'আগে জানলে পুলিশ বিয়েই করতাম না'
করোনাভাইরাসের থাবা থেকে বাঁচতে হলে থাকতে হবে ঘরে। মেলামেশা বা বাইরের কাজকর্মে টানতে হবে লাগাম। দেশের মানুষকে এই নির্দেশনা পালন করাতে মাঠে থাকতে হচ্ছে পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মজীবীদের।
আবার রোগীর খুব কাছে থাকতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। বলা হচ্ছে এরা সবাই চলমান যুদ্ধের অগ্রসৈনিক। অনেকসময় ভুল করার অজুহাতে তিরষ্কারও করা হচ্ছে তাদের।
কেমন আছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা এসব মানুষ? কীভাবে দিন কাটছে তাদের পরিবারের? সেই খোঁজ নিয়েছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
ময়মনসিংহ জেলা পুলিশে কর্মরত এসআই দেবাশীষ সাহা। দিন-রাত মিলিয়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় পান পরিবারের সঙ্গে থাকার। বাকি সময় যায় বর্তমান করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলায় অর্পিত দায়িত্ব পালনে। কর্মস্থলে যেতে ঘর থেকে বের হলে পরিবারের চোখে দেখা দেয় অজানা আতঙ্ক।
কথা হলো তার স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা সাহার সঙ্গে। বললেন, 'ঘরে এক বছরের একজন কন্যা সন্তান রয়েছে। সে (দেবাশীষ) বাইরে যাওয়া আসা করে। সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে যায়। তাই আতঙ্কে থাকি। আমার কোনো কথাই শুনে না সে।'
খানিকটা ক্ষোভ নিয়ে প্রিয়াঙ্কা বলেন, 'আগে জানলে পুলিশ বিয়েই করতাম না!'
ভাইরাস থেকে বাঁচতে যখন সবাই ঘরে থাকছে, তখন মানুষকে রক্ষা করতে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়াই মাঠে ব্যস্ত সময় পার করছেন এসব পুলিশ। হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসায় ঝুঁকি নিয়ে দিন রাত পরিশ্রম করছেন চিকিৎসকরা।
ময়মনিসংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডের রেজিস্ট্রার হাসানুল ইসলাম আকাশ বলেন, 'সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যখন দেখি ডাক্তারদের নিয়ে ঢালাওভাবে অসম্মানসূচক কথা বলা হচ্ছে, তখন খারাপ লাগে। আমরা তো জানি কতটা ঝুঁকির মধ্যে আমরা কাজ করছি। তারপরও উৎসাহ তো পাচ্ছিই না, মিলছে তিরষ্কার!'
এদিকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, এমন স্থানে সরেজমিনে কাজ করছেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মরতরা। কে কোথায় না খেয়ে আছে, কীভাবে মানুষকে ঘরে রাখা যায়- সেই কাজেই কাটছে তাদের দিন-রাত। অনেক সময় হজম করতে হচ্ছে কটাক্ষও।
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান বলেন, 'প্রতিদিনই বিভিন্ন মানুষের সংস্পর্শে যাচ্ছি। সাধারণ মানুষ সামাজিক দূরত্বের নিয়মই মানতে চায় না। অনেকেই অনেক কথা বলে, সেসব কান তুলি না। দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করে যেতে হবে- এটিই বড় কথা।'
বলা হচ্ছে, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পুলিশ, চিকিৎসক আর প্রশাসনের কর্মরতরা থাকছেন প্রথম কাতারে। ঝুঁকি নিচ্ছেন নিজের জীবনের, শঙ্কায় ফেলছেন পরিবারের সদস্যদের।
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আয়েশা হকের মা কহিনুর বেগম বলেন, 'মেয়ে যখন বাসা বের হয়ে যায়, তখন আতঙ্ক নিয়ে তার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করি। ঘরে তার সন্তান রয়েছে, আমিও বয়ষ্ক মানুষ; বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি চাই না সে ঘরের বাইরে যাক। তবু তাকে যেতে হয়।'
শহরের কৃষ্টপুর এলাকার বেগম রওশন আরা সেলিনা বলেন, 'আমার ছেলে ডাক্তার। রোগীর সবচেয়ে কাছে থাকে সে। সন্তানকে এত ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে- কখনো কল্পনাও করিনি। এখন সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করা ছাড়া কোনো উপায় দেখি না।'
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যারা বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাঠে কাজ করছেন, তাদের উৎসাহ দিতে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। তাহলেই এই যুদ্ধে টিকে থাকা সম্ভব।
