বিবিসি লন্ডন থেকে মার্ক টালি
একাত্তরের বাংলাদেশ নিয়ে সে সময় ঢাকা থেকে পাঠানো কয়েকটি প্রতিবেদন, দিল্লি ও লন্ডনে ধারণকৃত ও সম্প্রচারিত কয়েকটি ভাষ্য এবং পর্যালোচনার অনুবাদ উপস্থাপন করা হল:
বিবিসি লন্ডন, ঢাকা থেকে মার্ক টালি
১ জুলাই ১৯৭১
ঢাকা ও ঢাকার আশপাশে বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ী, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলোচনার পর এটা আমার কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সর্বশেষ রাজনীতিক কর্মসূচি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আরও হতাশাব্যঞ্জক। যেসব মন্তব্য আমি মানুষের কাছে শুনেছি, তার সারকথা হচ্ছে⎯প্রেসিডেন্টের ভাষণে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য কিছুই নেই। অনেকেই মনে করেন পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ এবং সশস্ত্র বাহিনীকে উৎসাহ জোগানোর জন্যই প্রেসিডেন্টের ভাষণটি তৈরি করা হয়েছে। যারা সত্যিই সমস্যার একটি সমাধান খুঁজছিলেন⎯প্রেসিডেন্টের ভাষণে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের প্রতি নিন্দাসূচক বক্তব্য তাদের হতাশ করেছে।
সশস্ত্র বাহিনীর জন্য তার ভূয়সী প্রশংসাকেও ভীষণ সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। প্রেসিডেন্টের ভাষণে ইসলাম ধর্মের ওপর জোরালো বক্তব্য সময়োচিত হয়নি। যেসব হিন্দু এখনও এখানে আছে তা তাদের ভয় বাড়িয়ে দেবে এবং তা নিশ্চয়ই শরণার্থীদের দেশে ফিরে আসতে উৎসাহ দেবে না। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, যুক্তিসঙ্গত কারণেই বাঙালিরা সেনাবাহিনীকে বিশ্বাস করে না।
ঢাকা থেকে ৫০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে আটটি গ্রাম ধ্বংস করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সন্দেহাতীতভাবে আবার প্রমাণ করেছে প্রতিহিংসায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ তারা বন্ধ করেনি।
সেনা-নির্যাতনের যে গুজব ঢাকা ও চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে সেনাবাহিনী নির্মমভাবে মানুষকে ক্যান্টনমেন্টে ধরে আনছে, তারা আর ফেরত যাচ্ছে না, ধর্ষণ সমানে চলছে, বলপূর্বক অর্থ আদায় ও মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়া অব্যাহত রেখেছে⎯এইসব সেনা-আচরণ সবসময় হাতেনাতে প্রমাণ করা না গেলেও সারাবিশ্বই তাদের এসব অপকর্ম সম্পর্কে অবহিত।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর পক্ষে জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়া অসম্ভব। তাছাড়া আস্থা ফিরে পেতে তাদের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতেও দেখা যাচ্ছে না। রাস্তায় ভীতসন্ত্রস্ত সশস্ত্র পাঞ্জাবি পুলিশের টহল, মাঝে মধ্যে সেনাবাহিনীকে দেখা যায় মেশিনগান উঁচিয়ে টহল দিচ্ছে। টেলিগ্রাফ অফিসে ঢোকার সময় লোকজনকে তল্লাশি করা হচ্ছে, রাস্তাঘাটেও তল্লাশি চলছে।
আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে পাছে সেনাবাহিনীর চোখে পড়ে যায়। বাজারে তুলনামূলকভাবে অল্পকিছু চাঞ্চল্য রয়েছে, বাজারে লোকের সংখ্যা আগের চেয়েও অনেক কম আর রাত্রিকালীন রাস্তাঘাট জনশূন্যই থাকছে। অফিসে হাজিরা কিছুটা বেড়েছে, তবে দেখা যাবে হিন্দু কর্মচারীদের কেউই অফিসে ফেরেনি।
আসলে সেনাবাহিনী যে ক্ষতিসাধন করেছে তা পূরণের কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। উর্দুভাষী ও বাঙালিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিরোধ অত্যন্ত তীব্র। এ অবস্থায় মূলত পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্কিত একটি সরকার যে জনগণের আস্থা ফিরে পাবে তা একেবারেই অসম্ভব।
৫ জুলাই ১৯৭১
পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। গত শুক্রবার ইলেকট্রিসিটির পাইলন আবার নাশকতার শিকার হয়েছে, কিন্তু এবার ঢাকায়। ঢাকার একাংশে চব্বিশ ঘণ্টা কোনো বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল না। সপ্তাহান্তে ঢাকায় বেশক'টি বোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। গত সপ্তাহে ময়মনসিংহের উত্তরে সরিষাবাড়ি বাজারে বেশ ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এ কারণে সেনাবাহিনী এসে পুলিশ স্টেশন অধিকার করে বসে আছে এবং সরিষাবাড়ি পাটকলে গাঁট বাঁধার কাজ পুরোপুরি থেমে আছে। পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসছে।
শুক্রবার রাতে পাবনায় অগ্নিকা- ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গত সপ্তাহে রাজশাহীতে একটি ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শনিবার রাতেও সেখানে অগ্নিকা- ও বোমার বিস্ফোরণ হয়েছে। রাজশাহীর কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, ভারতের দিক থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীদের গঙ্গানদী অতিক্রমের প্রচেষ্টা চলাকালে সেনাবাহিনী গুলিবর্ষণ করে। কিন্তু কিছু গোলাগুলি সেদিকে হয়ে থাকলেও অন্যদিক থেকেও গুলির শব্দ পাওয়া গেছে।
