ইতিহাসের ভয়াবহতম এল নিনোয় কেন প্রাণ হারিয়েছিলেন লাখ লাখ মানুষ, পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর উপায় কী
বিশ্বজুড়ে নেমে আসা ১৮৭০-এর দশকের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ইতিহাস পড়া মানে কল্পনাতীত এক নারকীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া। চীন, ভারত, ব্রাজিল এবং আরো কিছু দেশে বছরের পর বছর খরা এবং ফসল না হওয়ায় লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যায়।
খাবারের জন্য মানুষ দাঙ্গা, ভিক্ষা, চুরি এমনকি হত্যা পর্যন্ত করেছে। বাঁচার আকুল চেষ্টায় মানুষ জেনেশুনে অসুস্থ পশুপাখি, গাছের শিকড়, কাদা, গৃহপালিত প্রাণী এবং চামড়ার ফালি পর্যন্ত খেয়েছে।
তৎকালীন বহু প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী, সেসময় নরমাংস খাওয়ার ঘটনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। একবেলা খাবারের বিনিময়ে সন্তানদের বিক্রি বা বলি দেওয়া হতো। ক্ষুধার্ত প্রতিবেশীরা যাতে মৃতদেহ তুলে নিয়ে খেয়ে না ফেলে, তার জন্য স্বজনেরা ঘরের ভেতরেই লাশের চারপাশ ইট দিয়ে গেঁথে রেখে দিত। রাস্তার পাশে পাশে সারি সারি লাশ পড়ে থাকত।
এই বিপর্যয় কেবল ক্ষুধাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। যারা অনাহার থেকে বাঁচতে পালিয়ে গিয়েছিল, তারা অপরিচ্ছন্ন আশ্রয়শিবির ও বস্তিগুলোতে আশ্রয় নেয়। যা পরবর্তীতে কলেরা, গুটিবসন্ত ও অন্যান্য প্রাণঘাতী মহামারীর কবলে পড়ে।
চীনে শীত এলে যখন জ্বালানির টাকা ছিল না, তখন মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিত। এরপর চরম অসহায় মানুষগুলো একটু উষ্ণতার জন্য মাটির নিচের গর্তে একসাথে গাদাগাদি করে থাকত। সমাজব্যবস্থা একপ্রকার পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। কোনো অঞ্চলে যখন দরিদ্রদের মৃত্যু শেষ হয়ে আসত, তখন ধনীরাও এই নির্মম পরিণতির শিকার হতো।
অবশেষে যখন বৃষ্টি ফিরল, তখন ফসল বোনার মতো মানুষ বলতে গেলে আর কেউ অবশিষ্ট ছিল না। ১৮৭৬ থেকে ১৮৭৯ সালের মধ্যে ভারত, চীন এবং ব্রাজিলে মোট মৃতের সংখ্যা আনুমানিক ২ কোটি থেকে ৩ কোটি বলে ধারণা করা হয়। বৈশ্বিক পরিমাপে এই মৃত্যুর সংখ্যা হয়তো ৫ কোটিতে গিয়ে পৌঁছেছিল। ইতিহাসবিদ মাইক ডেভিস তার 'লেট ভিক্টোরিয়ান হলোকাস্টস' বইয়ে লিখেছেন, এটি ছিল "সত্যিকারের বৈশ্বিক মাত্রার এক বিশাল মহাবিপর্যয়"।
এই মহাবিপর্যয়ের মূল কারণ
একটি বিশালাকার 'এল নিনো', যা সমুদ্র থেকে বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণে তাপ মুক্ত করেছিল এবং যার ফলে বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরণে মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল।
এল নিনো আবিষ্কারের ইতিহাস
১৮৭৭ সালের বিজ্ঞানীরা 'এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন' (ইএনএসও) চক্র সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। সেসময় আবহাওয়া সংক্রান্ত প্রাথমিক পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছিল। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা মেপে এক জায়গায় জমা করা হতো, বৃষ্টিমাপক যন্ত্র পর্যবেক্ষণ করা হতো এবং বায়ুমণ্ডলীয় চাপ পরিমাপ করা হতো। বিজ্ঞানীরা জানতেন বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরণে কোনো এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটছে, কিন্তু এর মূল কারণ কী তা মোটেই স্পষ্ট ছিল না।
