ত্রিস্মৃতি ধন্য বুদ্ধপূর্ণিমা: শান্তি ও মৈত্রীর মহামিলন
বুদ্ধপূর্ণিমা বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। বৌদ্ধধর্ম অনুসারীগণ বিভিন্ন পূর্ণিমাতিথিতে পূজা অর্চনা, ধর্মশ্রবণ করে থাকেন, তারা বিহারে যান এবং সকলে একত্রিত হয়ে ভিক্ষুদের দান করেন, পঞ্চশীল অষ্টশীল পালন করেন। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম রাঙামাটি খাগড়াছড়ি সহ বিভিন্নজেলার বিহারে পূর্ণিমা অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। বুদ্ধপূর্ণিমাকে বৈশাখীপূর্ণিমাও বলা হয়ে থাকে। এই পূন্যোৎসব বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে উদযাপিত হয়। বৈশাখী পূর্ণিমা মহামানব গৌতম বুদ্ধ, যিনি শুধু বৌদ্ধধর্মানুসারী নয় বরং পুরো পৃথিবীব্যাপী মানুষদের শিখিয়েছেন জরা, ব্যাধি, দুঃখ, লোভ -লালসা, মিথ্যাচার, ব্যভিচার থেকে মুক্ত থাকার শিক্ষা দান করেছেন তার জীবনের তিন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পালিত হয়ে থাকে। বুদ্ধদপূর্ণিমাতেই বুদ্ধের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মহাপরিনির্বাণ লাভ হয়েছিল। যশ প্রভাব-প্রতিপত্তি অতিক্রম করে তিনি অসীম জ্ঞান লাভ করেন এবং সুদীর্ঘ ৪৫ বছর মানবসমাজকে মুক্তিলাভের পথ প্রদশর্নস্বরূপ বৌদ্ধধর্ম বিস্তার করে গেছেন।
বৌদ্ধধর্মের প্রচারক ছিলেন গৌতম বুদ্ধ। গৌতম বুদ্ধের সময় চীন ও পারস্যের দুইজন প্রখ্যাত ধর্মপ্রচারক ছিলেন কনফুসিয়াস এবং জরাথুরষ্টা। কিন্তু গৌতম বুদ্ধের ধর্মমত যে পরিমাণ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল পুরো ভারতবর্ষে তথা সিংহল জম্বুদ্বীপ এবং সূবর্ণভুমিতে তা অন্যকোনো ধর্মমত পায়নি। গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে ঐতিহাসিক এ এন বাসাম বলেছিলেন "বুদ্ধ ছিলেন এই কালের ভারতের শ্রেষ্ঠ সন্তান"।
আনুমানিক খ্রীস্টপূর্ব ৫৬৬ অব্দে নেপালের তরাই অঞ্চলে কপিলাবস্তু নগরের কাছে লুম্বিনী উদ্যানে গৌতম বুদ্ধের জন্ম হয়। বুদ্ধের পিতা শুদ্ধোধন ছিলেন ক্ষত্রিয় শাক্য জাতির রাজা এবং বুদ্ধের জন্মদাত্রী মা ছিলেন মায়াদেবী। বিভিন্ন অলৌকিকতা নিয়েই বুদ্ধের জন্ম।বুদ্ধের শৈশবে নাম ছিল সিদ্ধার্থ। জন্মের কিছুদিন পরই মা মারা গেলে তারই সহোদরা মহাপ্রজাপতিগৌতমী তাকে লালন-পালন করেন। এবং তার নাম অনুসারে তাকে গৌতম বলে ডাকা হয়।
ইতিহাসে আছে, মহামায়া এবং শুদ্ধোধনের কোনো সন্তান ছিলো না, একদা আষাঢ়ি পূর্ণিমাতিথিতে তার মা মায়াদেবী ঘুমের মধ্যে একটি সাদাহাতি ও পদ্মফুলের স্বপ্ন দেখেছিলেন। রাজপরিবারের জ্যোতিষী সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, তার গর্ভজাত সন্তান একদিন মহান রাজা অথবা মহান ধর্মপ্রচারক হবেন। এবং সত্যিই তিনি গোটা বিশ্বে একজন মহান ধর্মপ্রচারকই হয়েছিলেন।
ক্ষত্রিয় শাক্যবংশের রীতি নীতি অনুযায়ী গৌতমও শৈশবে অস্ত্রশিক্ষা রথ চালনা ইত্যাদি নিয়মকানুন গুলি রপ্ত করেছিলেন, তবে তা তাকে কোনোভাবেই আর্কষিত করেনি। সাংসারিক জীবনও তার শুরু হয়েছিল, ষোলো বছর বয়সে যশোধরা নামে এক রাজকন্যার সাথে গৌতমের বিবাহ হয়। এমনকি তাদের রাহুল নামে একটি পুত্র সন্তানেরও জন্ম হয়। কিন্তু কালের নিয়মে কোনো সাংসারিক বন্ধন গৌতমকে আটকে রাখতে পারেনি।
বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ থেকে জানা যায় একদিন বুদ্ধ নগর ভ্রমণ করার সময় তার নজরে আসে একজন বয়ঃবৃদ্ধ লোক, একজন রোগে জর্জরিত ব্যক্তির যন্ত্রনা এবং একটি মৃতদেহ।
এই দৃশ্য দেখামাত্রই গৌতমের মন মুক্তির পথ খোঁজার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তিনি সেই দিন বুঝেছিলেন জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর হাত থেকে মানুষের নিস্তার নেই। কিন্তু এই দুঃখের হাত থেকে বাঁচতে মুক্তির পথ কি আছে।
অবশেষে এই মুক্তির পথ খুঁজে পেতে তার সন্তান রাহুল জন্মেরদিন আষাঢ়িপূর্ণিমার গভীর রাত্রে গৌতম সংসার তথা গৃহ ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়েন। ইতিহাসে এই দিনটি বৌদ্ধদের কাছে "মহাভিনিষ্ক্রমণ" নামে পরিচিত। মাত্র ২৯ বছর বয়স ছিল তার সেইদিন।এরপর একজন সাধক তপস্বী হিসাবে তার জীবন শুরু হয়। বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর পর তিনি বৈশালীতে গিয়ে পৌঁছান। বর্তমানে এই বৈশালী বিহারে অবস্থিত। সেখানে অরাড় কালাম নামে এক সন্ন্যাসীর সাথে গৌতমের আলাপ হয়।
গৌতম তার কাছে ধ্যান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। কিন্তু অরাড় কালামের শিক্ষাও গৌতমের মনঃপুত হয়নি। এরপর রামপুত্র রুদ্রক সহ বিভিন্ন পন্ডিতদের কাছে ঘুরে বেশ কিছুদিন পেরিয়ে গেলেও দুঃখের হাত থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে না পেয়ে গৌতম বুদ্ধ হতাশ হয়ে পড়েন। কিন্তু তিনি তার লক্ষ্য থেকে একটুকুও সরে যাননি। বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি একদিন গয়ার কাছে (যা বর্তমানে বিহার রাজ্যে অবস্থিত) উরুবিল্ব গ্রামে এক প্রকাণ্ড পিপুল গাছের তলায় বসেন। বলা হয়ে থাকে যে, সুজাতা নামক সেনানীকন্যা গৌতম বুদ্ধকে এক বাটি পায়েসান্ন দিয়ে সেইসময় তার ক্ষুধা মিটিয়ে ছিলেন।
এরপর দীর্ঘ ৪৯ দিন ওই গাছটির তলায় গৌতম ধ্যানাসনে বসে থাকেন। তার প্রতিজ্ঞা ছিল দেহের শেষ রক্তবিন্দুও যদি শুকিয়ে যায় তবু তিনি ধ্যান ছেড়ে উঠবেন না। অবশেষে তিনি বৈশাখীপূর্ণিমা তিথিতে তার দিব্যজ্ঞান লাভ করেন। তার জরা ব্যাধি মৃত্যু নিয়ে প্রশ্নের উত্তর তিনি খুঁজে পান। জগতের দুঃখ কষ্টের কারণগুলো কি তা তিনি বুঝতে পারেন। যেহেতু গৌতম বোধিজ্ঞান লাভ করেছিলেন, তাই তিনি বুদ্ধ নামে পরিচিত হতে থাকেন। বুদ্ধ কথাটির অর্থ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান। গৌতম বুদ্ধের আর এক নাম তথাগত। তথাগত কথাটির অর্থ, যিনি সত্যের সন্ধান পেয়েছেন।
পরম জ্ঞান লাভ করার পর বুদ্ধ বারাণসীর (যা বর্তমানে উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে অবস্থিত) কাছে সারনাথে আসেন। এখানে পাঁচজন সন্ন্যাসীর মধ্যে তার জ্ঞান বিতরণ করেন। এই প্রথম উপদেশ দান ইতিহাসের পাতায় "ধর্মচক্র প্রবর্তন" নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তী কালে তার ধর্ম মগধরাজ বিশ্বিসার, অজাতশত্রু গ্রহণ করেছিলেন। এরপর তিনি কপিলাবস্তুতে যান এবং সেখানে তার বাবা শুদ্ধোধন, মায়ের সহোদরা প্রজাপতিগৌতমী, স্ত্রী যশোধরা, পুত্র রাহুল কে তার ধর্মে দীক্ষিত করেন। জানা যায় যে, শাক্যবংশের সাথে কলিও নামে একটি রাজবংশের দীর্ঘদিনের বিবাদ ছিল। আর সেই বিবাদ বৃদ্ধের উপস্থিতিতে মিটে গিয়েছিলো।