গেরিলা অভিযানগুলোর সঠিক মূল্যায়ন করা বেশ শক্ত⎯কারণ কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং অনেক কিছুই চেপে যাচ্ছে। এটা ঠিক, বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব খবরের আনুষ্ঠানিক সূত্র উল্লেখ করা যাচ্ছে না, সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে লোকজন যাতে সরকারকে সহযোগিতা করতে না পারে এবং অর্থনৈতিক কর্মকা- যাতে বাধাগ্রস্ত করা যায় সে লক্ষ্যে অন্তত এ ধরনের বিক্ষিপ্ত সহিংসতা চলতেই থাকবে।
মার্ক টালির ব্রিটিশ প্রেস পর্যালোচনা
২৯ মার্চ, ১৯৭১
আজও আবার ব্রিটেনের প্রধান পত্রিকাগুলোতে পাকিস্তান পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। ঢাকায় সংঘটিত ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ছাড়াও সম্পাদকীয় মন্তব্য এবং এই সংকটের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
'দ্য টাইমস' শিরোনাম-সংবাদে বলেছে, পাকিস্তানের পরবর্তী কার্যক্রম কী হওয়া উচিত কিংবা কী হবে সে সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা অসম্ভব। কিন্তু টাইমস মনে করে, ভারত সতর্ক পদক্ষেপ নেবে। কারণ এ পরিস্থিতিতে উদ্ভূত জটিলতা ভারত এড়াতে চাইবে, নতুবা এ ধরনের আরও অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। যদি গেরিলাযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় তাহলে চীনের প্রভাব বেড়ে যেতে পারে। টাইমস আরও মনে করে, এই সংকট থেকে দুই বাংলা এক করার একটি আন্দোলনের জন্ম দিতে পারে যা উভয় অঞ্চলের জন্য বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে পরিগণিত হবে। টাইমস লিখেছে, মিসেস গান্ধীর সমস্যা ইয়াহিয়া খানের সমস্যার চেয়ে কম নয়।
পিটার হ্যাজেলহার্স্ট
পিটার হ্যাজেলহার্স্ট টাইমসে ভুট্টোকে নিয়ে লিখেছেন। তিনি বলেছেন, পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনী শক্তিশালী সংখ্যালঘু অংশের স্বার্থ রক্ষা করছে। ঠান্ডা মাথার কোনো পাকিস্তানি ভুট্টোর মতো বিশ্বাস করে না যে, গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার এখনও সুযোগ রয়েছে। হ্যাজেলহার্স্ট মনে করেন, পশ্চিম পাকিস্তান তার অঞ্চলের জন্য আশা করতে পারে সীমিত একনায়কতন্ত্র আর পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্মম সামরিক শাসন।
হ্যাজেলহার্স্ট বলেন, সাংবিধানিক আলোচনার সময় ভুট্টোর আচরণ বাঙালিদের চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে (বিশেষ করে যখন তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে প্রভাবিত করে জাতীয় সংসদের ৩ মার্চের অধিবেশন স্থগিত করিয়ে দিলেন এবং চাপ সৃষ্টি করে জানালেন যে, কোনো অন্তর্বর্তী সরকারে তার দলের অংশগ্রহণ থাকতে হবে)। হ্যাজেলহার্স্ট বলেন, ভুট্টো এবং ইয়াহিয়া খানকে মনে রাখতে হবে শেখের বিচার করা মানে গোটা পূর্ব পাকিস্তানের বিচারের চেষ্টা করা।
পল মার্টিনের একটি লেখা বের হয়েছে টাইমসে। তিনি বলেছেন, পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে সহবাস সম্ভব নয় এই মতাবলম্বী চরমপন্থীদের শায়েস্তা করার প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানে সেনা অভিযানকে যৌক্তিক মনে করা হয়েছে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, শেখের অহিংস আন্দোলন যেসব চরমপন্থীকে ম্লান করে দিয়েছে তাদের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
গার্ডিয়ানের মার্টিন অ্যাডেনি ঢাকা থেকে ফিরে এসে একটি দীর্ঘ নিবন্ধ লিখেছেন। তিনি বলেন, এ সময় সেনাবাহিনী চট্টগ্রাম ছাড়া সর্বত্র নিজেদের হাতে ক্ষমতা রাখতে চাচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানে নকশাল আন্দোলনের ব্যাপ্তি খুবই কম এবং তাদের ভালো অস্ত্রও নেই।
সেনাবাহিনী এখন শক্তি বৃদ্ধি করার পদক্ষেপ নিচ্ছে; এখন পূর্ব পাকিস্তানে তিন ডিভিশন সৈন্য রয়েছে। গত সপ্তাহে সেনাবাহিনী চট্টগ্রামে যে পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছে তাতে প্রেসিডেন্টকে বোঝানো হয়ে থাকতে পারে বাঙালি জাতীয়তাবাদ সাম্প্রদায়িকতার দিকে মোড় নিচ্ছে, যদিও সঠিকভাবে বলতে গেলে আওয়ামী লীগের ভেতর যথেষ্ট শৃঙ্খলা রয়েছে।
অ্যাডেনি মনে করেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাঙালিরা বেশ বুঝতে পারছে, সেনাবাহিনী তাদের দেশটা অধিকার করে নিয়েছে। কিন্তু তারা এটাও বরাবরই বোঝে যে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে বিপদের সম্ভাবনাই বেশি।
তিনি লিখেছেন, সেনাবাহিনী বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ঠিকভাবে আমলে নিতে চাচ্ছে না। কারণ তাদের অফিসার বরাবরই বাঙালিদের ব্যাপারে অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ দেখিয়ে আসছে। প্রেস্টন মনে করেন, এখন আর সমঝোতার কোনো পথ খোলা নেই। তিনি বলেন, ইয়াহিয়া খান আনাড়ির মতো সব ভ-ুল করে দিয়েছেন, মুজিবকে শহীদের মর্যাদা দিয়ে অধিষ্ঠিত করেছেন, স্বায়ত্তশাসনের জন্য একটি রক্ষণশীল আন্দোলনকে তিনি শেষ পর্যন্ত একটি বিপ্লবে পরিণত করে দিয়েছেন। সেনাবাহিনীকে দিয়ে বড্ড বাড়াবাড়ি করিয়েছেন, তাকে জাতিসংঘের মোকাবেলা করতে হবে।
চার্লস স্মিথ
দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের দূরপ্রাচ্যের সংবাদদাতা চার্লস স্মিথ তার পত্রিকায় লিখেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের আর্থিক সমস্যার একটি কারণ হচ্ছে যে, এটি পাকিস্তানের অংশ। দেশভাগের সময় পূর্ব পাকিস্তানে পাট ও কাপড়ের কল এবং উর্বর জমি ছিল, পশ্চিমে মূলত কোনো শিল্পই ছিল না, আর জমি ছিল শুষ্ক। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য হ্রাস পাওয়ায় এবং পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্পায়ন বৃদ্ধি পাওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানই পশ্চিমের মূল্যবান উৎপাদন সামগ্রীর সুবিধাজনক বাজারে পরিণত হয়েছে।
স্মিথ মনে করেন, স্বল্পমেয়াদে সেনাবাহিনী সফল হবে এবং চীন-রাশিয়া কিংবা ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে না। তবে স্মিথ বলেন, সামরিক কার্যক্রমের মাধ্যমে পাকিস্তানের সমস্যা মেটানো যাবে না। এর জন্য দরকার উভয়পক্ষের ধৈর্য, সময় ও পারস্পরিক সংযম।
একটি শিরোনাম-নিবন্ধে ডেইলি টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, আইয়ুব খানের শাসনামলে পূর্বাঞ্চলকে ক্রমাগত উপেক্ষা করা থেকেই বর্তমান ট্র্যাজেডির সৃষ্টি হয়েছে। টেলিগ্রাফ বলেছে, সেনাবাহিনী বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস করতে পারবে না। গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের জন্য হয় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে আবার আলোচনায় বসতে হবে অথবা পূর্ব পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাবে।
তবে সাংবিধানিক আলোচনা শুরু করতেও অলৌকিক একটা কিছু ঘটতে হবে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার যদি আলোচনা শুরু না করে অবর্ণনীয় রক্তপাতের মধ্য দিয়ে পূর্বাঞ্চল বেরিয়ে আসবে, আর তাতে পশ্চিমাংশের উপকৃত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
১৫ এপ্রিল ১৯৭১
ব্রিটিশ সংবাদপত্রে পাকিস্তান প্রসঙ্গ
পূর্ব পাকিস্তানের উত্তর-পূর্ব অংশে সিলেট জেলা থেকে জনপ্রিয় ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ডেইলি এক্সপ্রেসে পাঠানো ডোনাল্ড সিম্যান্সের প্রতিবেদনটি আজকের শীর্ষ রচনা। তিনি সেখানে মানুষের ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরেছেন। ডেভিড লোশাকও সিলেট থেকে ডেইলি টেলিগ্রাফে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। তিনি তার প্রতিবেদনে বলেছেন, সব ধরনের প্রতিরোধ বর্ষা মৌসুম আসার আগেই যে কোনো মূল্যে গুঁড়িয়ে দিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে। প্রতিরোধ-যোদ্ধাদের মনোবল এখনও অটুট যদিও লোশাকের মতে তাদের অস্ত্রসরঞ্জাম অপর্যাপ্ত।
কৃষকদের মনোবল ভেঙ্গে গেছে, খাদ্যসামগ্রী দুর্লভ হয়ে পড়েছে। যে কোনো এলাকার সর্বাধিক সম্ভব তছতছ করে এবং যতটা সম্ভব ভোগান্তি সৃষ্টি করে একটি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার কর্মকৌশলই তারা অবলম্বন করেছে। তিনি জানিয়েছেন, সিলেট এখন প্রেতনগরী। লোশাক মনে করেন বর্ষার আগে পল্লী এলাকার নিয়ন্ত্রণ সেনাবাহিনীর হাতে যাবার কোনো সম্ভাবনা নেই, আর বর্ষা এসে গেলে এমনিতে সেনাচলাচল সীমিত হয়ে পড়বে।
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার আগে আলোচনা চলাকালে ঢাকায় উপস্থিত ছিলেন টেলিগ্রাম পত্রিকার সাইমন ড্রিঙ; তিনি সেনা আক্রমণের পর ঢাকা শহর ঘুরে দেখেছেন। টেলিগ্রাফে আজ ড্রিঙ লিখেছেন, তিনি মনে করেন, প্রতিরোধ বেশিদিন টিকবে না কারণ এই প্রতিরোধ আন্দোলন অপর্যাপ্তভাবে সংঘটিত এবং রসদও অপ্রতুল।
কলকাতা থেকে পাঠানো মাইকেল হর্নবির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে টাইমস পত্রিকায়। হর্নবি মনে করেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রতিরোধকারীদের এখন আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেতে হবে। এরপর তার মতে, একটি স্বাধীন সরকার কাজ করতে পারবে না। তিনি অবশ্য এসব সংবাদের যথার্থতা নিয়ে সন্দিহান। কারণ এসব খবরের একমাত্র উৎসব হচ্ছে স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে নেওয়া ভারতীয় সংবাদ।
এই সঙ্কট নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম যে কাভারেজ দিচ্ছে হর্নবির মতে তা বস্তুনিষ্ঠ নয়। তিনি উল্লেখ করেছেন, বাঙালিদের হাতে অবাঙালি হত্যার প্রমাণসহ প্রতিবেদন দেওয়া হলে ভারতের সংবাদমাধ্যম তা পরীক্ষা করে দেখার উদ্যোগ নেয়নি।
শরণার্থীর মিছিল
৮ জুন ১৯৭১
ব্রিটিশ সংবাদপত্রে শরণার্থী প্রসঙ্গ
বাংলাদেশের শরণার্থীর যাতনা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়া ব্রিটিনের জনগণের পক্ষে সম্ভব নয়। ব্রিটিশ সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন এই প্রসঙ্গটি বারবার তুলে আনছে এবং সর্বশেষ অবস্থা জানিয়ে উপস্থাপন করছে।
যারা ভারতকে চেনে না, টেলিভিশন অন্য কোনো গণমাধ্যমের চেয়ে অনেক বেশি করে তাদের জানিয়ে দিতে পারে ভারতে শরণার্থীদের ভোগান্তি কেমন এবং তাদের নিয়ে ভারত সরকার কতটা সংকটের মোকাবিলা করছে। গত রাতে (৭ জুন) বিবিসি টেলিভিশনে অ্যান্থনি লরেন্সের একটি প্রতিবেদন দেখানো হয়েছে, তাতে তিনি ফিল্মে এমন কিছু শরণার্থীকে দেখিয়েছেন যারা এত দুর্বল যে শরণার্থী শিবির পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি, রাস্তার ধারেই মারা যাচ্ছে।
