ব্যবসা সহজ করতে আমদানি পণ্যে কাস্টমসের মর্জিমতো মূল্য নির্ধারণ প্রথার অবসান হচ্ছে
আমদানি পণ্য চালানের ক্ষেত্রে আমদানিকারকের ঘোষিত এবং প্রকৃত লেনদেন মূল্য (ট্রানজেকশন ভ্যালু) গ্রহণ না করে শুল্ক কর্তৃপক্ষের খেয়ালখুশিমতো চালানের মূল্য নির্ধারণের যুগ শেষ হতে যাচ্ছে। এই লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটি নতুন আদেশ জারি করেছে, যার অধীনে স্বীকৃত ওয়েবসাইট এবং জার্নালগুলোকে শুল্কায়নের মূল্য নির্ধারণের মাপকাঠি বা বেঞ্চমার্ক হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপের ফলে কেবল অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে (ওভারভ্যালুয়েশন) অতিরিক্ত কর আরোপের প্রথাই বন্ধ হবে না, বরং মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগও অনেকাংশে কমে আসবে। এর ফলে, ভোক্তারা বছরে আনুমানিক ১৫ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের হাত থেকে রেহাই পেতে পারেন।
এনবিআরের আদেশ অনুযায়ী, আমদানিকারক কর্তৃক আমদানিকৃত পণ্যের দাখিলকৃত মূল্য সংক্রান্ত দলিলাদিতে উল্লিখিত পণ্যের মূল্য সংক্রান্ত তথ্য – আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মূল্য সংক্রান্ত নিরপেক্ষ প্রকাশনা বা ওয়েবসাইট বা বিভিন্ন জার্নাল যেমন: যেমন এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্লাটস, ইন্ডিপেন্ডেন্ট কমোডিটি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেস (আইসিআইএস, লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জ (এলএমই), সাংহাই মেটালস মার্কেট (এসএমএম), ব্লুমবার্গ, ইন্টারন্যাশনাল সুগার অর্গানাইজেশন (আইএসও) বা এ জাতীয় প্রকাশনা থেকে সংগৃহীত তথ্যের সাথে সামঞ্জস্য পাওয়া গেলে— আমদানিকারক কর্তৃক ঘোষিত মূল্যকে শুদ্ধ মূল্যায়ন (লেনদেন মূল্য) হিসেবে গ্রহণ করা যাবে।
এনবিআরের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা, যিনি বাজেট কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "যেসব জার্নালের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি পণ্য কাভার করবে।"
প্রসঙ্গত, সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট এবং প্রকাশনাগুলো নিয়মিতভাবে পণ্যের বৈশ্বিক দাম হালনাগাদ করে এবং লেনদেন মূল্য নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি হিসেবে বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ প্রায়শই বিশ্ববাজারে একবার কোন পণ্যের দাম বাড়লে ওই মূল্যকে ভিত্তি ধরে তার ভিত্তিতে চালানের মূল্যায়ন করে। ব্যবসায়ীরা জানান, সাময়িক বৃদ্ধির পর বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম প্রায়শই স্বাভাবিক স্তরে নেমে আসে বা হ্রাস পায়, কিন্তু কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তখনও সেই উচ্চ রেফারেন্স মূল্যই ব্যবহার করতে থাকে। এতে করে, বাড়তি শুল্ক ও কর দিতে বাধ্য হন আমদানিকারকরা, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার জন্য পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে, আমদানিকারক রেফারেন্স ভ্যালুর চেয়ে বেশি মূল্যে আমদানি করলেও ওই দাম দেখাতে হবে, ফলে আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের সুযোগ কমে যাবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে আন্ডার-ইনভয়েসিং এবং ওভার-ইনভয়েসিং সুযোগ কমে যাবে। ট্রানজেকশন ভ্যালু বা প্রকৃত লেনদেন মূল্যের ভিত্তিতে শুল্কায়ন হলে সরকার প্রকৃত রাজস্ব পাবে, ব্যবসায়ীদেরও অভিযোগের সুযোগ কমে যাবে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "বর্তমান বিদ্যমান ভ্যালুয়েশন বা মূল্যায়ন ব্যবস্থার কারণে প্রচুর লিটিগেশন হয় ও আপিল হয়। এই নতুন ব্যবস্থার ফলে আইনি বিরোধ এবং আপিলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।"
