চিকিৎসকের করোনাভাইরাস পরীক্ষার ফল নিয়ে ধুম্রজাল
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার এক চিকিৎসকের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধুম্রজাল। আলাদা আলাদা ল্যাবে করা দুইবারের পরীক্ষায় ফল এসেছে দুই রকম। বিষয়টি নিয়ে পরষ্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, একজন চিকিৎসককেই যদি করোনাভাইরাসের পরীক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কী হবে?
৭ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার হরষপুরে এক রোগীর নমুনা সংগ্রহে যান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. হামিদা মুস্তফা সেঁওতিসহ চার স্বাস্থ্যকর্মী। ওই রোগীর রিপোর্ট পজিটিভ হওয়ায় নমুনা সংগ্রহের দলে থাকা প্রত্যেকের করোনাভাইরাস পরীক্ষা করতে ১১ এপ্রিল নমুনা নেওয়া হয়।
এরপর ডা. সেঁওতিসহ মোট ২৪ জনের নমুনা পাঠানো হয় ঢাকায়। সেওঁতির নমুনা পরীক্ষা করা হয় ঢাকার চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনে। ১৪ এপ্রিল রিপোর্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ে পাঠানো হয়। রিপোর্টে সেওঁতির করোনা পজিটিভ আসে। বাকি তিন স্বাস্থ্যকর্মীর রিপোর্ট আসে নেগেটিভ।
এরমধ্যে ডা. হামিদা মুস্তফা সেঁওতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে তার স্বামীর বাসা ময়মনসিংহে চলে আসেন। করোনা পজিটিভ হওয়ার খবর জানাজানি হলে শহরের নয়াপাড়ার প্রতিবেশীরা ওই চিকিৎসক দম্পতিকে এলাকা ছাড়ার জন্য চাপ দেয়। বাধ্য হয়ে মঙ্গলবার জেলা সিভিল সার্জন তাদের ময়মনসিংহ এস কে হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে নিয়ে যান। ওইদিনই লকডাউন করা হয় ময়মনসিংহ জেলা।
মঙ্গলবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে আবার করা হয় চিকিৎসকের করোনাভাইরাসের পরীক্ষা। বুধবার রিপোর্ট আসে নেগেটিভ। এমন পরিস্থিতিতে তৈরি হয় ধুম্রজাল।
রিপোর্ট দুই রকমের কেন হয়েছে তার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, বিষয়টি নিয়ে পরষ্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।
ময়মনসিংহ জেলার সিভিল সার্জন এ বি এম মসিউল আলম বলেন, দ্বিতীয়বার পরীক্ষাটি নিয়ম মেনে হয়নি। এই ফল আমি মানছি না। কারণ, নিয়ম হচ্ছে প্রথমবার পরীক্ষা করার আটদিন পর করতে হবে দ্বিতীয়বারের পরীক্ষা।
তিনি বলেন, পরীক্ষাটি আবার করাতে হবে।
বর্তমানে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধীনে ভর্তি রয়েছেন ওই চিকিৎসক। হাসপাতালের উপ পরিচালক ডা. লক্ষ্মী নারায়ণ জানান, নিয়ম মেনেই দ্বিতীয়বার পরীক্ষা করা হয়েছে। যদি জ্বর না থাকে, তাহলে প্রথমবার পরীক্ষার আটদিন পরে দ্বিতীয়বার পরীক্ষার নিয়ম কার্যকর নয়। তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য দুইদিন পর আমরা আবার পরীক্ষা করাব। পরপর দুইবারই যদি করোনা নেগেটিভ আসে, তাহলে তাকে করোনামুক্ত ঘোষণা করে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
বিজয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আশরাফুল আলম বলেন, আমাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন সেন্টার আছে। আমাদের চিকিৎসক এবং স্টাফরা যেন আক্রান্ত না হন, সেজন্য আমরা নিজ থেকেই কিছু নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠাই। আমরা ১১ এপ্রিল ওই চিকিৎসকের নমুনা সংগ্রহ করে পাঠিয়েছিলাম। এরমধ্যে নেগেটিভ আসতেই পারে।
তিনি বলেন, যদি কেউ একবার পজিটিভ হন, তার পরপর যদি দুটি নমুনা নেগেটিভ হয়, তাহলে তাকে 'কমপ্লিট কিউর' বলা হয়। ১৮ এপ্রিল তার আরেকটি নমুনা পাঠানো হবে। ওই নমুনা যদি নেগেটিভ আসে, তাহলে তাকে আমরা 'কিউর' বলতে পারব। এখানে ভুলের কিছু নেই।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ একরাম উল্লাহ জানান, রিপোর্ট পজিটিভ আসার পরও যদি রোগী সুস্থ হয়ে যান, তখন রেজাল্ট নেগেটিভ আসতে পারে। দুটি নেগেটিভ হলে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। ময়মনসিংহের ওই রিপোর্ট সম্পর্কে এখনো দাপ্তরিক কোনো তথ্য তার কাছে আসেনি বলেও জানান তিনি।
এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞের মতামতের জন্য দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড যোগাযোগ করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ও হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলামের সঙ্গে।
তিনি বলেন, এ ধরনের বিভ্রান্তি তৈরির অনেক কারণ থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে নমুনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে ল্যাবের পিসিআর মেশিনে যাওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকটি ধাপেই নমুনা ধ্বংসের সুযোগ রয়েছে। তাই নির্দিষ্ট প্রটোকল মেনে কাজ করতে হয়। এর কোনো ব্যতয় ঘটলে পরীক্ষার ফলাফল ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, একজন চিকিৎসককেই যদি করোনাভাইরাসের পরীক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কী হবে? এগুলো শুভ লক্ষণ নয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
এর আগে ডা. হামিদা মুস্তফা সেঁওতি মঙ্গলবার তার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া নিয়ে একটি আবেগঘন লেখা লিখেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেটি ভাইরাল হয়।