ছবিগুলো এতই মর্মান্তিক এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করার মতো ছিল যে, শুরুতেই দর্শকদের সতর্ক করে দেয়া হয়েছিল তারা যদি গভীর আঘাত সহ্য করার জন্য প্রস্তুত না থাকেন তাহলে যেন দেখা থেকে বিরত থাকেন। লরেন্স তার রিপোর্টে বলেছেন, শরণার্থী পরিস্থিতি সামলাতে ভারত সরকার সম্ভাব্য সব পদক্ষেপই গ্রহণ করছে কিন্তু সমস্যার ব্যাপ্তি এত বিশাল যে বহু ভোগান্তি ও বহু মৃত্যু অনিবার্য।বিবিসি টেলিভিশনে গতকাল ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার অ্যালেক ডগলাস হোমের একটি সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছে।
তিনি এ পর্যন্ত ত্রাণ তহবিলে প্রদত্ত ব্রিটিশ অনুদানের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানকে প্রতিশ্রুত সহায়তা বন্ধ করে দেয়া সমীচীন হবে না, তাতে পাকিস্তানের ভোগান্তি বাড়বে বরং ব্রিটেনকে একটি রাজনৈতিক কাঠামোর প্রস্তাব দিতে বলা যায়, যেখানে ব্রিটিশ সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হবে।
সব সংবাদপত্র গতকাল কলকাতায় বিমানযোগে নিয়ে যাওয়া ত্রাণ সহায়তার কথা এবং অন্যান্য ঘটনার উল্লেখ করেছে। গার্ডিয়ান সম্পাদকীয়তে লিখেছে, এত শ্লথ গতিতে শিক্ষা গ্রহণের জন্য বিশ^ সম্প্রদায়ের লজ্জিত হওয়া উচিত। পত্রিকাটি মনে করে শরণার্থী ত্রাণ সহায়তার জন্য বিশ^ব্যাপী সংস্থাগুলোর আশু সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তার সমন্বয়ের জন্য জাতিসংঘই হবে সবচেয়ে উপযুক্ত সংস্থা।
গার্ডিয়ান এটাও জানিয়েছে, সাধারণ পরিষদের শরৎ অধিবেশনে অনুমোদনের জন্য একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। যদি সরকারগুলো সহযোগিতায় এগিয়ে না আসে তাহলে জাতিসংঘের দুর্যোগ মোকাবিলা করার সংস্থা ইউনাইটেড ন্যাশনস ডিজাস্টার অর্গানাইজেশন তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারবে না।
তবে দীর্ঘকাল বিদেশি সহায়তা ছাড়া পাকিস্তানও টিকে থাকতে পারবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান গার্ডিয়ান। পত্রিকা নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
বহুল প্রচারিত ট্যাবলয়েড দ্য সান অত্যন্ত কঠোর শব্দে শরণার্থীদের দুর্ভোগ ও পূর্ব পাকিস্তানে সৃষ্ট সংকটের জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে দায়ী করেছে। তারপরও জাতিসংঘের মতো কোনো সংস্থার কঠোর তত্ত্বাবধানে বণ্টনের জন্য পাকিস্তানকে প্রদেয় সহায়তা অব্যাহত রাখতে পরামর্থ দিয়েছে।
বহুল প্রচারিত অপর একটি পত্রিকা দ্য ডেইলি এক্সপেস সম্পাদকীয়তে লিখেছে, শরণার্থীদের সহায়তার জন্য সব সরকারের সহায়তা করা উচিত এবং সংকট সৃষ্টির জন্য দায়ী পাকিস্তান সরকারের জন্য আর কোনো সহায়তা নয়।
টাইমস এবং টেলিগ্রাফ পত্রিকায় সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ম্যালকম মুগারিজের একটি চিঠি ছাপা হয়েছে। তিনি আবেদন জানিয়েছেন যারা শরণার্থীদের অর্থ সহায়তা করতে চান তারা যেন সরাসরি মাদার টেরেসার কাছে এবং কলকাতায় তার মিশনারিজ অব চ্যারিটিতে তা পাঠান। বিভিন্ন পত্রিকায় স্যালভেশন আর্মির বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছে, তারা শরণার্থী সহায়তার জন্য অনুদান আহ্বান করেছে, টেলিভিশনে ডিজাস্টার ইমার্জেন্সি কমিটিও সহায়তার আবেদন জানিয়েছে।
হাউস অব কমন্স বিতর্ক : মার্ক টালির পর্যালোচনা
১৯৭০-এর দশকে ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স
১৪ মে শুক্রবার ১৯৭১ ব্রিটিশ হাউস অব কমন্সে বিতর্কের বিষয় ছিল পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থিতি। আর বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের মাধ্যমে সে বিতর্কের বিষয় এবং আলোচনার সারাংশ তুলে ধরার জন্য হাউসে উপস্থিত ছিলেন একাত্তরের সবচেয়ে আস্থাবান প্রিয় সাংবাদিক মার্ক টালি।
১৯৭১-এর ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স সম্পর্কে একটি ধারণা নেয়া যায়। ১৯৭০-এর ১৮ জুন ব্রিটিনের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেবারই প্রথম সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রয়োগে ভোটারের ন্যূনতম বয়স ২১ থেকে ১৮ বছরে নামিয়ে আনা হয়। নির্বাচনের সময় হ্যারল্ড উইলসন ছিলেন প্রধানমন্ত্রী এবং তার নেতৃত্বাধীন শ্রমিক দল ছিল ক্ষমতায়।
নির্বাচনে রক্ষণশীল দল ৬৩০ আসনের সংসদে ক্ষমতাসীন হতে প্রয়োজনীয় ৩১৬টির জায়গায় ৩৩০টি আসন লাভ করে। আর ২৮৮ আসন পেয়ে শ্রমিক দল বিরোধী দলে চলে যায়। এডওয়ার্ড হিথ প্রধানমন্ত্রী হলেন। তার কেবিনেটে পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়ক মন্ত্রী হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার অ্যালেক ডগলাস হোম। সে সময় হাউস অব কমন্সের স্পিকার ছিলেন সেলভিন লয়েড।
মার্ক টালির প্রতিবেদন