১৮৭৭/৭৮ সালের এল নিনোর ঠিক পরপরই বহু গবেষক নিশ্চিত ছিলেন যে এর জন্য 'সূর্যকলঙ্ক' (সানস্পট)-ই দায়ী। মার্কিন ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) মাইকেল ম্যাকফেডেন বলেন, 'এল নিনোর ক্ষেত্রে এটি ছিল একপ্রকারের প্রস্তর যুগ।
বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের কেউই এই সমস্যা সম্পর্কে জানতেন না। এ বিষয়ে যদি কেউ কিছুটা জেনে থাকেন, তবে তারা ছিলেন কেবল পেরুর জেলেরা।'
১৯২০-এর দশকে এসে পদার্থবিজ্ঞানী গিলবার্ট ওয়াকার প্রথম ক্রান্তীয় অঞ্চলজুড়ে বায়ুমণ্ডলীয় চাপের তারতম্য বা দোলাচল শনাক্ত করেন, যা 'সাউদার্ন অসিলেশন' নামে পরিচিত। এরপর, ১৯৬৯ সালে আবহাওয়াবিদ জ্যাকব বজার্কনেস প্রশান্ত মহাসাগরের পরিবর্তনশীল সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার সাথে 'সাউদার্ন অসিলেশন'-এর সংযোগ স্থাপন করেন এবং 'এল নিনো'-র বৈশ্বিক গতিপ্রকৃতির মানচিত্র তৈরি করেন।
ম্যাকফেডেনের মতে, এটিই ছিল এল নিনো গবেষণার ক্ষেত্রে "বিগ ব্যাং" (বিশাল অগ্রগতি), যা এই ধারণার জন্ম দিয়েছিল যে সঠিক তথ্য ও যন্ত্রপাতির সাহায্যে এল নিনোকে রিয়েল-টাইমে শনাক্ত করা সম্ভব—এমনকি আগে থেকেই এর পূর্বাভাসও দেওয়া সম্ভব।
সাম্রাজ্যবাদী ব্যর্থতা
অবশ্যই, ১৮৭৭ সালের আগেও এল নিনোর ঘটনা ঘটেছে। চীন ও ভারতের কর্তৃপক্ষ বর্ষার বৃষ্টি ব্যর্থ হওয়ার সময়ের জন্য শস্যের মজুদ রাখত। কিন্তু ১৮৭৭/৭৮ সালের এল নিনো ছিল অতীতে ঘটে যাওয়া যেকোনো ঘটনার চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী। 'নোয়া' (এনওএএ)-র আরেক বিজ্ঞানী বোয়িন হুয়াং এবং তার সহকর্মীরা এটি কতটা শক্তিশালী ছিল তা পরিমাপ করতে আধুনিক তথ্য বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।
এই বিশ্লেষণে জাহাজ, বয়া এবং আধুনিক ভাসমান যন্ত্র থেকে প্রাপ্ত সমুদ্রপৃষ্ঠের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত ইতিহাসের তাপমাত্রার রেকর্ড পুনর্নির্মাণ করা যায়।
তিনি বলেন, 'আমাদের সংগৃহীত তথ্যের পুনর্নির্মাণ থেকে আমরা এল নিনোর স্পষ্ট উপস্থিতি পেয়েছি এবং এটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী একটি এল নিনো।' একটি এল নিনোর তীব্রতা সাধারণত ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কতটা পরিবর্তিত হয়েছে তা দিয়ে মাপা হয়।
হুয়াং-এর গবেষণা নির্দেশ করে যে, ১৮৭৭/৭৮ সালে সমুদ্রের স্বাভাবিক বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রবণতাকে হিসাবের মধ্যে রেখেও 'নিনো৩' সূচকে তাপমাত্রা গড়ের চেয়ে ২.৮৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস (+২.৮৮°C) বেশি ছিল। এটি প্রমাণ করে যে, এটি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী—যদি না সবচেয়ে শক্তিশালী—এল নিনো ছিল।
১৮৭৭/৭৮ সালের এল নিনোর ফলে বিশ্বজুড়ে মারাত্মক খরার সৃষ্টি হয়। উত্তর চীনে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে, যেখানে গত ৩০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরা দেখা দেয়। এর পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব ব্রাজিল, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং উত্তর আফ্রিকাতেও পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে উঠেছিল। এর মধ্যে কিছু স্থানে এল নিনো হানা দেওয়ার আগেই খরা শুরু হয়ে গিয়েছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল এল নিনো আসার ঠিক আগে ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে স্বাভাবিকের চেয়ে চরম শীতল পরিস্থিতি তৈরি হওয়া। এর ফলশ্রুতিতে টানা তিন বা তারও বেশি বছর ধরে নামমাত্র বৃষ্টিপাত হয়েছিল এবং একের পর এক ফসলের চরম ক্ষতি ঘটেছিল।
