অবাক ফ্রান্সিসের একলা ভ্রমণ
বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ের মধ্যকার টেস্টের প্রথম দিন। মিরপুরে শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পেসবক্সভর্তি ক্রীড়া সাংবাদিক। মাত্রই খেলা শুরু হওয়ায় প্রতিটি বলে নজর তাদের। এরমধ্যে একজন ব্যতিক্রম। কারও সঙ্গে কথা নেই; প্রেসবক্সের একটা পাশে বসে মোবাইলে চার্জ দেওয়ার চেষ্টায় তিনি ব্যস্ত। একটু চেষ্টার পর মাথায় হাত, ভেঙে গেছে চার্জারের পোর্ট!
এগিয়ে যেতেই পরিচয় দিয়ে সাহায্য চাইলেন, ‘একটা চার্জার কেবল ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন? কীভাবে পেতে পারি?’ মিরপুরের প্রেসবক্সে নতুন এই মানুষটির নাম ফ্রান্সিস নায়ামুটসাম্বা। জিম্বাবুয়ে থেকে একমাত্র সাংবাদিক হিসেবে সিরিজটি কভার করতে এসেছেন। উঠেছেন হোটেল সোনারগাঁওয়ে। তার মানে, জিম্বাবুয়ে দলের সঙ্গেই আছেন তিনি।
একমাত্র সাংবাদিক বলে টিম হোটেলে আছেন ফ্রান্সিস, এমন নয়। প্রতিটা সফরে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট একজন সাংবাদিককে সঙ্গে রাখে। সঙ্গে রাখা সাংবাদিকের যাবতীয় খরচ বহন করে কিছুদিন আগেই আইসিসির নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হওয়া জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট। জিম্বাবুয়ে থেকে ঢাকার ফ্লাইটের মূল্য কত জানতে চাইলে ফ্রান্সিস বলে উঠলেন, ‘কোনো ধারণা নেই।’
তার উত্তর অবাক করার মতোই। তাই পাল্টা প্রশ্ন করতে হলো, ‘না জেনে কীভাবে কাটলেন টিকেট?’ এই প্রশ্নের উত্তরে একজন সাংবাদিককে নিয়ে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের সফর করার পুরো প্রক্রিয়াটি বলে দিলেন ফ্রান্সিস, ‘আমার সব ব্যবস্থা বোর্ড করেছে। টিম হোটেলেই আছি। এ কারণেই ফ্লাইট, হোটেল খরচ সম্পর্কে ধারণা নেই। প্রতিটা সফরেই জিম্বাবুয়ে এই ব্যবস্থা রাখে। এবার সেই সুযোগটা আমাকে দেওয়া হয়েছে।’
ফ্রান্সিসের বয়স ৩৩; সাংবাদিকতা করছেন ১২ বছর ধরে। জিম্বাবুয়ের জাতীয় টেলিভিশন জিম্বাবুয়ে ব্রডকাস্টিং করপোরেশনে কাজ করেন তিনি। শুধু ক্রিকেট নয়, ফুটবল, রাগবি নিয়েও কাজ করতে হয় তাকে। মূলত ফুটবল রিপোর্টিংয়ের পেছনে বেশি সময় ব্যয় করেন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আসা ফ্রান্সিস।
এবার নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে ফ্রান্সিসের। ফুটবল বা রাগবি উন্মাদনা দেখে অভ্যস্ত জিম্বাবুয়ের জনপ্রিয় এই ক্রীড়া সাংবাদিক দেখছেন ক্রিকেট নিয়ে পাগলামি। ফ্রান্সিসের ভাষায়, ‘তোমাদের এখানকার মানুষ ক্রিকেটের জন্য পাগল। এটা আগেই দেখেছি। গত কয়েক দিনে নিজ চোখে দেখলাম। যদিও দর্শক সেভাবে দেখছি না।’
মাঠে সেভাবে দর্শক না দেখে কিছুটা অবাকই হয়েছেন ফ্রান্সিস। তবে তাকে বেশি অবাক করেছে পেসার দিয়ে ইনিংস শুরু করানোয়। বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ নিয়ে জিম্বাবুয়ের এই ক্রীড়া সাংবাদিক বললেন, ‘অবাক হয়েছি পেসারকে শুরু করতে দেখে। সাধারণত স্পিনার দিয়েই এই কাজটা করে থাকে বাংলাদেশ।’
ফ্রান্সিসের বিস্ময়ের শেষ নেই। প্রেসবক্সে সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে রীতিমতো চমকে গেছেন তিনি। যদিও অন্যান্য সময়ের তুলনায় এদিন সাংবাদিকদের উপস্থিতি কম হয়েছে। ৬০-৬৫ জন ক্রীড়া সাংবাদিক প্রেসবক্সে এসেছেন। এতেই ফ্রান্সিস বলছেন, ‘এত সাংবাদিক! আমাদের ওখানে সব মিলিয়ে ৭০ জনের মতো ক্রীড়া সাংবাদিক আছে হয়তো।’
এক যুগ ধরে নিজ দেশের ক্রিকেটের অনেক কিছুই দেখেছেন ফ্রান্সিস। সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে গত বছর জিম্বাবুয়ের সদস্য পদ স্থগিত করে আইসিসি। সেই সময় ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন ফ্রান্সিস, ‘খুব ভয় পেয়েছিলাম আমরা। ভাবছিলাম কী হতে যাচ্ছে আমাদের ক্রিকেটে। কবে ক্রিকেটে ফিরবে আমাদের দেশ, কেমন হবে- এ নিয়ে চিন্তার শেষ ছিল না।’
কয়েক মাস পরই জিম্বাবুয়ের সদস্য পদ ফিরিয়ে দেয় আইসিসি। এখন ভালোই চলছে সেখানকার ক্রিকেট। নতুন পথে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট পরিচালক হ্যামিল্টন মাসাকাদজাকে সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দিচ্ছেন ফ্রান্সিস। সাবেক অধিনায়ককে নিয়ে তার মূল্যায়ন, ‘ও আসার পর ভালো কাজ হচ্ছে, অনেক কিছু বদলাচ্ছে। ব্যাপারটি জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের জন্য খুবই ভালো।’
আড্ডার ফাঁকে ঢাকার বায়ু দুষণের একটি রিপোর্ট চোখে পড়ে ফ্রান্সিসের। রিপোর্টটির দিকে মনোযোগ বাড়ান তিনি। যদিও এতে চিন্তিত নন ফ্রান্সিস। ঢাকার মানুষের আন্তরিকতা বাকি সব কিছু ভুলিয়ে দিচ্ছে তাকে। ফ্রান্সিস বলছেন, ‘না, না, এসব তেমন কিছু নয়। এখানকার মানুষ এত আন্তরিক যে, বায়ু দুষণের দিকে মনই যায়নি। ভালো লাগছে বাংলাদেশে। উপভোগ করছি।’
