কল্যাণে। টিভিতে দেখানো হতো সিরিজ–'নর্থ অ্যান্ড সাউথ', 'প্রিন্সেস ডেইজি', 'দ্য ফল গাই', 'ডালাস', 'স্টারট্রেক', 'সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান', 'স্পেন্সার ফর হায়ার', 'স্টিং রে', 'মায়ামি ভাইস'।
সব যে দেখতে পেতাম, তা-ও নয়, দশটার খবরের পর তো জেগে থাকাই বারণ ছিল, আব্বা দেখত 'দ্য পেপার চেজ' বা 'মার্ডার শি রোট'। 'চার্লিস এঞ্জেলস'-এর মেয়ে তিনটির চুলের ধরন দেখে খালারা চুল কেটে আসত। 'দ্য এ-টিম' আর 'ম্যাকগাইভার' আমাদের প্লেগের মতো আক্রমণ করেছিল, বহুকাল সারেনি। বিটিভি এমনিতে প্রায় ভাশুরশ্রেণির দৌরাত্ম্য দেখাত–ঘ্যাঁচ করে ইংরেজি সিনেমার চুমু কেটে দিত, অথচ 'ছায়াছন্দ'র তদধিক অশ্লীল জড়াজড়ি কাটত না। অত সেন্সরশিপের পরও বিটিভি কেন যে স্থূলরসিকতায় ভরা ব্রিটিশ 'ক্যারি অন' সিরিজ আর জার্মান 'ডিডিজ কমেডি শো' পরিবেশন করত, কে জানে! ইংরেজিতে অনুষ্ঠান দেখবার সুবাদে আমরা আমাদের প্রাথমিক ইংরেজি শিখেছিলাম।
শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে ইলেকট্রিক সার্কিট শেখাতেন একটি ঘর্মাক্ত মানুষ, আমার তাঁর নাম মনে নেই। 'নতুন কুঁড়ি' প্রতিযোগিতা নিয়ে অভিভাবকদের প্রতিযোগিতা ভুলব না। 'কিশলয়' অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা এসে নাচ-গান-অভিনয় করত, এখনো আমার মনে পড়ে ময়মনসিংহের ছেলেমেয়েরা পায়ের পাতা ঠুকে গাইছে–'নয়নের কোণে একটি কোনা নেত্রকোনা নাম!'
যখন আর কিছু থাকত না হাতে, তখন বিটিভি দেখাত বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন থেকে জন রাস্কিন হয়ে ড. লুৎফর রহমানের বাণী, একটি স্থির পর্দার ওপর নীতিকথা লেখা–'যা তুমি আজ করিতে পারো, তা কখনো কালকের জন্য ফেলিয়া রাখিও না।' 'হিজল-তমাল', 'ভরা নদীর বাঁকে', 'দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া' এসব অনুষ্ঠান দেখাত বাংলাদেশের আপন ঐশ্বর্য–লোকগানে, লোককথায়।
'হীরামন' নামের একটি অনুষ্ঠানে ফোক-টেলস দেখাত, ভীষণ জনপ্রিয় ছিল সেই অনুষ্ঠান। দেখাত নাচভিত্তিক অনুষ্ঠান–'নৃত্যের তালে তালে', আর রাগসঙ্গীত নিয়ে 'রাগরঙ'। একসময় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান 'যদি কিছু মনে না করেন' খুব বিখ্যাত হয়েছিল, তারপর 'ইত্যাদি'; আসাদ চৌধুরীর 'প্রচ্ছদ' এবং আনিসুল হকের 'এখনই' এবং 'জলসা' নামের অনুষ্ঠানের কথাও এখানে উল্লেখ করতে চাই। হুমায়ূন আহমেদের কিচেনসিংক ড্রামা 'এইসব দিনরাত্রি' অবিস্মরণীয়, তিনি বহুকাল ঈদের নাটকে মানুষকে মাতিয়ে রেখেছিলেন। ভূপেন হাজারিকা এসে বাংলাদেশের মানুষের গায়ে অসমিয়া সুর-তালের দোলা লাগিয়ে দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের সবচেয়ে চমকপ্রদ সময় এসেছিল দুইবার, প্রথমবার সার্কের সময়, দ্বিতীয়বার টেলিভিশনের পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে। সার্কে টিভি পর্দায় উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেনকে দেখা যাবে এই আকুল অপেক্ষায় তিন প্রজন্মের নারীকে আমি বেলা শুরুর আগেই রান্নাবান্না শেষ করে ফেলতে দেখেছি। 'মায়ামৃগ' দেখাল, কয়েক দিন গাল ফুলিয়ে আমরাও গাইলাম, 'ও বকবকবক বকম বকম পায়রা'।
'দীপ জ্বেলে যাই' দেখে গাইতে লাগলাম–'তোমার মতো সিস্টার, এমন বন্ধু আর কে আছে?' 'পাশের বাড়ি' সিনেমার 'ও পলাশ বনের মুকুল, ও আকাশ রাঙানো মুকুল, এই রিমিক ঝিমি ঝিমি ঘনবরিষণে', আর ধনঞ্জয়ের গলায় 'নয়নে তারি ভোমরা কাজল কালো' এসব গান ঝাপসা ক্যামেরা ভেদ করেও আমাদের মনে দোলা দিয়েছিল–সাবিত্রীর মতো করে ঠিক ডাকতে পারতাম–'ক্যাবলাদা!!' বিটিভির রজতজয়ন্তীতে কত রকমের অনুষ্ঠান যে দেখেছি, তার ইয়ত্তা নেই। আমার মনে আছে, আশিসকুমার লোহর মতো কিছু বর্ষীয়ান মানুষ একত্র হয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন–সজল চোখে বললেন–এর পরের জয়ন্তীতে তো আর আমরা বেঁচে থাকব না!
ঝড়বাদলের দিনে নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে রেডিও ক্ষমা চাইত–অন্য শিল্পীর গান বাজাত, তেমনি করে বিটিভি মাঝে মাঝে দুঃখ প্রকাশ করত–'বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে প্রচারে বিঘ্ন ঘটায় আমরা দুঃখিত। অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন।' তখন বিরক্ত হতাম খুব। প্রিয় অনুষ্ঠানের খানিকটা দেখা গেল না, সেই অসন্তোষ থাকত অনেক দিন। এখন সেসব মনে পড়লে মনে হয়, কতটা পথ টিভির সঙ্গে পেরিয়ে এলাম!
সব রকমের মানুষের জন্য বিনোদন-শিক্ষা-সংস্কৃতির পথ সৃষ্টিতে ও সম্প্রচারে বিটিভি ছিল তুলনাহীন। এখন অনেক চ্যানেল, জানি না ইতিহাস, লোককথা, লোকসঙ্গীতের যে বিপুল সম্ভার নিয়ে বিটিভি হাজির হতো–তার তুল্য অনুষ্ঠান নির্মাণের আগ্রহ এসব চ্যানেল দেখায় কি না।