হাউস অব কমন্সের কোনো বিতর্কের জন্য শুক্রবারকে ভালো দিন বলা যায় না। হাউস অব কমন্সে নির্বাচিত সদস্যরা শুক্রবারটি সাধারণত নিজের নির্বাচনী এলাকায় কাটাতে চান। কিন্তু গতকালের বিতর্কটিকে একটি নন-পার্টি বিতর্ক হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বিরোধী দলের একজন ব্যাকবেঞ্চার প্রস্তাব এনেছেন আর তা সমর্থন করেছেন সরকারি দলের বৈদেশিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী। কাজেই ক'জন অংশগ্রহণ করলেন মাথা গুনে হাউসের উদ্বেগ বোঝার চেয়ে একই বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের উদ্বেগই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। সন্দেহ নেই শুক্রবার হওয়ায় হাজিরা কম ছিল। কিন্তু বিতর্ক ৫ ঘণ্টা ধরে চলেছে। বিরোধী দলের বক্তা অনেকেই এবং সরকারি দলের ৪ জন মন্ত্রীও অংশগ্রহণ করেছেন।
হাউসে যে মোশনটি আনা হয় তাতে পূর্ব পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়, সেখানকার দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য ব্রিটিশ সরকারের সক্রিয় হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়, পূর্ব পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে প্রভাব খাটাতে বলা হয় এবং প্রত্যাশা করা হয় সেখানে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সমাধান অর্জনে সরকার ভূমিকা গ্রহণ করুক।
বিতর্কের প্রথমে অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী স্বীকার করে নিলেন বিষয়টি পাকিস্তান সরকারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ই হওয়ার কথা। কিন্তু যেভাবে তা ঘটেছে তাতে ব্রিটিশ সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ রয়েছে এবং হস্তক্ষেপ করা উচিত। মূল বিতর্কটি 'সহায়তা' নিয়ে। শ্রমিক দলের এমপি ব্রুস ডগলাস-ম্যান এপ্রিলের শেষ দিকে পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী শিবির ঘুরে এসেছেন এবং সীমান্ত পেরিয়ে পূর্ব পাকিস্তানেও প্রবেশ করেছিলেন।
তিনি যা দেখে এসেছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে দাবি জানিয়েছেন ব্রিটিশ সরকার যেন পাকিস্তানে সব ধরনের আর্থিক ও বস্তুগত সহায়তা স্থগিত রাখে এবং অন্তত পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে না নেয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো ধরনের সহায়তা চুক্তিতে না যায়। তিনি বিশ^াস করেন অর্থনৈতিক অবরোধই চলমান যুদ্ধটি প্রতিহত করতে সক্ষম হবে।
বৈদেশিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী রিচার্ড উড বললেন, সরকার সহায়তা নিয়ে তাদের উত্থাপিত বিষয়টি বিবেচনা করছে, তবে তিনি বিশ^াস করেন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আশু ত্রাণ সরবরাহের দায়িত্ব জাতিসংঘ পালন করতে পারে। তিনি বলেন, সে জন্যই ব্রিটিশ সরকার জাতিসংঘের মহাসচিবকে চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ করেছে তিনি যেন পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে পূর্ব পাকিস্তানে জাতিসংঘের একটি টিম পাঠাবার ব্যবস্থা করেন।
রিচার্ড উড আরো বলেন, দ্বিতীয় সমস্যাটি হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের জন্য ত্রাণ সহায়তা পাঠানো। সে ক্ষেত্রে সরকার ব্রিটিশ চ্যারিটিগুলোকে সহায়তা করছে যেন তারা পশ্চিমবঙ্গে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাতে পারে। ত্রাণ সহায়তার প্রয়োজনীয়তা যখন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে ব্রিটিশ সরকার আরো বেশি অংশগ্রহণ করতে পারবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, পাকিস্তানকে সহায়তা যত তাড়াতাড়ি করা যায় ততই ভালো, কারণ ব্রিটিশ সহায়তার বড় অংশই পূর্ব পাকিস্তানে উন্নয়ন কাজের জন্য বরাদ্দ করা আছে, কাজেই সেখানে পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত এই বরাদ্দ ছাড়করণ অব্যাহত থাকবে না। অবশ্য তিনি এই সহায়তাকে রাজনৈতিক সমাধানের হাতিয়ার হিসেবে পাকিস্তানের ওপর ব্যবহার করতে সম্মত নন।
রিচার্ড উড
পূর্ববর্তী সরকারের (শ্রমিক দলীয়, প্রধানমন্ত্রী উইলসন) বৈদেশিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী জুডিথ হার্টও রিচার্ড উডের সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, সহায়তাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অনুচিত।
তবে তিনি মনে করেন কখনো শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবিকতার প্রয়োজন এবং সহায়তা নীতিমালার মাধ্যমে প্রভাবিত করা সম্ভব। বেশ ক'জন বক্তা ত্রাণ সহায়তা স্থগিত রাখার বিরুদ্ধে বললেন, যেহেতু সহায়তা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপকারে আসবে তারাও সেই জনগোষ্ঠীকেই সাহায্য করতে উদগ্রীব।
বাংলাদেশে মার্ক টালি
৭৪ক'জন বক্তা পাকিস্তানের অখ-তা রক্ষা করতে ব্রিটিশ সহায়তার কথা বললেন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেনিস হিলি বলেন, পাকিস্তান যদি ভেঙে যায় তাহলে নৈরাজ্যের বিপদ উপমহাদেশের স্থিতিশীলতাকে হুমকি দেবে। ক'জন বক্তা অবশ্য বলেছেন পূর্ব পাকিস্তান নিজের পায়ের ওপরই টিকে থাকতে পারবে, আর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর পাকিস্তানের দুই অংশের একত্রে থাকা অসম্ভব। রিচার্ড উড বললেন, পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে কল্পনা করে কোনো কাজ নেই, বরং সবার লক্ষ হওয়া উচিত কেমন করে সেখানে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায়, তা নির্ধারণ করা।
