ফুটবলারদের দলবদল নিয়ে যেভাবে কাজ করেন ফ্যাব্রিজিও রোমানো
"হেয়ার উই গো", যারা ক্লাব ফুটবলের খোঁজখবর রাখেন তাদের কাছে খুবই পরিচিত কিছু শব্দ। ফুটবলাররা দলবদল করে কোন ক্লাবে যোগ দিচ্ছে, তা শতভাগ নিশ্চিত হলেই এই শব্দ তিনটি বলেন ইতালিয়ান ক্রীড়া সাংবাদিক ফ্যাব্রিজিও রোমানো। আর তাতেই ভক্তরা জেনে যান, তাদের পছন্দের খেলোয়াড়ের পরবর্তী গন্তব্য সম্পর্কে। তা কে এই ফ্যাব্রিজিও রোমানো? কীভাবে ফুটবলারদের দলবদলের খবর পেয়ে থাকেন তিনি?
১৯৯৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ইতালির নেপলসে জন্ম নেন রোমানো। ২০০৯ সালে হাইস্কুলে থাকাকালীনই ফুটবল নিয়ে লেখা শুরু করেন তিনি। তবে ফুটবলারদের দলবদল নিয়ে তার কাজের শুরু ২০১১ থেকে। তখন তিনি কাজ করতেন একটি ইতালিয়ান ওয়েবসাইটের হয়ে। হঠাৎ একদিন বার্সেলোনার একাডেমি লা মাসিয়াতে কাজ করা এক ব্যক্তি রোমানোকে ফোন করে বলেন, তিনি ফুটবলারদের এজেন্ট হতে চান।
সেজন্য বার্সা একাডেমির দুইজন ফুটবলার ডেউলফিউ ও ইকার্দির হয়ে কাজ করতে তাদের রাজিও করেছেন তিনি। রোমানোকে সেই ব্যক্তি অনুরোধ করে ওই দুই খেলোয়াড়ের প্রোফাইল নিয়ে লিখতে বলেন। রোমানোও লিখে ফেলেন তাদের নিয়ে। তারপর সেই এজেন্টের মাধ্যমে ইকার্দির লা মাসিয়া ছেড়ে ইতালিয়ান ক্লাব সাম্পদোরিয়াতে যাওয়ার খবরটি সবার আগে ব্রেক করেন রোমানো, যা ছিল ফুটবলারদের ট্রান্সফার নিয়ে তার ব্রেক করা প্রথম খবর।
কিন্তু তখনও এতোটা পরিচিতি লাভ করেননি রোমানো। তবে তার জীবন বদলে যায় ২০১৩ সালে। সে বছরের নভেম্বরে সেই একই এজেন্ট আবারও ফোন করে রোমানোকে বলেন, "আমার ক্যারিয়ারের শুরুতে আপনি আমাকে অনেক সাহায্য করেছিলেন, এখন আমার পালা আপনাকে সাহায্য করার"। তিনি রোমানোকে আরো বলেন, "গ্রীষ্মকালীন দলবদলে সাম্পদোরিয়া ছেড়ে ইন্টার মিলানে নাম লেখাচ্ছেন আমার ক্লায়েন্ট ইকার্দি।'' এই দলবদলের খবর আনুষ্ঠানিক হওয়ার প্রায় ৬ মাস আগেই ব্রেক করেন রোমানো। আর তাতেই সাড়া পরে যায় ফুটবল দুনিয়ায়।
২০২০ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে পর্তুগিজ মিডফিল্ডার ব্রুনো ফার্নাদেজের যোগ দেয়ার খবরটিও সবার আগে ব্রেক করেন তিনি। মূলত সেখান থেকেই উত্থান এই ফ্যাব্রিজিও রোমানোর।
তবে তাকে দলবদল বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে বেশ সাহায্য করেছিলেন তার পরামর্শক ও এই বিষয়ে অভিজ্ঞ আরেক ইতালিয়ান সাংবাদিক ডি মারজিও। বিভিন্ন ইউরোপিয়ান ক্লাব, এজেন্টসহ দলবদলের সংবাদ দেওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে রোমানোর পরিচয় করিয়ে দেন ডি মারজিও। এরপর থেকে নিজ উদ্যোগেই খেলোয়াড়দের দলবদল নিয়ে কাজ শুরু করেন রোমানো।
কিন্তু কখনও কি প্রশ্ন জেগেছে, রোমানো এসব ভেতরকার সংবাদগুলো কীভাবে বের করেন? দলবদলের বাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি হচ্ছে "বিশ্বাস ও ভরসা"। এগুলোকে ভিত্তি করেই ভেতরকার খবর নিয়ে আসতে হয় রোমানোকে। তার কন্টাক্ট লিস্টে বিভিন্ন ক্লাবের ফুটবলার, তাদের এজেন্ট, কোচ, ক্লাব প্রতিনিধি থেকে শুরু করে বড় বড় কর্মকর্তারাও আছেন। যাদের সবার বিশ্বাস ও ভরসা অর্জন করতে হয়েছে রোমানোকে। খেলোয়াড়দের দলবদল নিয়ে যেসব জায়গা আলোচনা করা হয়, যেমন- ক্যাফে, বার, ক্লাবের হেডকোয়ার্টার, হোটেলসহ সব জায়গাতে রোমানো চলে যান তথ্য বের করতে।
শুধুমাত্র শতভাগ নিশ্চিত হয়েই তার বলা "হেয়ার উই গো" শব্দ তিনটি এখন পাঁড় ফুটবল ভক্তদের ছাড়িয়ে নতুন ফুটবল ভক্তদের মুখে মুখে। বাস্তব জীবনের বিশেষ মুহূর্তগুলো মানুষকে জানান দিতেও এখন "হেয়ার উই গো" ব্যবহার করেন অনেকেই।
বর্তমানে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক নিয়ে তার একটি দল আছে, যারা দলবদল সম্পর্কিত তথ্য বের করতে ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। স্পাই হিসেবে নানান তথ্য বের করে তারা সেগুলো জানান রোমানোকে। এরপর তিনি ক্রস-চেক করে তা জানিয়ে দেন ফুটবল ভক্তদের।
রোমানোকে দৈনিক প্রায় ৫০টি কল করতে হয়। তার স্ক্রিন টাইম দৈনিক প্রায় ১৭ ঘণ্টার বেশি। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৫ ঘণ্টা ছাড়া পুরোটা সময় জুড়েই তিনি মোবাইল ফোনে কাজে ব্যস্ত থাকেন। দলবদলের মৌসুমে মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পান এই ইতালিয়ান সাংবাদিক। সময়ের অভাবে নেই তার কোনো সঙ্গিনীও।
দলবদল সম্পর্কিত এই সংবাদগুলো ভক্তদের জানাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোই ব্যবহার করেন রোমানো। যেখানে তার অনুসারীর সংখ্যা কম নয়। বর্তমানে টুইটারে তার অনুসারীর সংখ্যা ১৮ মিলিয়ন, ফেসবুকে ১২ মিলিয়ন, ইন্সটাগ্রামে ২২.৫ মিলিয়ন ও ইউটিউবে সেই সংখ্যা ১.৯২ মিলিয়ন।
