চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে ফ্লাইট সংকট, ভাড়া বেড়েছে ৪০ শতাংশ
চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে করোনার আগে চারটি বিমান সংস্থার ফ্লাইট চলাচল করলেও বর্তমানে চালু আছে মাত্র একটি বিমান সংস্থার ফ্লাইট। ফ্লাইট সংকটের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, ভ্রমণ সহ প্রয়োজনীয় কাজে কলকাতা যেতে যাত্রীদের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।
গত ১ বছরের ব্যবধানে এই রুটে ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। বাড়তি ভাড়া দিয়েও টিকেট পাচ্ছে না যাত্রীরা, এমন অভিযোগ ব্যবসায়ী এবং যাত্রীদের। এই সংকট সমাধানে চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে বিমান সংস্থাগুলোর প্রতি ফের ফ্লাইট চালু করার অনুরোধ জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বিমান সংস্থা, ব্যবসায়ী, এই রুটে নিয়মিত যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এক বছর আগে চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে আসা যাওয়ার ভাড়া ছিলো ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এখন এই ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। কখনো কখনো এই ভাড়া ২৫ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যায় বলে জানিয়েছেন তারা।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ টিবিএসকে বলেন, ব্যবসা বাণিজ্য, চিকিৎসা এবং পর্যটক হিসেবে চট্টগ্রাম থেকে কলকাতায় প্রচুর লোক যাতায়াত করে। করোনা পরবর্তী কলকাতায় যাত্রী বাড়লেও কমেছে ফ্লাইট সংখ্যা। ফলে জরুরী প্রয়োজনে কলকাতায় যাওয়ার সহসা সুযোগ নেই।
ফ্লাইট সংখ্যা কম থাকায় যাত্রীদের বাধ্য হয়ে বেশি দামে টিকেট ক্রয় করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই রুটে চলাচালকারী বিমানসংস্থাগুলোকে অচিরেই ফ্লাইট চালু করতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করি।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক উইং কমান্ডার তসলিম আহমেদ টিবিএসকে বলেন, চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে এখন শুধুমাত্র ইউএস বাংলার ফ্লাইট চালু আছে। আশা করছি বাংলাদেশ বিমান এবং স্পাইস জেট এই রুটে শীঘ্রই পুনরায় ফ্লাইট চালু করবে।
করোনা সংক্রমণের আগে চট্টগ্রাম- কলকাতা রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস বাংলা, রিজেন্ট এয়ার এবং স্পাইস জেটের ফ্লাইট চলাচল করতো। রিজেন্ট এয়ারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে এক পর্যায়ে বাকি তিনটি বিমান সংস্থার ফ্লাইট চালু থাকে।
করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে ইউএস বাংলা এবং স্পাইস জেট ফ্লাইট চালু করে। গত বছরের অক্টোবর থেকে ভারতীয় বিমান সংস্থা স্পাইস জেটও এই রুটে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করে।
বিমান সংস্থার প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে রিজেন্ট এয়ার স্পাইস জেট ৭৮ সিটের বিমানে সপ্তাহে ৭ দিন ফ্লাইট পরিচালনা করতো। সেই হিসেবে সপ্তাহে ৫৪৬ জন যাত্রী পরিবহন করা যেতো।
এই রুটে রিজেন্ট এয়ার ১৬২ যাত্রী নিয়ে সপ্তাহে ৭ দিন ফ্লাইট পরিচালনা করতো। সেই হিসেবে প্রতি সপ্তাহে রিজেন্ট এয়ারে ১১৩৪ জন যাত্রী পরিবহন করতো।
বাংলাদেশ বিমান চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে সপ্তাহে তিনটি ফ্লাইট পরিচালনা করতো। দুই মাস পর এই রুটে যাত্রী পরিবহন বন্ধ করে দেয় বিমান। ৭৮ সিটের বিমানে সপ্তাহের তিন দিনে ২৩৪ জন যাত্রী পরিবহন করতো বাংলাদেশ বিমান। ইউএস বাংলা প্রতি ফ্লাইটে ৭২ জন হিসেবে প্রতি সপ্তাহে ৫০৪ জন যাত্রী পরিবহন করে।
যখন একসাথে চারটি বিমান সংস্থার ফ্লাইট চালু ছিলো প্রতি সপ্তাহে ২৪১৮ জন যাত্রী পরিবহন করতে পারতো। কিন্তু বর্তমানে ইউএস বাংলার ফ্লাইটে সপ্তাহে ৫০৪ জন যাত্রী পরিবহন করা যাচ্ছে। বর্তমানে প্রতিটি ফ্লাইটে আসন সংখ্যার পরিপূর্ণ যাত্রী আসা-যাওয়া করছে বলে জানিয়েছে ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষ।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস লিমিটেডের মার্কেটিং সাপোর্ট অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার কামরুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে যাত্রীদের চাপ রয়েছে। ইচ্ছে থাকলেও আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে ২০২০ সালের নভেম্বরে প্রথম ফ্লাইট চালু করে কম ভাড়ার বিমান সংস্থা স্পাইস জেট। চট্টগ্রাম কলকাতা রুটে একমুখী ভাড়া নির্ধারণ করে ৫ হাজার ৬১৩ টাকা। এছাড়া আসা-যাওয়া মিলিয়ে ভাড়া ১০ হাজার ১০৪ টাকা।
বাংলাদেশে করোনার প্রকোপ শুরু হলে কয়েক মাসের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় স্পাইস জেটের ফ্লাইট। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে ২০২২ সালের শুরুতে ফের চালু করে এই রুটে বিমান চলাচল। ২০২২ সালের অক্টোবরে আবারো বন্ধ হয়ে যায় স্পাইস জেটের ফ্লাইট। বন্ধ হওয়ার আগে এই রুটে যাওয়া-আসা মিলিয়ে টিকিটের মূল্য ছিলো ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা।
