প্রতিমন্ত্রীর ছেলেদের নামে বগুড়ায় ইউনিয়নের নামকরণের অভিযোগ, ‘মতামত নেওয়া হয়নি’ দাবি স্থানীয়দের
সম্প্রতি বগুড়ায় চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠন নিয়ে সমালোচনা ও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নতুন ইউনিয়নগুলোর মধ্যে তিনটির নাম স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গত ১১ জুন জারি করা গেজেট প্রজ্ঞাপন ঘিরে এই বিতর্কের সূত্রপাত। ওই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শিবগঞ্জ ও নবগঠিত মোকামতলা উপজেলার প্রশাসনিক সীমানা পুনর্গঠন করা হয়। এতে মীরবাড়ি, সীমান্ত, দিগন্ত ও স্বর্ণগ্রাম নামে চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ির নাম অনুসারে ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে মীরবাড়ি। আর সীমান্ত ও দিগন্ত নাম দুটি তার দুই ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত ও মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের নামের সঙ্গে মিলে যায়।
বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে, কারণ স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তি, পরিবার বা রাজনৈতিক নেতার নামে ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ নিষিদ্ধ।
নবগঠিত সীমান্ত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত জগন্নাথপুরের বাসিন্দা ইজবর আলী প্রশ্ন তুলেছেন, সরকার যে দাবি করছে জনমতের ভিত্তিতে এসব নাম নির্ধারণ করা হয়েছে—তা কতটা যৌক্তিক।
"আমাদের এখানে নতুন ইউনিয়ন হয়েছে, এ জন্য আমরা প্রতিমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু ইউনিয়নের যে নাম দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি নিজেই বলছেন জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নাম রাখা হয়েছে। কিন্তু কার কাছ থেকে বা কোন জনগণের কাছ থেকে মতামত নেওয়া হয়েছে, তা আমরা এখনো বুঝতে পারলাম না," বলেন তিনি।
প্রকাশিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, শিবগঞ্জ উপজেলার বেতগাড়ি, ফেনীগ্রাম, সৈয়দপুর, চন্দনপুর, দোপাড়া, তিয়াইল, গোড়না, ধামাহার, বাদলদিঘী, রামকান্দি, চকগোপাল, ডাবুর, চককানু, হরিপুর ও গোপিনাথপুরসহ মোট ১৫টি মৌজা নিয়ে 'মীরবাড়ী' নামে নতুন ইউনিয়ন পরিষদ গঠন করা হয়েছে। নতুন এই ইউনিয়নের মোট জনসংখ্যা ১৮ হাজার ৯২৪ জন।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার সাবেক আটমূল ইউনিয়নের বেতগাড়ী এলাকায় মীর শাহে আলমের পৈতৃক ভিটাবাড়ি। সেখানে রাস্তার ধারে টাইলস করা একটি ফলকে 'মীরবাড়ি' লেখা রয়েছে। এই মীরবাড়ি নামেই একটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই এমন সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট নন। সাবেক কিচক ইউনিয়নের হরিপুর গ্রামের বাসিন্দা ও মুদি ব্যবসায়ী মুকুল বলেন, "শুনলাম আমাদের এলাকা মীরবাড়ি ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এটা আমাদের আগে জানানো হয়নি। হঠাৎ করে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আমাদের কিচক ইউনিয়নে যেতে খরচ হতো ৫-১০ টাকা। কিন্তু মীরবাড়ি ইউনিয়ন, যেটা বলা হচ্ছে, সেখানে যেতে খরচ হবে ৩০ টাকা।"
একই কথা জানান পাশের গোপিনাথপুরের বাসিন্দা আলহাজ আলী। তিনি বলেন, "আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে আমরা কিচক ইউনিয়নের বাসিন্দা। কোনো বলা নেই, কওয়া নেই—হঠাৎ শুনি এটা নাকি এখন মীরবাড়ি ইউনিয়ন। নতুন ইউনিয়ন করলে আমাদের জমি-জমার কাগজ থেকে শুরু করে সব কাজে কী ধরনের ঝামেলা পোহাতে হবে, এটা কেউ ভেবে দেখেছে?"