শুধু বারানসীতেই বুদ্ধ থেমে থাকেননি। তার ধর্মমত ভারতের ষোড়শ মহাজনপদে (গয়া, নালন্দা, মগধ, কোশল প্রভৃতি )এইসমস্ত স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি কোশলরাজা প্রসেনজিৎ বুদ্ধের খুব ভালো একজন শ্রোতা এবং বন্ধু ছিলেন।দিব্য জ্ঞান লাভ করার পর দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে বুদ্ধ তার ধর্মপ্রচার শান্তিপূর্ণ ভাবে চালিয়েছিলেন।
শেষপর্যন্ত রাজগীর থেকে শ্রাবন্তী যাওয়ার পথে মল্লদের রাজধানী কুশীনগরে তার দেহাবসান ঘটে এবং সেদিনও ছিলো বৈশাখীপূর্ণিমা। তখন তাঁর আনুমানিক বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। আনুমানিক সময়টা ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮৬ অব্দ।
বুদ্ধজীবদ্দশায় এধর্মের কোনো লিখিত গ্রন্থ ছিলো না, যার ফলে নানা অসংগতি দেখা দেয় তাদের ধর্মকর্ম নিয়ে বিনয়বিধান নিয়ে পক্ষপাতিত্য সৃষ্টি হলে পরবর্তীকালে এই সমস্ত বৌদ্ধরা দুটি ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিলেন। এক ভাগ হীনযান আর মহাযান।
কিন্তু বিভিন্ন উৎসব তিথি তারা সকলেই বুদ্ধের স্মরণে পালন করে থাকে। বৈশাখীপূর্ণিমা তিথিতে তারা নানা আয়োজন করেন। ৩০শে এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি এন্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ থেকে এক আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। বুদ্ধপূর্ণিমার দিনে বৌদ্ধরা বুদ্ধপূজাসহ পঞ্চশীল, অষ্টশীল, সূত্রপাঠ, সূত্রশ্রবণ, সমবেত প্রার্থনা এবং নানাবিধ মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তারা বুদ্ধানুস্মৃতি ও সংঘানুস্মৃতি ভাবনা করে। বিবিধ পূজা ও আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিবিধ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। বৌদ্ধ বিহারগুলিতে বুদ্ধের মহাজীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনাসহ ধর্মীয় সভার আয়োজন করা হয়। শিশু-কিশোরদের মধ্যেও নানা উৎসবমুখর আনুষ্ঠানিকতার ধুম পড়ে যায়। এই পূর্ণিমাকে ঘিরে অনেক বৌদ্ধবিহারে চলে তিনদিনব্যাপী নানামুখী অনুষ্ঠান। বৌদ্ধধর্মীয় পর্ব হিসেবে এ দিনে সাধারণ সরকারি ছুটি থাকে। রেডিও, টেলিভিশনে প্রচার করা হয় বিশেষ আলাপ অনুষ্ঠান। বিভিন্ন বিহার ও সংগঠন কর্তৃক স্মরণিকা, ম্যাগাজিন ও স্মারকগ্রন্থও প্রকাশ করা হয়। বিভিন্ন গ্রামে ও বিহারে এদিন মেলা বসে। তন্মধ্যে চট্টগ্রামের এক গ্রামে বোধিদ্রুম মেলা হয় বুদ্ধপূর্ণিমা অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। এ এক অন্যতম উৎসব যা শুধু বাংলাদেশ নয় চীন জাপান শ্রীলঙ্কা মায়ানমারে মহাআড়ম্বরপূর্ণ ভাবে পালিত হয়।
লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী।
