নজিরবিহীন পদক্ষেপে অর্থনীতি উন্মুক্ত করার অনুমোদন দিল কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি
জরুরি অর্থনৈতিক প্যাকেজের অংশ হিসেবে নজিরবিহীন একগুচ্ছ মুক্তবাজার নীতির অনুমোদন দিয়েছে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি।
বৃহস্পতিবার এই প্যাকেজটি দেশটির ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে জমা দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে এটি পাস হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরিকল্পনার অধীনে ব্যক্তি খাতের ব্যবসার সুযোগ বাড়ানো হবে এবং প্রবাসী কিউবানসহ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর ফলে দেশটিতে বেসরকারি আবাসন ব্যবসার দুয়ারও খুলে যেতে পারে। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যবসাগুলোকে শেয়ার ও ইকুইটির মাধ্যমে বেসরকারি বাণিজ্যিক উদ্যোগে রূপান্তরের সুযোগ তৈরি হবে। একসময় পুরোপুরি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত থাকা কিউবার আর্থিক খাতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোরও প্রবেশাধিকার মিলবে।
কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন কিউবার জন্য এই সংস্কার প্যাকেজটিকে একটি বিশাল ও নাটকীয় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কী বলছেন প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-ক্যানেল?
বৃহস্পতিবার এক সম্প্রচারে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্দেশে ভাষণ দেন কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল। তিনি বলেন, দেশের এই ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য শুধু বাইরের চাপকে দায়ী করা চলে না।
কয়েক দশক ধরে কিউবার ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র, যা দেশটির অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিয়েছে। গত জানুয়ারি থেকে কিউবার ওপর এই মার্কিন চাপ আরও বেড়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দেশটিতে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে।
তবে দিয়াজ-ক্যানেল স্বীকার করেন যে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে কিছু অভ্যন্তরীণ কারণও দায়ী। তিনি বলেন, 'কিছু বাধা আছে যেগুলো বাইরে থেকে আসেনি বা অবরোধের কারণেও হয়নি।'
তিনি 'ধীরগতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং উৎপাদনে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের বাধা দেওয়া নিয়মকানুনের' কথা উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, 'বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত ও জরুরি পরিবর্তনের দাবি রাখে।'
বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) কিউবার ওপর চাপ বাড়িয়েছে। তারা একটি প্রস্তাব পাস করেছে, যেখানে প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-ক্যানেল এবং কিউবার সামরিক বাহিনী পরিচালিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান 'গ্রুপো দে অ্যাডমিনিসত্রাসিওন এমপ্রেসারিয়াল এসএ'-এর শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই প্রস্তাবে কিউবা সরকারের 'পদ্ধতিগত নিপীড়নের' তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে এবং দেশটিতে 'গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের' আহ্বান জানানো হয়েছে।
কমিউনিস্ট পার্টির কট্টরপন্থীদের বাধা?
১৯৬৫ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিউবা শাসন করে আসছে কমিউনিস্ট পার্টি। প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-ক্যানেল তার ভাষণে ইঙ্গিত দেন যে পার্টির ভেতরের কট্টরপন্থীদের দিক থেকে এই জরুরি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কিছুটা বিরোধিতা আসতে পারে।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, 'কিছু সংস্কারের ক্ষেত্রে হয়তো সবার পূর্ণ সম্মতি থাকবে না, কিন্তু সেগুলো আর পিছিয়ে রাখাও সম্ভব নয়।'
গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে অভিযুক্ত হওয়া কিউবার সাবেক নেতা রাউল কাস্ত্রোও এই সংস্কার পরিকল্পনার প্রতি তার সমর্থন জানিয়েছেন।
কী ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র?
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা, বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বারবার বলে আসছেন যে অর্থনৈতিক সংস্কার করলে কিউবার ওপর ওয়াশিংটনের চাপ কমানো হতে পারে। তবে কিউবার এই সর্বশেষ পদক্ষেপের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
বৃহস্পতিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—ইরান যুদ্ধ অবসানে একটি সমঝোতা স্মারকে পৌঁছানোর পর, ট্রাম্প প্রশাসন কি এবার কিউবার দিকে নজর দেবে?
উল্লেখ্য, ট্রাম্প বারবার কিউবায় সামরিক হামলা এবং 'বন্ধুত্বপূর্ণ দখলের' (ফ্রেন্ডলি টেকওভার) কথা বলে আসছেন।
ভ্যান্স এর জবাবে বলেন, ওয়াশিংটন চায় কিউবানরা 'সুখী ও সফল' হোক।
তিনি বলেন, 'কিউবা সরকার কীভাবে তাদের পথ বদলাতে পারে, তা নিয়ে আমরা বর্তমানে তাদের সঙ্গে কথা বলছি। তারা যদি সঠিক ও বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত নেয়, তবে এই দ্বীপটির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অনেক ভালো হবে।'