স্পাইস জেট চট্টগ্রামের ইনচার্জ আসিফ চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, "সেফটি সিকিউরিটির নিশ্চিতের জন্য এয়ারক্রাফটগুলো রি-চেক করা হচ্ছে। ফলে এয়ারক্রাফট শর্টেজ তৈরী হয়েছে। এ কারণে চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে স্পাইসজেটের বিমান চলাচল বন্ধ রয়েছে। আমরা আশা করছি শীঘ্রই আবারো এই রুটে ফ্লাইট চলাচল শুরু হবে।"
চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরের স্টেশন ম্যানেজার মো: সলিমুল্লাহ বলেন, চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে ভারতের কোন বিমানবন্দরে বাংলাদেশ বিমানের কোন ফ্লাইট নেই। চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে ফ্লাইট চালুর বিষয়ে বিমান কর্তৃপক্ষের এই মুহুর্তে কোন পরিকল্পনা নেই।
অন্য রুটেও বেড়েছে বিমানভাড়া
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বর্তমানে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম-দুবাই রুটে ফ্লাই দুবাই, চট্টগ্রাম শারজাহ ও আবুধাবি রুটে এয়ার আরাবিয়া, চট্টগ্রাম-কুয়েত রুটে জাজিরা এয়ার ওয়েজ, চট্টগ্রাম-মাসকট রুটে ওমান এয়ার ও সালাম এয়ার এবং চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে ইউএস বাংলা ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এছাড়া বাংলাদেশ বিমান জেদ্দা, দুবাই, ওমান, শারজাহ ও ইউএস বাংলা মাসকট ও দোহা রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
শুধুমাত্র চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটেই নয়, চট্টগ্রাম থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী বিভিন্ন রুটে বিমান ভাড়া ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। তবে ক্ষেত্রবিশেষে ভাড়া বৃদ্ধির হার ৫০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি।
ট্রাভেল এজেন্সি প্রতিষ্ঠান, দ্য আরটিডব্লিউ ট্রাভেল সাপোর্টের প্রোপ্রাইটর রিয়াজ বিন আলী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "বিমান ভাড়া উঠানামা করে ডিমান্ড এন্ড সাপ্লাইয়ের উপর।"
ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত কলকাতা অভিমুখে যাত্রীদের চাপ থাকে। এদিকে রমজানে ওমরাহ হজ্জকে কেন্দ্র করে বিমান ভাড়া ১৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে বিমান সংস্থাগুলো।
তিনি বলেন, "২০১৮ সালে আমরা মাসকটের টিকেট বিক্রি করতাম ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায়। বর্তমানে এই রুটে বিমান ভাড়া ৫২ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত।"
একাধিক ট্রাভেল এজেন্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শারজাহতে ১ বছর আগে আপডাউনে ভাড়া ছিলো ৫০ হাজার টাকা। এখন সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার টাকা থেকে ৮০ হাজার টাকা।আবুধাবিতে এখন আপডাউন ভাড়া ৭৫ হাজার টাকা থেকে ৮০ হাজার টাকা। এক বছর আগে এই রুটে আপডাউন ভাড়া ছিলো ৫০ হাজার থেকে ৫৩ হাজার টাকা। ছয় মাসে আগে জেদ্দা রুটে ওয়ানওয়ে টিকেট ছিলো প্রায় ৫০ হাজার টাকা। বর্তমানে ওয়ানওয়ে টিকেট বিক্রি হচ্ছে ৭০ হাজার টাকায়।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ওমর শরিফ টিবিএসকে বলেন, "এক বছর আগেও চট্টগ্রাম-কলকাতা রুটে আপডাউনে যে ভাড়া ছিলো এখন সেটি ওয়ানওয়ের সমপরিমাণ অর্থাৎ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ বিমান, স্পাইস জেটের ফ্লাইট চালু থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরী হতো না।"
এদিকে চট্টগ্রাম থেকে কলকাতায় সরাসরি বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট চালু করতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মোঃ মাহবুব আলীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম।
গত পাঁচ মার্চ রোববার এক চিঠির মাধ্যমে চিটাগাং চেম্বার সভাপতি এ আহবান জানান। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এ অঞ্চলের ব্যবসায়ী, চিকিৎসা প্রত্যাশী ও পর্যটকের চাহিদার তুলনায় এই রুটে মাত্র একটি ফ্লাইট অপ্রতুল ও টিকেট পাওয়া অত্যন্ত দুঃসাধ্য। এতে করে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা চট্টগ্রামে আসতে গেলে অথবা চট্টগ্রাম থেকে ব্যবসায়ী ও চিকিৎসাপ্রত্যাশীরা উক্ত দেশে যেতে হলে ঢাকা হয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে যা সময় ও অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি অনেকটা ভোগান্তির।
ক্রমবর্ধমান যাতায়াতকারীর সংখ্যা ও চাহিদা বিবেচনায় চট্টগ্রাম-কলকাতা সরাসরি ফ্লাইট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরী ভিত্তিতে প্রয়োজন।
