লুলার কাছে মিত্রের হার, ব্রাজিলের নির্বাচনকে ‘পাতানো’ বললেন ট্রাম্প
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার জয়ের পর দেশটির নির্বাচনকে 'পাতানো' বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার (২৬ অক্টোবর) ট্রাম্পের মিত্র ফ্লাভিও বলসোনারো ওই নির্বাচন বাতিলেরও দাবি জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার ৮১ বছরে পা দিতে যাওয়া লুলা প্রথম দফার ভোটে বলসোনারোর কাছে হেরে যাওয়ার পর নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে এই ঐতিহাসিক জয় পান। প্রথম দফার পরাজয়ের পর রাজপথ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লুলার বামপন্থী সমর্থকদের মাঝে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়। এই জয়ের মধ্য দিয়ে চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন তিনি।
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর চেয়ে প্রায় ৪৪ লাখ ভোট বেশি পেয়েছেন লুলা।
দেশটির অতি ডানপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ও ৪৫ বছর বয়সী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো শুরু থেকেই নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। মূলত কয়েকটি শহরে পরিবহনজনিত সমস্যার কারণে লুলার অনুরোধে সারা দেশে ভোট গ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছিল।
ভারী বৃষ্টির কারণে ফ্লাভিও বলসোনারো নিজেও কয়েকটি অঞ্চলে ভোটকেন্দ্র খোলা রাখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ভোট গ্রহণের সামগ্রিক সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে তিনি 'অগ্রহণযোগ্য' ও 'নোংরা কৌশল' বলে আখ্যা দেন।
রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্ন অবস্থানে থাকা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা লুলাকে অভিনন্দন জানালেও বলসোনারো পরিবারের ঘনিষ্ঠ মিত্র ট্রাম্প বলেছেন, নির্বাচনটি তার কাছে 'ভয়াবহ' মনে হয়েছে।
ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, 'আমি কোনো পক্ষ নিইনি। তবে সত্যি বলতে, এটিকে আরেকটি পাতানো নির্বাচন বলে মনে হয়েছে... পুরো বিষয়টিকে অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত মনে হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি লুলাকে পছন্দ করি, তার সঙ্গে আমার সম্পর্কও বেশ ভালো। তবে ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানোসহ যেভাবে ভোট গণনা করা হয়েছে, তা আমার কাছে খুবই খারাপ মনে হয়েছে।'
এদিকে সোমবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় ফ্লাভিও বলসোনারো জানান, পুলিশ তাকে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, 'এখন দেশ ছাড়ার ওপর আমার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।'
নির্বাচনে নাটকীয় জয়ের পর রোববার রাতে সাও পাওলোর রাজপথে নেমে এসে উল্লাসে মাতেন হাজারো মানুষ। ৪২ বছর বয়সী আইনজীবী হুলিও কানেলো এই জয়কে 'পুরো গণতান্ত্রিক পরিসরের' বিজয় বলে অভিহিত করেছেন। এএফপিকে তিনি বলেন, 'রাজপথে ও অনলাইনে মানুষের সংগঠিত হওয়ার ফলেই এ জয় এসেছে।'
রোববার রাতে উল্লসিত সমর্থকদের উদ্দেশে লুলা বলেন, 'গণতন্ত্র রক্ষায় জেগে ওঠা বিদ্রোহী তরুণদের কাছে আমি এ জয়ের জন্য ঋণী।'
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ছাড়াও রাশিয়া, চীন, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বহু দেশ লুলাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। এমনকি লাতিন আমেরিকার যেসব ডানপন্থী সরকার ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, তারাও লুলার এই বিজয় মেনে নিয়েছে। নির্বাচনের আগে বলসোনারোকে সমর্থন জানানো কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা বলেছেন, 'ভোটের মাধ্যমে জনগণ যখন তাদের মত জানায়, তখন তাদের ইচ্ছাকে সম্মান জানাতে হবে।'
নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে ফ্লাভিও যেন তার পিতা জইর বলসোনারোর পথেই হাঁটছেন। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজয়ের পরও একইভাবে নির্বাচনী ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন জইর।
সেই নির্বাচনে উত্তেজনার জেরে লুলার শপথ গ্রহণের মাত্র এক সপ্তাহ পর জইর বলসোনারোর শত শত কট্টর সমর্থক ব্রাজিলের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলোতে হামলা চালিয়ে সামরিক হস্তক্ষেপের দাবি জানায়। পরবর্তীতে লুলাকে ক্ষমতা গ্রহণে বাধা দিতে অভ্যুত্থান পরিকল্পনার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন জইর বলসোনারো। বর্তমানে গৃহবন্দি অবস্থায় সেই সাজা ভোগ করছেন তিনি।
তবে বিরোধীদের অভিযোগ নাকচ করে ব্রাজিলের নির্বাচন আদালতের প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টে বলসোনারোর আমলেই নিয়োগ পাওয়া বিচারপতি কাসিও নুনেস মার্কেস এবারের নির্বাচনকে 'সফল' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানোর ফলে সাময়িক কিছু জটিলতা তৈরি হলেও চূড়ান্ত ফলাফলে এর 'কোনো পরিবর্তন আসেনি'।
