মরক্কোর প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী কে এই ফাতিমা মানসুরি
সেপ্টেম্বরের সংসদ নির্বাচনে উদার-মধ্যপন্থি দল 'অথেন্টিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি'র (পিএএম) জয়ের পর মরক্কোর বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদ (মোহাম্মদ বিন হাসান আল-আলাউই) মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ফাতিমা এজাহরা আল মানসুরিকে দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।
রাজপ্রাসাদের এক বিবৃতিতে বলা হয়, বাদশাহ আল মানসুরিকে একটি নতুন সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা তিউনিসিয়ার নাজলা বাউদিনের পর তিনি আরব বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হলেন।
গত ২৩ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৩৯৫টি আসনের মধ্যে পিএএম ৯৭টি আসনে জয় পায়। অন্যদিকে ন্যাশনাল র্যালি অব ইন্ডিপেন্ডেন্টস পায় ৬৬টি এবং ইস্তিকলাল পার্টি পায় ৬৫টি আসন। তবে সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ১৯৮টি আসন না পাওয়ায় সরকার গঠনের লক্ষ্যে আল মানসুরিকে অন্যান্য দলের সঙ্গে জোট আলোচনা করতে হবে।
দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি জানিয়েছিলেন, জোট গঠনের আলোচনায় কোনো 'রেড লাইন' থাকবে না এবং সম্ভাব্য অংশীদারদের সঙ্গে অতীতের বিরোধের বিষয়টি তাঁর দল 'ভুলে নতুন অধ্যায় শুরু করেছে'।
বাদশাহ ষষ্ঠ মুহাম্মদের সাবেক উপদেষ্টা ফুয়াদ আলী এল হিম্মা পিএএম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইসলামপন্থি জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির বিপরীতে দলটিকে একটি আধুনিক ও উদার-মধ্যপন্থি শক্তি হিসেবে দেখা হয়।
নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আল মানসুরিকে তরুণদের বেকারত্ব, নাগরিক পরিষেবা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির মতো নানা চাপের মুখে পড়তে হবে। পাশাপাশি স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে মরক্কোয় আয়োজিত হতে যাওয়া ২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপের জোর প্রস্তুতিও তদারকি করতে হবে তাকে।
আল মানসুরি মারাকেশের একটি প্রভাবশালী পরিবার থেকে এসেছেন, যাদের মরক্কোর রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তার বাবা আবদুর রহমান আল মানসুরি ছিলেন সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যিনি পরবর্তীতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে মরক্কোর রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৬ সালে মারাকেশে জন্ম নেওয়া আল মানসুরি আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি অব মঁপেলিয়ে থেকে উচ্চতর গবেষণার ডিপ্লোমা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে অ্যাংলো-স্যাক্সন বিজনেস ল-এর ওপর ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন।
২০০৯ সালে মারাকেশের প্রথম নারী মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে পা রাখেন আল মানসুরি। প্রথম মেয়াদ শেষে ২০২১ সালের নির্বাচনের পর তিনি পুনরায় মারাকেশ মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের নেতৃত্বে ফেরেন। একই সঙ্গে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হিসেবে একাধিক মেয়াদে দায়িত্ব পালন করে সমৃদ্ধ সংসদীয় অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন তিনি।
পরবর্তীতে ২০২১ সালের অক্টোবরে জাতীয় সরকারে যোগ দেন আল মানসুরি। সে সময় তিনি জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা, নগর উন্নয়ন, গৃহায়ন ও নগর নীতিবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প তদারকি করেন। এর মধ্যে রয়েছে সরাসরি আবাসন সহায়তা কর্মসূচি, নগর পরিকল্পনা ও আঞ্চলিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সংস্কার এবং আল হাউজ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কার্যক্রম।
মরক্কোর সংবাদমাধ্যম 'এএম+ মিডিয়া'য় প্রকাশিত এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে তার এক রাজনৈতিক সহযোগী বলেন, আল মানসুরির মূল শক্তি আসে 'একটি গভীর দায়িত্ববোধ' থেকে।
মরক্কোর ইতিহাসে এর আগে কোনো নারী সরকারের নেতৃত্বে আসেননি। ফলে তার এই নিয়োগ কেবল তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্যারিয়ারেই নয়, বরং এর বাইরেও এক ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করে।
উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক পদে নারীদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব নিয়ে আল মানসুরি নিজেও এর আগে কথা বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, মরক্কোর নারীরা 'সম্মান ও স্বীকৃতির যোগ্য'।
