টানা ৭৫ বছর কোনো কর্মী ছাঁটাই করেনি এই কোম্পানি; বিশেষ পরিচালন মডেলে গড়ল ইতিহাস
কর্মী ছাঁটাই ছাড়াই ব্যবসায় টানা ৭৫ বছর পূর্ণ করল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইলেকট্রিক্যাল মেটেরিয়ালস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান 'দ্য গ্যান্ড কোম্পানি'। ১৯৫১ সালে সাবেক ক্যান্ডি বিক্রেতা এড গান্ডের হাত ধরে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত একজন কর্মীও ছাঁটাই করেনি।
বিশ্বজুড়ে যেখানে মন্দা এলেই বড় বড় কোম্পানিগুলোতে ছাঁটাইয়ের হিড়িক পড়ে, সেখানে গান্ডের এই সাফল্য দেখতে এবং এর ব্যবসায়িক মডেল শিখতে সেন্ট লুইসে ভিড় জমাচ্ছেন বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নির্বাহী ও সিইও।
বর্তমানে প্রায় ১,৩০০ কর্মী নিয়ে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক বিক্রয়মূল্য প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। বিগত এক দশক ধরে গড়ে ১৮ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি তাদের মুনাফার মার্জিনও দ্বিগুণ করেছে।
বিশ্বখ্যাত জেনারেল ইলেকট্রিক এবং রকওয়েল অটোমেশনের মতো বড় বড় গ্রাহকদের জন্য উচ্চমানের ইনসুলেশন ও মেটেরিয়াল তৈরি করে গ্যান্ড।
ছাঁটাই ছাড়া ব্যবসার নেপথ্য কৌশল
অনেকে এটিকে কেবল একটি 'মানবিক বা মানবিক নেতৃত্বের গল্প' হিসেবে দেখলেও বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত একটি কৌশলী খরচ ও পরিচালন কাঠামো। চাহিদার শীর্ষ সময়ে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ না করাই গান্ডের "নো-লেঅফ" রেকর্ডের মূল চাবিকাঠি।
প্রতিষ্ঠানটি ওভারটাইম, মুনাফা-শেয়ারিং এবং স্বাভাবিক কর্মী প্রস্থানকে নমনীয়তার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। যেকোনো সাধারণ কারখানায় চাহিদার পারদ নেমে গেলে ওভারটাইম কমানো এবং নতুন কর্মী নিয়োগ বন্ধ রাখার মাধ্যমে বছরে প্রায় ১৮ শতাংশ পর্যন্ত শ্রমের সময় কমানো সম্ভব, যা সাধারণ কোনো অর্থনৈতিক মন্দা সামলে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
কর্মীদের জীবনমান ও মালিকানার সুযোগ
গান্ডের সাফল্য কেবল পরিচালন নীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, কর্মীদের জন্য রাখা হয়েছে আকর্ষণীয় বেতন ও মালিকানার সুযোগ।
কারখানা পর্যায়ের একজন শিক্ষানবিস কর্মী ওভারটাইম ও প্রফিট-শেয়ারিং ছাড়াই বছরে গড়ে ৫৫ হাজার থেকে ৬৫ হাজার মার্কিন ডলার আয় করেন।
প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি পদের বেতনের স্কেল অভ্যন্তরীণভাবে প্রকাশ করা হয় এবং আর্থিক হিসাবের বিবরণী মিটিং রুমের দেয়ালে টানানো থাকে।
২০০৯ সালে চালুকৃত 'এমপ্লয়ি স্টক ওনারশিপ প্ল্যানের' মাধ্যমে কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের ৩০ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিলেন। সম্প্রতি চীনসহ অন্যান্য দেশে অবস্থানরত আন্তর্জাতিক কর্মীদেরও এই মালিকানার আওতায় আনতে কোম্পানিটি বিশ্বব্যাপী এক নতুন শেয়ার প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠানটির কর্মী ছেড়ে যাওয়ার হার ১০ শতাংশেরও কম, যার বড় অংশই ঘটে প্রথম বছরে।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈসাদৃশ্য
লিংকন ইলেকট্রিক, নিউকোর কিংবা ব্যারি-ওয়েহমিলারের মতো আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাঁটাইবিহীন নীতি বজায় রাখার জন্য পরিচিত। তবে ২০০৯ সালের বৈশ্বিক মন্দায় বিক্রি ৩০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেলে ওই কোম্পানিগুলোকে অবৈতনিক ছুটি বা কার্যঘণ্টা ৩০ ঘণ্টায় নামিয়ে আনার পথ বেছে নিতে হয়েছিল। সেখানে গ্যান্ড কোম্পানি তাদের টানা প্রবৃদ্ধি ও ইলেকট্রিক্যাল ডিভাইসের বৈশ্বিক উচ্চ চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়িক ভারসাম্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান সাফল্যের সামনে কিছু উদীয়মান চ্যালেঞ্জও দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ব্যবস্থাপকদের এক বৈঠকে উঠে এসেছে যে, কর্মীরা ওভারটাইম শিফটে কাজ করতে আগের চেয়ে কম আগ্রহী। যদি কর্মচারীরা ওভারটাইম না করেন, তবে সর্বোচ্চ চাহিদা সামলাতে প্রতিষ্ঠানকে নতুন কর্মী নিতে হবে, যা নমনীয়তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
ব্যবসার দ্রুত বৃদ্ধির কারণে প্রয়োজনীয় দক্ষ লিডার বা সুপারভাইজার তৈরির গতি কিছুটা ধীরগতির হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে চীনসহ মোট ৮টি আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে একই কর্মীনীতি ও শেয়ার ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা আইনগতভাবে জটিল হতে পারে।
বিশ্ববাজারে ইলেকট্রিক্যাল ট্রান্সফর্মার ও পাওয়ার গ্রিড পণ্যের চাহিদা অব্যাহত থাকা পর্যন্ত গান্ডের এই রেকর্ড অক্ষুণ্ণ থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিষ্ঠানের মূল পরীক্ষাটি আসবে সেদিনই, যেদিন বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা হঠাৎ থমকে দাঁড়াবে।