গতকালের বিতর্ক থেকে এটা স্পষ্ট পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্রিটিশ সরকার যা কিছু সম্ভব সবই করবে। তবে এটা বোধগম্য যে ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়বেÑ কারণ দায়িত্বটি পাকিস্তান সরকারের।
মার্ক টালির পরিস্থিতি পর্যালোচনা
২৮ মে ১৯৭১
ভারত ও পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে, এর প্রধান কারণ সীমান্ত পথে শরণার্থীর অবিরাম প্রবাহ। এ নিয়ে মার্ক টালি জানাচ্ছেন :
আট সপ্তাহের বেশি হয়ে গেল পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বলেছেন সেনাবাহিনী এমন একটি পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছে যেখানে পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছিল।
বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মোকাবিলা করা ছাড়াও পাকিস্তান সরকারের সূত্র বলছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি ও সংখ্যালঘু বিহারিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক হানাহানি বন্ধ করতে হয়েছে এবং পূর্ব পাকিস্তানি সৈন্য ও প্যারামিলিশিয়াদের বিদ্রোহও ঠেকাতে হয়েছে। এ মাসের প্রথম দিকে কিছুসংখ্যক বিদেশি সাংবাদিককে স্বাধীনভাবে রিপোর্ট করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে একটি সংক্ষিপ্ত সফরের অনুমতি দেয়া হয়। তাদের প্রতিবেদনে এসবের বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।
বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে রেডিও পাকিস্তান দাবি করে আসছে যে, পূর্ব পাকিস্তানে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু বিদেশি সাংবাদিকরা ভেতর থেকে যে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন তাতে এমন কোনো উল্লেখ নেই। রেডিও পাকিস্তানের দাবির কাছাকাছি অবস্থারও যে সৃষ্টি হয়নি তার প্রমাণ রয়েছে। এখনো যে বিপুল সংখ্যায় শরণার্থী পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে, এটাই তার সাক্ষ্য দেয়।
ভারত সরকারের হিসাবে বলা হয়েছে এর মধ্যে ৩৫ লাখ শরণার্থী ভারতে অবস্থান করছে এবং তারা এখনো আসছে। বিশাল সীমান্তের সব জায়গা থেকে যেখানে শরণার্থী প্রবেশ করছে প্রকৃত সংখ্যা সুনির্দিষ্টভাবে জানানো সম্ভব নয়। জাতিসংঘ শরণার্থী হাইকমিশনের সদস্যরা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে এসে পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তাদের সফরের পর জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট বলেছেন, পূর্ব পাকিস্তানি শরণার্থীরা যে প্রতিবেশী ভারতে এসেছে তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে।
জাতিসংঘ শরণার্থী হাইকমিশন জানিয়েছে, শরণার্থীদের ত্রাণ সহায়তার জন্য ৩ মিলিয়ন পাউন্ডের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এই শরণার্থীরা পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সেনাবাহিনীর নির্মম সহিংসতার বিবরণ দিয়েছে। যেসব সাংবাদিক তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তাদের সবারই বিশ^াস সেনাবাহিনীর সন্ত্রাসী আচরণের কারণেই তাদের দেশ ছাড়তে হয়েছে। এছাড়া যারা শরণার্থী শিবির ঘুরে এসেছেন তারাও এই বর্ণনা সমর্থন করেছেন।
কোনো সন্দেহ নেই অরাজকতার মধ্যে আতঙ্ক দ্রুত ছড়ায়; আসলে কী ঘটছে তা দেখেই অনেক শরণার্থী ছুটে এসেছে, এটাও সত্য। নিঃসন্দেহে সেখানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হয়েছে, দস্যুতা চলেছে, লুণ্ঠন চলেছে। কিন্তু কঠিন সত্যটি হচ্ছে সাংবাদিক ও বিদেশি পর্যবেক্ষকের সঙ্গে যারা কথা বলেছে সবাই জানিয়েছে সেনাবাহিনীর ভয়ে তাদের দেশ ছাড়তে হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার পাকিস্তানের অখ-তা রক্ষা করার জন্য এবং বেসামরিক জনগণকে বাঁচানোর জন্য যাদের পাঠিয়েছিল তাদের ভয়েই শরণার্থীরা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে।
পূর্ব পাকিস্তান সমস্যার যে রাজনৈতিক সমাধানই থাকুক না কেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেছেন আগামী দু'তিন সপ্তাহের মধ্যে পর্যাপ্ত সেনা সমর্থন জুগিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে শক্তিশালী করা হবে। শরণার্থীরা যেসব কাহিনী শোনাচ্ছে, যতক্ষণ তার সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে সক্রিয় থাকে এমন অবস্থা অব্যাহত যদি থাকে তাহলে প্রেসিডেন্ট কেমন করে জনগণের মন শান্ত করবেন।
শরণার্থীদের ফেরত আনাও তার জন্য কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়াবে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাজের যে পদ্ধতির কথা শরণার্থীরা গণমাধ্যমকে জানাচ্ছে তা আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করে চলেছে।
