নির্বাচনের আগে নতুন করে আলোচনায় জাতীয় পার্টি
জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সংসদের বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ এবার নিজেকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন, যেসময় দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের ভারত সফরে রয়েছেন।
আবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রওশন এরশাদের এই ঘোষণা দলের দুই মেরুর (জিএম কাদের ও রওশনপন্থী) মধ্যে বিরোধ নতুন মাত্রা যোগ করলো বলে মনে করছেন রাজনীতিবীদরা।
মঙ্গলবার সকালে জিএম কাদেরের অনুপস্থিতিতে নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন রওশন এরশাদ। জাতীয় পার্টির প্যাডে রওশন এরশাদের সই করা একটি বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, "আমি বেগম রওশন এরশাদ, এমপি জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কো-চেয়ারম্যান। এই মর্মে ঘোষণা করছি যে, পার্টির সিনিয়র নেতাদের পরামর্শ ও সিদ্ধান্তক্রমে দলের গতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করলাম।"
গণমাধ্যমে এ সংবাদ প্রকাশের পরপরই পাল্টা এক ভিডিও বার্তা দেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে- জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। আসলে এটা একটা ফেক নিউজ।
এদিকে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলেন, "গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ উদ্ভট বানোয়াট ও মিথ্যা। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের সাহেব আছেন, থাকবেন। বেগম রওশন এরশাদ ম্যাডাম আমাদের মায়ের মতো। তিনি আমাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, ২০০৮ সাল থেকে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে নানা কারণেই আলোচনায় এসে রাজনীতির মাঠে আলোচনার খোরাক যোগান দেয়া জাতীয় পার্টি এবারও আলোচনায় এসেছে এই নতুন ঘটনা দিয়ে।
এর আগে ২০১৯ সালের এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান পদ নিয়ে কয়েকদফা টানাটানি হয় তাদের মধ্যে। দলের মধ্যে দুটি গ্রুপ তৈরি হয়ে যায়। বেশিরভাগ নেতা জিএম কাদেরকে সমর্থন করেন। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে সমঝোতা হয়। এতোদিন জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যান ও রওশন এরশাদ কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
চেয়ারম্যান পদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জিএম কাদের ও রওশন এরশাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব একটি 'ওপেন-সিক্রেট' বিষয়। এদিকে গত শনিবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রওশন এরশাদ। এর পরপরই রওশন এরশাদকে নিয়ে গুঞ্জন তৈরি হয়।
এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে জাপা চেয়ারম্যান একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরে জোরালো বক্তব্য রাখছেন। এছাড়া নির্বাচন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতসহ বিদেশি দূতদের সঙ্গেও তিনি দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে জাতীয় পার্টির অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিগত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচন করলেও সামনের নির্বাচনে দলটির অবস্থান কি হবে এখনো তা স্পষ্ট নয়।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে দলের মহাসচিব রুহুল আমীন হাওলাদারকে মহাসচিবের পদ থেকে সরিয়ে মশিউর রহমান রাঙ্গাকে মহাসচিব করা হয়, সে সময় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। আবার গত বছরের মাঝামাঝি মশিউর রহমানকে দলের মহাসচিবের পদ থেকে সরিয়ে দেন জিএম কাদের।
মশিউর রহমান রাঙ্গা তার এক অনুসারী নেতাকে দিয়ে আদালতে মামলা করে কিছুদিন দলের চেয়ারম্যান পদের কার্যক্রম পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞার ঘটনাও বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে আপিল বিভাগের নির্দেশে জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটে অংশীদার ছিল দলটি। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ও আওয়ামী লীগের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা পায় দলটি। জাতীয় পার্টি থেকে সরকারের মন্ত্রিসভায় যুক্ত হয় তিনজন। সে সময় বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে করা হয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক হয়ে অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টি পায় ২২টি আসন। তবে এবার শুধু বিরোধীদল হিসেবেই সংসদে রয়েছে। যেখানে বিরোধী দলের নেতা হলেন রওশন এরশাদ এবং জিএম কাদের উপনেতা।
