পশ্চিমবঙ্গের পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে ‘বিজেপির পূর্বসূরি’ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জীবনী; কাটছাঁট হবে মোগল ইতিহাস
২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে সংশোধিত স্কুল শিক্ষাক্রম চালু করছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এর আওতায় স্কুলের পাঠ্যবইগুলোতে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জীবন, অবদান ও উত্তরাধিকার সম্পর্কিত পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা হবে। শ্যামাপ্রসাদ ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক পূর্বসুরি ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা। এর বাইরে পাঠ্যবইয়ে মোগল আমলের ওপর অন্তর্ভুক্ত অংশেও কাটছাঁট করা হবে। এছাড়া বাদ দেওয়া হবে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হওয়া সিঙ্গুর জমি আন্দোলনের অধ্যায়।
পশ্চিমবঙ্গের উচ্চপর্যায়ের সিলেবাস-কাম-কারিকুলাম কমিটি জানিয়েছে, এসব পরিবর্তন বৃহত্তর পাঠ্যসূচি সংস্কারের অংশ। এ সংস্কারের মাধ্যমে নির্ধারিত সাহিত্যকর্মগুলোতেও পরিবর্তন আনা হবে। কমিয়ে আনা হবে কমিউনিজম ও মোগল আমল সম্পর্কিত অংশগুলো।
পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন জানিয়েছেন, সিলেবাস কমিটি পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষাক্রমে এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে। তারা বলছে, ভারতীয় সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অবদানের ওপর বেশি জোর দেওয়ার জন্য পাঠ্যবইয়ে এসব পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
সংশোধিত এই স্কুল শিক্ষাক্রম ২০২৭ সালের ২ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
কমিটির চেয়ারপারসন অধ্যাপক দেবাশীষ চ্যাটার্জি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের শুরুতেই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির প্রসঙ্গ অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই বাঙালি নেতা ১৯৫১ সালে বিজেপির পূর্বসূরি দল ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
দেবাশীষ চ্যাটার্জি বলেন, 'শিক্ষার্থীরা যেন তার সম্পর্কে জানতে পারে, সেজন্য সব পাঠ্যবইয়ের শুরুতেই ডা. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে নিয়ে একটি লেখা থাকবে। প্রতিটি শ্রেণির বইয়েই এটি যুক্ত করা হবে।'
এর আগে উচ্চশিক্ষা বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে রাজ্য-সহায়তাপ্রাপ্ত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একাডেমিক কার্যক্রমে শ্যামাপ্রসাদের জীবনী অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছিল।
এসব পরিবর্তনের অংশ হিসেবে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের বই থেকে সিঙ্গুর জমি আন্দোলনের অধ্যায়টি সরিয়ে ফেলা হবে। সাবেক তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে ২০১৭ সালে সিঙ্গুর আন্দোলন পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের টাটা মোটরস প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির স্বাস্থ্য ও শারীরশিক্ষা পাঠ্যবইয়ে থাকা কন্যাশ্রী প্রকল্পের অধ্যায়ও বাদ দেওয়া হবে। কিশোরীদের জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার ও সার্বিক কল্যাণে ২০১৩ সালে রাজ্য সরকার শর্তসাপেক্ষ নগদ অর্থ হস্তান্তরের এই প্রকল্প চালু করেছিল।
ভাষা ও সাহিত্যে পরিবর্তন
প্রস্তাবিত এই সংস্কারে বাংলা ভাষার পাঠ্যবইগুলোতেও পরিবর্তন আনা হবে। দেবাশীষ চ্যাটার্জি জানান, পশ্চিমবঙ্গের দৈনন্দিন বাংলায় কম প্রচলিত বলে বিবেচিত বেশ কিছু শব্দ বাদ দেওয়া হবে কিংবা বদলে ফেলা হবে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, 'পানি' শব্দের বদলে 'জল' ব্যবহার করা হবে। এছাড়া 'আম্মা' ও 'আব্বা'-র মতো শব্দগুলোতেও পরিবর্তন আনা হবে।
দেবাশীষ আরও জানান, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত সাহিত্যপাঠেও পরিবর্তন আনা হবে। মাধ্যমিকের পাঠ্যসূচিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'আফ্রিকা' কবিতার বদলে তারই লেখা 'শিবাজী উৎসব' কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
তিনি বলেন, 'আমরা যখন বিকশিত ভারতের কথা বলছি, তখন আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরা প্রয়োজন; তাই এই কবিতাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
একইভাবে শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের নাটক 'সিরাজউদ্দৌলা'-র জায়গায় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের 'মেবার পতন' নাটকটি স্থান পাবে।
সিলেবাস কমিটি কমিউনিজম ও মোগল মুঘল আমল সম্পর্কিত অংশগুলোতে পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে। একইসঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যুক্ত ব্যক্তিত্বদের ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেবাশীষ বলেন, 'বছরের পর বছর ধরে আমাদের মুখস্থ করানো হয়েছে কে তাজমহল তৈরি করেছিল; জানতে হয়েছে তাদের পূর্বপুরুষ ও নাতি-নাতনিদের নাম। অথচ দেশের স্বাধীনতার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের কথা ইতিহাস বইয়ে না থাকায় কেউ তাদের চেনে না। তাই এবার তাদের কথাই পাঠ্যবইয়ে তুলে ধরা হবে।'
কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলা ও ইংরেজি ভাষার বেশ কিছু অধ্যায় অনুমোদনের জন্য ইতিমধ্যে রাজ্য সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। বাকি অংশগুলোও শিগগিরই জমা দেওয়া যাবে বলে আশা করছে কমিটি।
