রাজনৈতিক অস্থিরতা, কম বিনিয়োগ: রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার যেসব কারণ জানালেন অর্থমন্ত্রী
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচিত সরকার না থাকা, কম বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ধীরগতি, উৎপাদন ও সরবরাহে ব্যাঘাত এবং কর প্রদানকারী বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ কারণগুলো তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ, লক্ষ্যমাত্রার ৭৫.৭৭ শতাংশ অর্জন হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ কোটি ৪ লাখ টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
রাজস্ব ঘাটতির পেছনে মোট ১১টি কারণ চিহ্নিত করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক পটপরিবর্তনজনিত সাময়িক শূন্যতা, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয়, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং সামষ্টিক অর্থনীতির মন্দাভাব।
তবে বছরের শেষ ভাগে অটোমেশন ও কর ফাঁকি রোধে এনবিআরের কঠোর অবস্থান এই ঘাটতি কিছুটা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করছে।
রাজস্ব ঘাটতির পেছনে যেসব কারণ
রাজস্ব আদায় কম হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশে প্রায় দুই অঙ্কের কাছাকাছি (১০ শতাংশের কাছাকাছি) উচ্চ মূল্যস্ফীতি বজায় থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। ফলে মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবী শ্রেণির প্রকৃত সঞ্চয় ও করযোগ্য উদ্বৃত্ত আয় কমে গেছে।
তিনি বলেন, শিল্প উৎপাদনে ব্যাহত হওয়া, সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়া এবং পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যের ধীরগতির কারণে ব্যবসায়িক আয় কমেছে, যা করপোরেট কর আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এছাড়া গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে তৈরি পোশাক শিল্পসহ অনেক উৎপাদনমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হতে পারেনি বলেও জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও সংকুচিত মুদ্রানীতির কারণে ব্যাংকের ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসার পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। ফলে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিট মুনাফা কমেছে, যা আয়কর আদায়ের বড় উৎস ছিল।
তিনি জানান, আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৫ শতাংশ ও ১০ শতাংশ শুল্কযোগ্য পণ্যের আমদানি যথাক্রমে ১৮ শতাংশ ও ৩৭ শতাংশ কমেছে। এটিও রাজস্ব ঘাটতির অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকার পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর কমিয়েছে এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার করেছে। এসব পদক্ষেপও রাজস্ব আদায়ে প্রভাব ফেলেছে।
বিলাসবহুল গাড়ির আমদানি কমে যাওয়া ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে নতুন এইচএস কোড সংযোজনের কারণে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া ধীরগতির মুখে পড়েছে বলে জানান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সরকার পরিবর্তনের ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দীর্ঘ সময় স্থবির হয়ে পড়ে। এতে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আয় ও কর পরিশোধ উভয়ই কমেছে।