"এটা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় স্বস্তি তৈরি করবে" –বলেন তিনি।
ব্যবসায়ী নেতা এবং বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে "যুগান্তকারী" হিসেবে অভিহিত করেছেন। তারা বলছেন, প্রকৃত মূল্যের ওপর ভিত্তি করে শুল্কায়ন করা হলে তা যেমন ভোক্তার ওপর বাড়তি খরচের চাপ কমাবে, তেমনই আন্ডার বা ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) সুযোগও সীমিত করবে।
সাম্প্রতিক এক হিসাবে দেখা গেছে, কাস্টমস পয়েন্টে আমদানিকৃত চালানের প্রকৃত আমদানিমূল্যের চেয়ে বেশি ভ্যালু ধরে শুল্কায়ন করার কারণে, গত দুই বছরে প্রায় বাড়তি ৩০ হাজার কোটি টাকা দিতে হয়েছে আমদানিকারকদের। শেষপর্যন্ত এই ভার ভোক্তাদের ওপরই পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাঁরা আরও বলেন, কাস্টমসের এই রেফারেন্স মূল্যের বর্তমান চর্চাটি অবৈজ্ঞানিক এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নীতিমালার সাথে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ।
অনেক বছর ধরেই ব্যবসায়ীরা রেফারেন্স মূল্যের ভিত্তিতে কাস্টমসের শুল্কায়নের বিরোধিতা করে আসছেন এবং এর পরিবর্তে প্রকৃত লেনদেন মূল্যের ভিত্তিতে আমদানি শুল্ক গণনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
বিএনপি সরকার এখন ব্যবসায়ীদের সেই দীর্ঘদিনের দাবি পূরণের পদক্ষেপ নিয়েছে।
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান করিম বলেন, "প্রকৃত লেনদেন মূল্যের ভিত্তিতে আমদানি চালানের শুল্কায়নের এই সিদ্ধান্তটি আমাদের জন্য যুগান্তকারী হবে।"
"এতে আমাদের খরচ ও হয়রানি উভয়ই কমার সুযোগ তৈরি হবে" –বলেন তিনি।
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া টিবিএস-কে বলেন, "এই সিদ্ধান্ত নিয়মতান্ত্রিক বা কমপ্লায়েন্ট ব্যবসায়ীদের খরচ ও হয়রানি কমাবে, অন্যদিকে অনিয়মকারী বা নন-কমপ্লায়েন্ট ব্যবসায়ীদের আরও কঠোর নজরদারির মুখোমুখি হতে হবে।"
একে একটি "ল্যান্ডমার্ক উদ্যোগ" হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, "আমরা যখনই শুনানিতে অংশ নিই, দেখি যে কাস্টমসের বেশিরভাগ মামলাই এই পণ্যের মূল্য নির্ধারণের সমস্যাকে কেন্দ্র করে। এই বিরোধগুলো এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে আর সরকারও সঠিক পরিমাণে রাজস্ব পাবে।"
বর্তমান মূল্যায়ন ব্যবস্থা যেভাবে কর বাড়িয়ে দেয়, কোন কোন ক্ষেত্রে বাড়তে পারে ৫০% পর্যন্ত
জিওব্যাগ তৈরির প্রধান কাঁচামাল পলিপ্রোপিলিন ফাইবার (পিপি ফাইবার)-এর ওপর শুল্ক ও করসহ মোট করের হার (টোটাল ট্যাক্স ইনসিডেন্স) আনুমানিক ২৮ শতাংশ।
কনফিডেন্স গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান জিওব্যাগ তৈরি করে। জিও ব্যাগের মূল কাঁচামাল হলো পলিপ্রোপাইলিন ফাইবার বা পিপি ফাইবার। সালমান করিম টিবিএস-কে বলেন, গত আড়াই বছরে পিপি ফাইবারের গড় আমদানি মূল্য ছিল প্রতি টন প্রায় ১,২০০ ডলার। তবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ প্রতি টন ১,৫৫০ ডলার রেফারেন্স মূল্য ধরে আমদানি শুল্কায়ন করেছে, যা প্রকৃত দামের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।
