নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়লেও ইউরেনিয়াম ছাড়তে নারাজ ইরান, যুদ্ধ বন্ধে চলছে কূটনৈতিক তৎপরতা
ইরানকে ঘিরে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা জোরদার হলেও যুদ্ধ বন্ধে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক উত্তেজনা ও ইয়েমেন সংকট নিয়ে আলোচনা করতে বুধবার তেহরান সফর করেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির।
তবে কূটনৈতিক এই তৎপরতার মধ্যেও তেহরান নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। দেশটি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ হবে না এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালিও খুলে দেওয়া হবে না।
বিশেষ করে নিজেদের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অবস্থান বদলাতে নারাজ ইরান। পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকের পর ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, 'ইরান থেকে এক গ্রাম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামও সরানো হবে না।'
তবে দেশের ভেতরেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমানোর সম্ভাবনা একেবারে নাকচ করেননি তিনি। পারমাণবিক কর্মসূচিকে 'জাতীয় সম্পদ' ও সার্বভৌম অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কোনো নিশ্চয়তা ছাড়া সামরিক চাপের মুখে এ কর্মসূচি ত্যাগ করা হবে আত্মসমর্পণের শামিল।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করার কথা বলে আসছেন। তবে চলতি মাসের শুরুতে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দেন, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনলে সেটি ওয়াশিংটনের জন্য গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে।
পারমাণবিক ইস্যু
২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার আগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) হিসাব অনুযায়ী, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল। পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য প্রয়োজন ৯০ শতাংশের বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। পরবর্তীতে ২০২৬ সালে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আবারও মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরান আইএইএকে পরিদর্শনের অনুমতি দেয়নি। ফলে দেশটির কাছে বর্তমানে কী পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে এবং সেগুলোর বর্তমান অবস্থা কী, তা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না।
পশ্চিমা স্বার্থে কাজ করার অভিযোগ তুলে আইএইএর ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তেহরান। কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে না। তবে একের পর এক হামলার মুখে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) বহাল থাকার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রেজায়ির মতো উচ্চপদস্থ নেতারা।
এদিকে যুদ্ধ এড়াতে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। চলতি সপ্তাহে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকেরা তেহরান সফর করেছেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও ইসরায়েলের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে এসব বৈঠকের পরও উত্তেজনার পারদ নামেনি।
বুধবার তেহরানে এক সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি নতুন করে হামলা ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, 'বাস্তবতা হলো, দেশটি এখন পুরোপুরি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে এবং যুদ্ধ চলছে। আমরা শান্তির পরিস্থিতিতে পৌঁছাইনি; বরং সেখান থেকে অনেক দূরে আছি। তাই সব সিদ্ধান্তই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নিতে হবে।'
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে জানিয়েছেন, নতুন কোনো শর্ত নয়; বরং গত মাসে নিউইয়র্কে উত্থাপিত দাবিগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে মেনে নিতে হবে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে— জুন মাসের সমঝোতা স্মারকে ফিরে যাওয়া, হরমুজ প্রণালিতে ওমানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির স্বীকৃতি, ইরানি বন্দরের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, তেল বিক্রির সুযোগ ও জব্দ সম্পদ অবমুক্ত করা।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সিনিয়র নীতি বিশ্লেষক এলি জেরানমাইয়েহ আল-জাজিরাকে বলেন, 'ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে তারা আলোচনা করতে রাজি। তবে এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়ে সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সরাসরি যুক্ত থাকতে হবে। এ ধরনের আলোচনা শুরু হতে এখনো অনেক বাকি।'
যুক্তরাষ্ট্র কি নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে?
বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে বড় ধরনের অভিযানের বিকল্প হাতে রাখতে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরি ও মেরিন সেনাদল মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে পেন্টাগন।
সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে পারমাণবিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া, এমনকি সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত বোমা 'মাদার অব অল বম্বস' ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়েও মার্কিন প্রশাসনের ভেতর আলোচনা হয়েছে।
এর জবাবে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন প্রেস টিভি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল নতুন কোনো আগ্রাসন চালালে এবার কোনো সীমাবদ্ধতা ছাড়াই চরম জবাব দেবে তেহরান।
এ ছাড়া বিশ্লেষক জেরানমাইয়েহ সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাতের উত্তাপে ইরানও আগাম হামলার কথা বিবেচনা করতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ও ইসরায়েলের নির্বাচনের পর দুই দেশ যৌথভাবে আবারও ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
