যেভাবে ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে পারে সাধারণ ব্যথানাশক অ্যাসপিরিন
ব্যথা নিরাময়ে ব্যবহৃত চার হাজার বছরের পুরনো একটি সাধারণ ওষুধ শরীরে নির্দিষ্ট কিছু টিউমার গঠন এবং তা ছড়িয়ে পড়া রোধ করছে—এমন সব তথ্য পাওয়া গেছে যা ইতোমধ্যে বিশ্বের স্বাস্থ্যনীতিতে পরিবর্তন আনছে।
৪০ বছর বয়সী ফার্নিচার নির্মাতা নিক জেমস তার স্বাস্থ্য নিয়ে প্রথম চিন্তিত হয়ে পড়েন যখন তার মা ক্যানসারে মারা যান এবং তার ভাইসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা অন্ত্রের ক্যানসারে আক্রান্ত হন।
তিনি জেনেটিক পরীক্ষা করান এবং দেখা যায় তার শরীরে 'লিঞ্চ সিনড্রোম' সৃষ্টিকারী একটি ত্রুটিপূর্ণ জিন রয়েছে, যা অন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সহযোগিতা এলো এক অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে। জেমস প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এমন একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নাম লেখালেন যেখানে পরীক্ষা করা হচ্ছিল যে, প্রতিদিন এক ডোজ অ্যাসপিরিন—একটি সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধ—ক্যানসার থেকে সুরক্ষা দিতে পারে কি না।
জিনের পরিবর্তনের ধরন অনুযায়ী, লিঞ্চ সিনড্রোমে আক্রান্ত ১০-৮০ শতাংশ মানুষের জীবনে অন্ত্রের ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু জেমসের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ফলাফল ইতিবাচক।
এ গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল জেনেটিক্সের অধ্যাপক জন বার্ন। তিনি বলেন, 'সে আমাদের সাথে ১০ বছর ধরে অ্যাসপিরিন নিচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত তার কোনো ক্যানসার হয়নি।'
এটি বিশ্বাস করা প্রায় অসম্ভব মনে হতে পারে, তবুও অনেক আগে থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল যে এই ওষুধটি কোলোরেক্টাল ক্যানসার ছড়ানো বা এমনকি এটি হওয়া প্রতিরোধ করতে পারে। গত এক বছরে একগুচ্ছ ট্রায়াল এবং গবেষণায় এই প্রমাণ আরও জোরালো হয়েছে।
কিছু দেশ ইতোমধ্যে তাদের চিকিৎসা নির্দেশিকায় এই ওষুধটিকে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য সুরক্ষার প্রথম ধাপ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে (যদিও বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়েছেন যে এটি কেবল চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানেই করা উচিত)। এবং শেষ পর্যন্ত আমরা বুঝতে শুরু করেছি যে কেন এটি এমন রহস্যময় প্রভাব ফেলে।
প্রাচীন শিকড়
এই সর্বশেষ আবিষ্কার আমাদের অন্যতম পুরনো এবং কার্যকর ওষুধের ইতিহাসে এক নতুন মোড় নিয়ে এসেছে। ১৯ শতকের শেষের দিকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার নিপ্পুর শহর (বর্তমানে ইরাক) থেকে চার হাজার ৪০০ বছরের পুরনো মাটির ট্যাবলেট উদ্ধার করেন, যেখানে ভেষজ ও খনিজ উপাদানে তৈরি ওষুধের তালিকা ছিল। তার মধ্যে উইলো গাছ থেকে প্রাপ্ত একটি পদার্থের নির্দেশনা ছিল।
আমরা এখন জানি যে এতে স্যালিসিন নামক রাসায়নিক থাকে, যা শরীর স্যালিসিলিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত করতে পারে ও শরীরের ব্যথা কমায়। এটি আধুনিক অ্যাসপিরিন বা অ্যাসিটাইলস্যালিসিলিক অ্যাসিডের গঠনের সাথে খুব মিল, তবে এটি পেটের জন্য কিছুটা বেশি অস্বস্তিকর ছিল। মিশরীয়, গ্রীক এবং রোমানসহ অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতাও এই প্রতিকার ব্যবহার করত।
এই যৌগের আধুনিক গবেষণা শুরু হয় ১৭৬৩ সালে, যখন ব্রিটিশ পাদ্রি এডওয়ার্ড স্টোন রয়্যাল সোসাইটির কাছে উইলো ছালের গুঁড়োর জ্বর কমানোর ক্ষমতার বর্ণনা দেন। এর প্রায় এক শতাব্দী পরে বিজ্ঞানীরা স্যালিসিলিক অ্যাসিডকে কম ক্ষতিকারক অ্যাসিটাইলস্যালিসিলিক অ্যাসিডে সংশ্লেষণ করতে সক্ষম হন এবং 'বেয়ার' ব্র্যান্ড নামে বাজারে আনেন।