তিনি বলেন, "যদিও বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে এর প্রকৃত আমদানি মূল্য কিছুটা বেড়েছে, তবুও তা প্রতি টনে ১,৩৫০ ডলারের নিচেই রয়েছে। তা সত্ত্বেও আমদানিকারকেরা গত আড়াই বছর ধরে ওই বাড়িয়ে ধরা মূল্যের ওপর ভিত্তি করেই শুল্ক পরিশোধ করে আসছেন। এর ফলে, এই খাতের আমদানিকারকদের প্রতি বছর প্রায় ৭০ কোটি টাকা ইমপোর্ট ট্যাক্স দিতে হয়েছে।"
"বর্ধিত এ মূল্য আমাদের খরচ বাড়িয়েছে, পণ্যমূল্যও বাড়িয়েছে" –যোগ করেন তিনি।
মিরপুরের একজন ক্ষুদ্র আমদানিকারক ফরিদপুর রহমান, যিনি সুইচ, সকেট এবং অন্যান্য ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক পণ্য আমদানি করেন, টিবিএস-কে বলেন, "সুইচ ও সকেট শুল্কায়নের জন্য এনবিআর যে মূল্যে অ্যাসেস করে, তা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। এতে আমাদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে।"
"এই খরচ আমাদের পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যোগ করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। কেননা আমাদের প্রফিট মার্জিন একেবারেই কম" –বলেন তিনি।
কর সংস্কার সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্সের প্রস্তুতকৃত "ট্যাক্স পলিসি ফর ডেভেলপমেন্ট: অ্যা রিফর্ম এজেন্ডা ফর রিস্ট্রাকচারিং দ্য ট্যাক্স সিস্টেম" শীর্ষক একটি নতুন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামগ্রিক আমদানি মূল্য আমদানিকারকদের ঘোষিত লেনদেন মূল্যের তুলনায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে ধরা হয়েছিল।
এই অতিরিক্ত মূল্য চাপানোর (লোডিং) মাধ্যমে সংগৃহীত অতিরিক্ত রাজস্বের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা না হলেও আমদানিকারকদের অনুমান, তাঁরা বার্ষিক ১৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত পরিশোধ করেছেন, যা দুই বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ওই দুই অর্থবছরে আমদানি কর বাবদ মোট ২ লাখ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছিল।
তথ্য-উপাত্ত ব্যবহারের জন্য গুনতে হবে অর্থ
এনবিআর সূত্র জানায়, আদেশে উল্লেখিত আন্তর্জাতিক ডেটাবেজগুলো ব্যবহারের জন্য পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে হবে। সেজন্য সবমিলিয়ে বছরে দুই কোটি টাকার মত খরচ হতে পারে।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, এসব সাইটে এক্সেস পাওয়ার জন্য সাবস্ক্রাইবের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তবে অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, গত এক বছর ধরে এই সাবসক্রিপশন নিয়ে কথা হচ্ছে, কিন্তু তেমন অগ্রগতি হয়নি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা আটকে আছে।
এক্ষেত্রে সমাধান কী?- জানতে চাইলে এনবিআরের ওই কর্মকর্তা বলেন, "আমদানিকারকরা নিজেরাই সাবসক্রাইব করে ওই ডেটা এনবিআরকে দিলে, এনবিআর তা গ্রহণ করবে।"
কিন্তু ছোট পুঁজির আমদানিকারকদের জন্য এই খরচ অনেক বেশি হয়ে যাবে।
তবে ওই কর্মকর্তা বলেন, "একক কোন ব্যবসায়ী না হয়ে যদি তাদের অ্যাসোসিয়েশন বা ব্যবসায়ী সমিতি সাবস্ক্রিপশন করে সেটা তাদের সদস্যদের দেয়, সেই বিকল্পও রয়েছে।"
"আমাদের দরকার হলো ওই ডেটায় এক্সেস। আমাদের নিজস্ব সাবস্ক্রিপশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দেরী হওয়ার কারণে আমদানিকারকরা যদি নিজেরা এই তথ্যের অ্যাক্সেস পেয়ে আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারেন, তবে আমরা তা শুল্কায়নের জন্য গ্রহণ করব।"