৭ জুন ১৯৭১।
পাকিস্তানের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমস্যা
রোববার (৬ জুন) ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছেন, পাকিস্তানের শাসকদের এটি বোঝানো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব যে, সশস্ত্র বলপ্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্রের জন্য মানুষের তাড়নাকে দাবিয়ে রাখা যায় না। এখন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যাটি ভারতের জন্য বৈধ একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চল্লিশ লাখ শরণার্র্থী এসে গেছে, বিপুল সংখ্যায় প্রতিদিনই আসছে⎯ভারতের জন্য অভ্যন্তরীণ হলেও সমস্যাটি অতিকায়। ভারত সরকার মনে করে, যত শিগগির সম্ভব এবং শরণার্থীদের অবশ্যই পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে যেতে হবে; কারণ এদের স্থায়ীভাবে ঠাঁই দেওয়ার মতো স্থান কিংবা সম্পদ কোনোটিই তাদের নেই। কিন্তু ভারত এটাও মনে করে, যতক্ষণ-না তাদের মনে এই আস্থা জন্মাবে যে, পূর্ব পাকিস্তান তাদের জন্য নিরাপদ ততক্ষণ এই শরণার্থীদের ফিরে যেতে রাজি করানো সম্পূর্ণ অসম্ভব।
ভারত সরকার মনে করে শরণার্থীদের স্বদেশে ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য⎯আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টির যৌক্তিকতা রয়েছে।
চল্লিশ লাখ শরণার্র্থী এসে গেছে, প্রতিদিনই আসছে
পাকিস্তান সরকার যে সমস্যার মুখোমুখি তা হচ্ছে, কেমন করে পূর্বাঞ্চলে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনবে; প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দু'সপ্তাহ আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, শিগগিরই তিনি বেসামরিক শাসনে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দেবেন। সময় পার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এর মধ্যেও ইসলামাবাদ থেকে কোনো ঘোষণা আসেনি।
পাকিস্তান সরকারের অবস্থানটি হচ্ছে⎯গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ বৈধই রয়েছে। তবে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে যারা অভিযুক্ত তাদের পরিষদের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু সংবাদদাতাদের কাছ থেকে যেসব প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে, তাতে এমন কোনো আশাপ্রদ কিছু মনে হচ্ছে না যে, ইয়াহিয়া খানের প্রস্তাব করা কোনো সমাধানে সমর্থন জোগাতে আওয়ামী লীগের সদস্যরা এগিয়ে আসবেন।
বেসামরিক কোনো সরকারের অধীন সেনাবাহিনী সাময়িকভাবে প্রশাসন চালানোর ভার নিতে পারলেও তা আদৌ সম্ভব হবে কি-না⎯এ নিয়ে ঘোর সন্দেহ রয়েছে। কারণ সেনাবাহিনীর প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আদৌ কোনো বিশ্বাস আছে বলে মনে হয় না।
ভারত সরকার এবং বিভিন্ন শ্রেণীর লোকজন মনে করে, পাকিস্তানকে সাহায্যদাতা দেশগুলো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে সাহায্য দিতে অস্বীকার করার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যদি-না প্রেসিডেন্ট সন্তোষজনক কোনো রাজনৈতিক সমাধানে উপনীত হন। স্পষ্টতই এ প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় অসুবিধাজনক দিক⎯এখানে অনুমান করা হচ্ছে যে সমস্যাটির একটি সন্তোষজনক সমাধান রয়েছে।
দ্বিতীয় অসুবিধাটি হচ্ছে পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে সাহায্য বন্ধ করার মানে কার্যত পূর্ব পাকিস্তানকে সাহায্য করা। তৃতীয় অসুবিধাটি হচ্ছে⎯সাহায্যদাতা দেশগুলো উদ্বিগ্ন-সাহায্যকে আবার-না রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। তা সত্ত্বেও কোনো সন্দেহ নেই পাকিস্তান সরকারের অন্যান্য কাজের জন্য যেমন, পূর্ব পাকিস্তানকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিতেও সাহায্যের প্রয়োজন হবে।
যেসব দেশ পূর্ব পাকিস্তানের বিষয় নিয়ে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়, সেসব দেশ পাকিস্তানের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা ছাড়া অন্য কিছুই করতে যাবে না। জাতিসংঘও পূর্ব পাকিস্তানে ত্রাণ কার্যক্রমকে সহায়তা করা ছাড়া আর কিছু করতে পারছে বলেও মনে হয না।
কাজেই সমস্যাটির যে প্রকৃতি তাতে এটা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নিজেকেই সমাধান দিতে হবে। কিন্তু ইয়াহিয়া খান যদি দ্রুত এ সমস্যা সমাধানে হাত না-দেন তাহলে ভয়ের কথা হচ্ছে ভারত সরকার শরণার্থীর এই চাপ সহ্য করতে না পেরে পাকিস্তানের ব্যাপারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে বসবে।
৫ ডিসেম্বর ১৯৭১
যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে
আজকের ব্রিটিশ পত্রিকা ভারত পাকিস্তান যুদ্ধেও সংবাদে ব্যাপকভাবে সাড়া দিয়েছে। এতে রয়েছে স্পট রিপোর্ট, বিশ্লেষণ, ফিচার এবং সম্পাদকীয়।
সানডে টাইমস-এ প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে যুদ্ধের জন্য কাকে দোষ দেওয়া যায় সেটা সনাক্ত করে তেমন কোনো লাভ নেই। পত্রিকাটি আশঙ্কা করছে যুদ্ধের ফল হবে অখন্ডতা বিনষ্টকারী, নৈরাজ্য এবং অন্তহীন ভোগান্তির।