তবে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণে খরার এই প্রভাব আরও বহু গুণে ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ভারতে তৎকালীন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক অনাহার ও দুর্ভিক্ষ থাকা সত্ত্বেও কর আদায়, শস্য মজুদ এবং ইংল্যান্ডে খাদ্য রপ্তানি অব্যাহত রেখেছিল।
চীনে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা শস্যের মজুদ লুট করে এবং অনুন্নত পরিবহন ব্যবস্থার কারণে দুস্থ ও অসহায় মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
খরা কবলিত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শানসি প্রদেশে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম 'গ্র্যান্ড ক্যানেল'-এর পানির স্তর এতটাই নেমে গিয়েছিল যে সেখানে কোনো জলযান চলাচল করতে পারছিল না। সেসময় কোনো রেলপথ ছিল না, আর শানসি প্রবেশের পাহাড়ি পথগুলোতে ডাকাতদের রাজত্ব বজায় ছিল।
এই ডাকাতরা শস্য বহনে ব্যবহৃত গবাদিপশুগুলোকে ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই হত্যা করত। নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিচার্ড সিগার বলেন, "তৎকালীন সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির এই বিশৃঙ্খল চালচিত্রের কারণেই সেই খরাগুলো ভয়াবহ মহাদুর্ভিক্ষে রূপ নিয়েছিল, যার ফলে ভারত ও চীনে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল।"
তবে এল নিনোর পূর্বাভাসকে আরও নিখুঁত ও উন্নত করার সম্ভাবনা থাকলেও এমন এক সময়ে এই অগ্রগতি আসছে যখন জলবায়ু গবেষণা এবং বৈশ্বিক ত্রাণ সহায়তায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় অর্থায়ন মারাত্মকভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-অর্থায়িত একটি 'দুর্ভিক্ষ আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা' বন্ধ করে দেন। ছয় মাস পর ব্যবস্থাটি পুনরায় চালু করা হলেও, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী এরপর থেকে তথ্যের সরবরাহ ও প্রতিবেদন প্রকাশ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।
এছাড়া ডাব্লিউএফপি (ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম), যা জরুরি খাদ্য সাহায্য প্রদান করে থাকে, সেটিতেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থায়ন ব্যাপকভাবে ছেঁটে ফেলেছে। যুক্তরাজ্যের মতো অন্যান্য উচ্চ-আয়ের দেশগুলোও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের বৈদেশিক সাহায্য বাজেট কমিয়ে এনেছে।
এদিকে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীতে অবরুদ্ধতার কারণে জ্বালানি ও সারের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক গম বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছে। সিগার বলেন, 'এই এল নিনোটি অত্যন্ত খারাপ একটি সময়ে আঘাত হানছে।'
তা সত্ত্বেও, আগাম পূর্বপ্রস্তুতি, বিস্তৃত বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ ও পরিবহন এবং আধুনিক কৃষি পদ্ধতির যৌথ প্রভাবে আজকের বিশ্ব ১৫০ বছর আগের তুলনায় একটি দানবীয় এল নিনো মোকাবিলা করতে অনেক অনেক বেশি প্রস্তুত।
ম্যাকফেডেন বলেন, 'আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখন বহু গুণ উন্নত। রোগব্যাধি এবং তা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আমাদের স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছে। এছাড়া আমাদের মানবিক সহায়তাকারী সংস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী রয়েছে , যা ১৮৭৭-৭৮ সালের মতো ৫০ মিলিয়ন (৫ কোটি) মানুষকে না খেয়ে মরতে দেবে না।'