এরপর আরেক শতাব্দী পরে বিজ্ঞানীরা হৃদরোগ প্রতিরোধে অ্যাসপিরিনের অপ্রত্যাশিত উপকারিতা লক্ষ্য করেন—এটি রক্তকে পাতলা করে এবং রক্তকণিকাগুলোর আঠালো ভাব কমিয়ে জমাট বাঁধার ঝুঁকি কমায়। এই কারণে যুক্তরাজ্যের এনএইচএস-এর মতো সংস্থাগুলো হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য প্রতিদিন কম মাত্রার ডোজ নেওয়ার পরামর্শ দেয়।
১৯৭২ সালের মধ্যে এর সম্ভাব্য উপকারিতা ক্যানসার প্রতিরোধ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। আমেরিকান বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেন যে অ্যাসপিরিন মেশানো জল পান করলে ক্যানসার শরীরে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
২০১০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার রথওয়েল হৃদরোগ প্রতিরোধের তথ্যগুলো পুনরায় বিশ্লেষণ করে দেখেন, এই ওষুধটি ক্যানসারের বিস্তার ও প্রকোপ উভয়ই কমিয়ে দিচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান প্রমাণ
জন বার্নের লিঞ্চ সিনড্রোম রোগীদের ওপর করা গবেষণাটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২০ সালে তিনি ৮৬১ জন রোগীর ওপর করা একটি ট্রায়ালের ফলাফল প্রকাশ করেন। ১০ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করে তার দল দেখেছে, যারা কমপক্ষে দুই বছর প্রতিদিন ৬০০ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিন নিয়েছে, তাদের কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি অর্ধেক কমে গেছে।
পরবর্তী ট্রায়ালগুলোতে দেখা গেছে যে এর চেয়ে অনেক কম ডোজ (৭৫-১০০ মিলিগ্রাম) সমানভাবে কার্যকর। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অ্যাসপিরিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেমন বদহজম বা অভ্যন্তরীণ রক্তপাত হতে পারে এবং কম ডোজ শরীরের জন্য সহনীয়।
এই গবেষণার ফলে ২০২০ সাল থেকে যুক্তরাজ্যের চিকিৎসা নির্দেশিকায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন সুপারিশ করা হয় যে লিঞ্চ সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ২০ বছর বয়স থেকেই অ্যাসপিরিন নেওয়া শুরু করা উচিত।
সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আনা মার্টলিং তদন্ত করেছেন, অ্যাসপিরিন তাদের ক্ষেত্রে মেটাস্ট্যাসিসের ঝুঁকি কমাতে পারে কি না যাদের ইতোমধ্যে কোলোরেক্টাল ক্যানসার ধরা পড়েছে।
প্রায় দুই হাজার ৯৮০ জন রোগীর ওপর করা তিন বছরের ট্রায়ালে দেখা গেছে, অস্ত্রোপচারের পর নিয়মিত ১৬০ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিন গ্রহণকারীদের ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি অর্ধেকেরও কম ছিল।
মার্টলিং-এর এই গবেষণার পর ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সুইডেনে অন্ত্রের ক্যানসার রোগীদের নির্দিষ্ট মিউটেশন স্ক্রিনিং করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে স্বল্প মাত্রার অ্যাসপিরিন দেওয়া হচ্ছে।
এটি কীভাবে কাজ করে?
অ্যাসপিরিন কীভাবে ক্যানসার প্রতিরোধ করে তা দীর্ঘকাল রহস্য হয়ে ছিল। মার্টলিং-এর মতে, এই ওষুধটি শরীরের 'কক্স-২' এনজাইমকে বাধা দেয় যা কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটায়। সাম্প্রতিক গবেষণা আরও বলছে যে এটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার টি-কোষকে শক্তিশালী করে ক্যানসার কোষ শনাক্ত ও ধ্বংস করতে সাহায্য করে।
এটি কি সবার জন্য?
অ্যাসপিরিন কি সবার নিয়মিত নেওয়া উচিত? অধ্যাপক জন বার্ন আশাবাদী। তিনি একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন, পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রতিটি ব্যক্তি ১০ বছর ধরে 'বেবি অ্যাসপিরিন' নেয়, তবে জাতীয় মৃত্যুহার চার শতাংশ কমে যাবে। তবে বেশিরভাগ গবেষক মনে করেন এটি কেবল নির্দিষ্ট রোগীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। কারণ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এর দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অ্যাসপিরিন নিয়ে গবেষণা যত বাড়ছে, ততই নতুন সব চমক সামনে আসছে। হয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরেরা এই ওষুধটি এমন সব উপায়ে ব্যবহার করবে যা আমরা আজ কল্পনাও করতে পারছি না।
