প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন মেজর সিনহাকে হত্যা করা হয়েছে
কক্সবাজারের বাসিন্দা হামিদ উল্লাহ বলেছেন, তিনি পুলিশকে গুলিবর্ষণ করতে দেখেছেন। ওই গুলির ঘটনাতেই সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এই ঘটনাকে তিনি হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেন। তার ভাষ্যমতে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে পুরো ঘটনাটা ঘটে।
'শুক্রবার রাত থেকে আমি চোখ বন্ধ করতে পারছি না, ওই ভয়াবহ দৃশ্য আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে,' বলেন হামিদ উল্লাহ।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) কক্সবাজারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি দিনব্যাপী বৈঠক করেছে। তদন্ত দলের প্রধান চট্রগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজানুর রহমান বলেছেন, 'আমরা সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেব।'
শুক্রবার রাতে, কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভে পুলিশ গুলি চালালে, গুলিবিদ্ধ হনন মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দ্রুত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার রাতের কথা স্মরণ করে হামিদ উল্লাহ বলেন, রাতে বাড়ি ফেরার সময় পথে পুলিশকে গাড়ি থামাতে দেখেছেন তিনি।
'গাড়ি থামার নির্দেশ পেয়ে, সেনাবাহিনীর টি-শার্ট পরা এক লোক হাত তুলে গাড়ি থেকে নেমে আসে। আর পুলিশ তখনই কোনো রকম সতর্কতা ছাড়াই গুলি চালায়,' ঘটনার সাক্ষী হামিদ উল্লাহ জানান।
'গুলি খেয়ে লোকটা মাটিতে পরে যায়। পুলিশ তখন বুট দিয়ে তার গলা চেপে ধরে, তখন গুলিবিদ্ধ লোকটা গোঙাচ্ছিল,' বলেন হামিদ উল্লাহ।
'গুলি চালানোর ১৫-২০ মিনিট পরে টেকনাফ পুলিশের ওসি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। ওসি আহত ব্যক্তিকে পরখ করে রাস্তার এক পাশে নিয়ে যান। এই পুরো ঘটনাটা ঘটে আধ ঘন্টা সময়ের মধ্যে,' বলেন প্রত্যক্ষদর্শী হামিদ উল্লাহ।
'আমি চোখ বন্ধ করলেই ঘটনাটা ভেসে ওঠে আমার চোখের সামনে,' যোগ করেন তিনি।
ঘটনার দ্বিতীয় প্রত্যক্ষদর্শী রিয়াক আলী। পুলিশের চেকপয়েন্ট থেকে মাত্র ১০-১৫ ফিট দূরত্বে অটোরিকশা থামায় সে, দেখে, 'পুলিশের থামার সিগন্যাল পেয়ে একটা গাড়ি থামল, একজন লোক মাথার উপরে হাত উঠিয়ে বেড়িয়ে আসামাত্র গুলি চালায় পুলিশ। 'তাকে গুলি খেতে দেখেই আমি ভয় পেয়ে গিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল সটকে পড়ি,' অটোচালক লিয়াকত আলী জানান।
তৃতীয় সাক্ষি স্থানীয় মসজিদের ইমাম নুরুল আমিন। 'আমি নামাজ শেষে মসজিদের ছাদে উঠেছি। দেখি কক্সবাজারগামী একটা গাড়ি থামিয়েছে পুলিশ, তারপরই আচমকা যুবককে গুলি করা হল।'
এ পর্যন্ত দু'জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিনহার লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্রটি জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ দুটি মামলা দায়ের করেছে। এবং বাহারছড়া ফাঁড়ি থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে ২১ সদস্যকে। সিনহা মারা যাবার পর, তার সহযাত্রী সিফাতকে পুলিশী হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং পুলিশের মামলায় তাকেই একমাত্র অভিযুক্ত দেখানো হয়েছে।
মামলায় পুলিশ আরও উল্লেখ করেছে, তারা গাড়ি থেকে ৫০টি ইয়াবা বড়ি, গাঁজা এবং দুই বোতল বিদেশী মদ জব্দ করা হয়েছে।
নিহতের পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, গুলি চালানোটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটা স্রেফ একটা হত্যাকাণ্ড।
একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিনহার পরিবার অভিযোগ করে বলেছে, পুলিশ তার মায়ের কাছ থেকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার সময়, অবসরপ্রাপ্ত মেজরের মৃত্যুর সংবাদ গোপন করে গেছে।
মেজর সিনহার মা নাসিমা আক্তার সংবাদ মাধ্যমকে জানান, টেকনাফ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তাকে ফোন করে সিনহার বিষয়ে খোঁজখবর করেন, সিনহার পেশা কি, কোথায় পড়াশোনা করেন- এ বিষয় জানতে চান।
টিভি সাক্ষাৎকারে সিনহার মা এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে সুষ্ঠ বিচার দাবি করেছেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঙ্গলবার বিকেলে নিহতের মাকে ফোন করে তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। এবং যথাযথ তদন্ত, ন্যায়বিচার এবং প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