অন্যদিকে, নবগঠিত মোকামতলা উপজেলার মানকৈর, ভবানীপুর, অভিরামপুর, খেরুয়াপাড়া, কিশোরীপুর, জগন্নাথপুর, আমঝুপি, জীবনপুর, কুকি কালিদাস ও কুকি জগন্নাথপুরসহ ১১টি মৌজা নিয়ে 'সীমান্ত' ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে। এ ইউনিয়নের জনসংখ্যা ১৬ হাজার ২৬৭ জন।
গত সোমবার সন্ধ্যায় নবঘোষিত সীমান্ত ইউনিয়ন এলাকার অন্তত শতাধিক ব্যক্তি নামকরণের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেন। তাদের দাবি, এলাকার পুরোনো নাম দিয়েই যেন ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়। কোনো ব্যক্তির নাম দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ তারা চান না।
তবে সবাই যে নামকরণের বিরোধিতা করছেন, তা নয়। নবঘোষিত 'দিগন্ত' ইউনিয়নের পাকুরতলা এলাকার বাসিন্দা মোসতাসিন বিল্লাহ মনে করেন, এতে কোনো সমস্যা নেই। বরং তার এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ হলে তা স্থানীয়দের জন্য আরও ভালো হবে।
মোসতাসিন বিল্লাহ দাবি করেন, "প্রায় পাঁচ মাস আগে এই নামকরণ নিয়ে মতামত যাচাই হয়েছে। মতামতে অধিকাংশ ব্যক্তি দিগন্ত ইউনিয়ন নামের বিষয়ে সমর্থন দিয়েছেন।"
তবে ওই এলাকার অন্তত তিনজনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা জানান, এমন কোনো গণশুনানির বিষয়ে তারা জানেন না।
শিবগঞ্জ ও নবগঠিত মোকামতলা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দু-একজন ছাড়া কেউই ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণে কোনো গণশুনানির কথা জানেন না। যদিও শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমানের দাবি, স্থানীয়দের মতামতের ভিত্তিতেই ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, "সীমান্ত ও দিগন্ত নামের কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। স্থানীয়দের মতামতের ভিত্তিতে এই নামগুলো এসেছে। প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের পদবি এবং ছেলের নামের সঙ্গে কীভাবে মিলে গেল, সে বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।"
কতগুলো নামের মধ্য থেকে এই নামগুলো নির্বাচন করা হয়েছে—এমন প্রশ্নে ইউএনও জিয়াউর রহমান জানান, এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটি এই নামগুলো যাচাই করেছে। কমিটির কাছ থেকে শুনে নামের বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে বলে জানান তিনি।
এ ধরনের কার্যক্রমকে পরিবারতন্ত্রের প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া সদর আসনের নারী প্রার্থী এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) বগুড়া জেলা শাখার সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট দিলরুবা নূরী।
তিনি বলেন, "মানুষ সংকটকালে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে তাদের জনআকাঙ্ক্ষা থেকে। গত আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের পরিবর্তন চেয়েছিল তারা। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, তারা আওয়ামী লীগের শাসনকেই অনুকরণ করছে। শিবগঞ্জ ও মোকামতলায় ইউনিয়নের নামকরণের ঘটনা জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন নয়; এটি পরিবারতন্ত্রের প্রতিফলন।"
ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ নিয়ে গত সোমবার সংসদেও আলোচনা হয়েছে। সে সময় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, "আমার নির্বাচনী এলাকা মোকামতলার দূরবর্তী দুটি ইউনিয়ন সৈয়দপুর ও দেউলী ইউনিয়ন। এই দুটি ইউনিয়ন অনেক বড় ছিল। স্থানীয় প্রশাসন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং জেলা প্রশাসক যাচাই-বাছাই করে গণশুনানি করেছেন। সৈয়দপুর ইউনিয়নটি যেহেতু গাবতলী ও সোনাতলার সীমান্তে, সেই কারণে সৈয়দপুরের সঙ্গে নাম মিল করে সীমান্তবর্তী হওয়ায় নতুন ইউনিয়নের নাম করা হয়েছে সীমান্ত ইউনিয়ন। আরেকটি ইউনিয়নের নাম ছিল দেউলী ইউনিয়ন। সেটি গাইবান্ধার একদম কাছে, অনেক দূরে হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের শুনানিতে সেই ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে দিগন্ত ইউনিয়ন।"
এমন ব্যাখ্যা দিয়ে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, "মিরাক্যালি আমার সন্তানদের নামের সঙ্গে মিলে গেছে ঠিকই। আমার সন্তানের নাম হচ্ছে মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত। আমার যদি ইনটেনশন থাকত সন্তানের নামে ইউনিয়নের নামকরণ করার, তাহলে তো আমি প্রশাসনকে বলতাম মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত রাখতে। কিন্তু ইউনিয়নের নামের আগে তো মীর নেই।
