'স্বতন্ত্র' প্রার্থীদের উৎসাহিত করবে আওয়ামী লীগ
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। প্রতিটি জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের ঘোষিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে দলের কেউ নির্বাচন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে দলটি। কিন্তু এবারেই প্রথম দলের যে কোনো নেতাকর্মী স্বতন্ত্র নির্বাচন করতে পারবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
আর এই সিদ্ধান্ত আসার পর ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৮ আসনে দল চূড়ান্ত মনোনয়ন দিলেও, অনেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। আবার গতবার দলীয় এমপি হলেও এবার মনোনয়ন পাননি, এরকম নেতাদের অনেকেই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইতোমধ্যে। এছাড়াও দলীয় মনোনয়ন চাওয়ার পর না পাওয়া এরকম শতাধিক প্রার্থী সোমবার পর্যন্ত ঘোষণা দিয়েছে।
এছাড়াও অনেকেই এলাকায় জনসংযোগসহ প্রচারণামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করেছেন। আবার অনেক নেতাই জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা কার্যালয় থেকে নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন ফরম তুলেছেন সোমবার।
দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তোলা, ভোটকে উৎসবমুখর করা ও কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে স্বতন্ত্র প্রার্থী করার ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করে তুলতে একাধিক বিকল্পের একটি হলো নির্বাচনের মাঠে স্বতন্ত্র প্রার্থী রাখা।
গত ২৬ নভেম্বর আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাথে গণভবনে মতবিনিময় সভায় দলের নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী বা ডামি প্রার্থী হতে পারবে বলে সিদ্ধান্ত দেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। একইসাথে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেউ নির্বাচিত হয়ে আসলে তার বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেন দলীয় প্রধান।
সোমবার এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, 'সময়ের প্রয়োজনে কৌশল পরিবর্তন করে এগোচ্ছে আওয়ামী লীগ। নেত্রীর গাইডলাইন ফলো করে ডামি প্রার্থী হতে বাধা নেই।'
সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন ও বিদেশিদের চাপের মুখে থাকা আওয়ামী লীগ মনে করছে, বিকল্প প্রার্থী থাকলে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। সে ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রে অধিক পরিমাণ ভোটাররাও ভোট দিতে আসবেন।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন জেলায় সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থীর তালিকা করছে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থা। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে হলে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে ভোটার টানার মতো সক্ষমতা থাকতে হবে সেই প্রার্থীদের। এই দুই বিবেচনায় উতরে গেলে ওই প্রার্থীর মনোনয়ন পেতে সহজ হবে। জেতার ব্যাপারটিও অনেক সহজ হয়ে যাবে। তবে আওয়ামী লীগের পদধারীদের স্বতন্ত্র নির্বাচন করার ক্ষেত্রে লাগাম টানা হতে হতে পারে।
একটি সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ পরিবারের কিন্তু সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন এমন ব্যক্তিরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে গুরুত্ব পাবেন। যদিও শেখ হাসিনা বলেছেন, সকল নেতাকর্মীর কথা।
নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট ও সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ৭ জানুয়ারি ভোট হবে।
এদিকে আওয়ামী লীগ গত রবিবার ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৮টিতে প্রর্থী ঘোষণা করলেও এখন পর্যন্ত তাদের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। এরমধ্যেই সোমবার (২৭ নভেম্বর) সচিবালয়ে দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, 'প্রতিটি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দিলেও জোটের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে, কোন জায়গায় কিভাবে করা হবে সেটি যেহেতু ঠিক করা হয়নি সেজন্য সব আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। পরে জোটের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরা ১৪ দলীয় জোটগতভাবে নির্বাচন করব। এছাড়া অন্যান্যদের সঙ্গে যদি সমন্বয় করতে হয় সেটিও করা হবে।'
আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, দলটির নেতারা মনে করছেন নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলতে প্রথম বিকল্প হলো স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে রাখা। যাতে কোনো দল নির্বাচনী মাঠ থেকে শেষ সময়ে সরে পড়লেও অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগকে কোনো বাধার মুখে পড়তে না হয়। এছাড়া এ নিয়ে যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সরকার।
আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও নির্বাচনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু মাঠের বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনমুখী না হয়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নানা কারণে আশ্বস্ত হতে পারছে না নির্বাচনে কারা আসবে আর কারা আসবে না। তাই নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে চক্রান্তের শিকার হতে পারে, এমন আশঙ্কায় স্বতন্ত্র প্রার্থী মাঠে রাখার পরিকল্পনা নিয়েছে আওয়ামী লীগ।
কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ এবার ২০০ আসন টার্গেট করে নির্বাচনে লড়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সেখান থেকে ১৭০/১৮০ আসনে জিতে সরকার গঠন করতে পারলেও মন্দ হবে না মনে করেন তারা। ফলে বাকি আসন নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা আছে তাদের। কিছু স্বতন্ত্র বা অন্য দলের নেতাদের প্রস্তাব করা হবে। তাদের বিশ্বাস যে, আওয়ামী লীগের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করা যাবে, উৎসবমুখরও হবে। ছেড়ে দেওয়া আসনে নির্বাচন করে যেই জিতে আসুক, তেমন ক্ষতি হবে বলে মনে করেন না আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
স্বতন্ত্র প্রার্থীর ঘোষণা দিলেন যারা
চট্টগ্রামের ১৬ আসনের মধ্যে ইতোমধ্যে মনোনয়ন বঞ্চিত ৯ প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন।
ঢাকা-১৯ (সাভার-আশুলিয়া) আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মো. তৌহিদ জং মুরাদ ও আশুলিয়া থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বঞ্চিত হওয়ায় স্বতন্ত্র নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন সিলেট বিভাগের আলোচিত তিন প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, ব্যারিস্টার সায়েদুল হক চৌধুরী সুমন ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও কানাডা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সরওয়ার হোসেন।
কুমিল্লার ১১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতে স্বতন্ত্র নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা।
কক্সবাজারের চারটি আসনেও স্বতন্ত্র নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে ৬ আওয়ামী লীগ নেতা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে দুইটি আসনে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা স্বতন্ত্র নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিয়ষটি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
যশোরের ছয়টি আসনেই ছয় জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা ছয় আওয়ামী লীগ নেতার।
সিলেট-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। তবে সোমবার নির্বাচন কমিশন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। এছাড়াও সিলেটের ৬টি আসনেই মনোনয়নবঞ্চিত আওয়ামী লীগ নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন বলে জানা গেছে। কয়েকজন এ ব্যাপারে প্রস্তুতিও শুরু করেছেন।