সানডে টাইমস এর মতে সবচেয়ে আশাব্যাঞ্জক সমাধান একটিই পাকিস্তান শেখ মুজিবকে নিয়ে স্বায়ত্বশাসিত একটি পূর্ব পাকিস্তান সৃষ্টি করুক, তাতে শরণার্থীদের ফিরে আসার পথ সুগম হবে। আর তা করতে হলে ইয়াহিয়াকে তার প্রেসিডেন্টের পদটি অন্য কারো কাছে অর্পণ করতে হবে। কিন্তু সবার আগে যুদ্ধ বন্ধ হওয়া দরকার। নিরাপদ পরিষদ বিষয়টি আলোচনার জন্য গ্রহণ করায় সানডে টাইমস উদ্যেগটিকে স্বাগত জানিয়েছে।
অবজারভার সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেছে যুদ্ধ একটি অবর্ণনীয় দুঃখের কারণ হবে। আরো দুঃখজনক ব্যাপার হবে যদি বাকী পৃথিবী চুপচাপ কেবল এই উন্মত্ততা দেখতে থাকে। পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তান সমস্যার সামরিক সমাধান খুঁজতে যাওয়াতেই যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটেছে।
পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্কট ভারতের উপর চাপিয়ে দেওয়া থেকেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর জড়িয়ে পড়ায় গণযুদ্ধ হতে এটা আন্তর্জাতিক যুদ্ধে পরিণত হতে যাচ্ছে।
অবজার্ভার মনে করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ ছিল উভয় অংশের মধ্যে ফেডারেল কাঠামো ঠিক রেখে পূর্বাঞ্চলকে সর্বোচ্চ প্রকৃত স্বশাসনের সুযোগ প্রদান করা। যদি এটা কার্যকারী না হয় দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ সমাধান হচ্ছে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের হস্তক্ষেপের বাইরে রেখে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীন দেশ হিসেবে অভ্যুদয়ের সুযোগ দেওয়া। তাদের এখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধ থামানোর আলোচনার সাথে সাথে শরণার্থীদের বাঁচাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বৃহদাঙ্কের সাহায্য প্রদান কর উচিত।
সানডে টাইমস মনে করে বৃহৎ শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে যদি সঙ্কটের সুরাহা করতে না পারে তা হলে সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হতে সহযোগিতা করাই হতে উত্তম প্রস্তাব।
সানডে টাইমস বলেছে যদি কূটনৈতিক পদক্ষেপের কোনো ভূমিকা না থাকে তাহলে যুদ্ধে ভারতের দ্রুত বিজয়ই অধিকতর সন্তোষজনক একটি সমাধান এনে দেবে।
টেলিগ্রাফ বলেছে বড় শক্তিগুলো যদি কূটনৈতিক সমাধান নিশ্চিত না করতে পারে তাহলে তারা যেন কোনো পক্ষকেই অস্ত্রের যোগান না দেয়।
সানডে মিরর মনে করে ধনী দেশগুলোর যুদ্ধ ঠেকানোর কোনো ক্ষমতা নেই এবং এই সংকট সমাধানে তাদের অবদান অতি নগন্য। সানডে মিরর বলেছে পাকিস্তানের উপর জাতিসংঘ এ কিংবা চীনের চাপ পাকিস্তানকে যুদ্ধ থেকে দূরে রাখবে। আর নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড-এর ভাষ্য যেহেতু ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই কমনওয়েলথ সদস্য ব্রিটিশ সরকারের সঙ্কট নিরসনে মধ্যস্ততা করা উচিত।
অবজার্ভারের উপমদেশীয় চিফ রিপোর্টার সিরিল ডানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী উপমহাদেশে স্থিতবস্থার জন্য কাশ্মীর পাকিস্তানের সাথে চলে যাওয়া উচিত। আর যুদ্ধ অব্যহত থাকলে পূর্ব পাকিস্তানে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটবে, ফলে এই দেশ হিন্দু শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তণ ঠেকাবে এবং বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে অপারগ হয়ে পড়বে।
সানডে টাইমস পত্রিকায় জন গ্রিগ লিখেছেন, যুদ্ধের প্রেক্ষাপট হচ্ছে ভারতের উপর চাপিয়ে দেওয়া শরণার্থীর বোঝা। এর আর্থিক ব্যয় মেটানো ভারতের সাধ্যাতীত এবং এই পরিস্থিাততে উদ্ভুত সামাজিক দ্বন্দ্বের পরিণতি ভয়াবহ। তিনি মনে করে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের অভ্যন্তরে নিয়মিত সৈন্যবাহিনী পাঠাতে ইন্দিরা গান্ধী নিরুৎসাহিত থাকার কথা।
কিন্তু যখন নিশ্চিত হলেন ইয়াহিয়া খানকে তার অবস্থান বদলাতে বহৃৎশক্তিগুলো কোনো চাপই দেবে না, এছাড়া তার আর কোনো বিকল্প থাকল না। এখন ব্রিটেনের উচিত ভারতকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসা।
সানডে টাইমস-এর অ্যান্থলি ম্যাসকারেনহাস লিখেছেন, গত আট মাসে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হতাশাব্যাঞ্জক সাড়ায় শরণার্থী সমস্যা দূর করতে যুদ্ধই একমাত্র সমাধন হিসেবে সামনে চলে এসেছে। আমেরিকা সরকারের পাকিস্তানকে চাপ দিতে ব্যর্থতা দেখে ভারত হতাশ হয়েছে। কাজেই যুদ্ধই অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। ভারত সরকার হিন্দু শরণার্থীদের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে ভাগ করে দিতে চেয়েছিল কিন্তু রাজ্যগুলো আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতির কথা বলে সরকারের অনুরোধ উপেক্ষা করেছে।
শরণার্থীদের নিজ দেশে ফিরিয়ে দিতে ভারত শেষ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাতে পাকিস্তান সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ কমে আসবে। গায়ের জোরে পূর্ব পাকিস্তানকে ধরে রাখার বাসনাই পাকিস্তানকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
