ইরান চুক্তি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনে তীব্র মতভেদ, তেহরানের প্রতিশ্রুতি রক্ষা নিয়ে সন্দিহান গোয়েন্দা কর্মকর্তারা
ইরানের সঙ্গে করা সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষ প্রশাসনের অভ্যন্তরে তীব্র মতভেদ তৈরি হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংগৃহীত তথ্যের বরাতে সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, চুক্তির চূড়ান্ত শর্ত অনুযায়ী ইরান পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দিতে কতটুকু রাজি—তা নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়েছে। আলোচনা সম্পর্কে অবগত তিন কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
শুধু সিআইএ পরিচালকই নন, ট্রাম্পের শীর্ষ টিমের আরও অনেকেই এই চুক্তি নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। সূত্রের তথ্যমতে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হ্যাগসেথ গত রবিবার ঘোষিত এই সমঝোতা স্মারক নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং দুই বিশেষ মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার এই চুক্তির পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন।
রবিবারের ঘোষণার আগে ট্রাম্প এবং তার উপদেষ্টাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সংগ্রহ করা অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে আলোচনা করে। গোয়েন্দা তথ্যে দেখা গেছে, ইরানি কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে চুক্তিটি নিয়ে যেভাবে আলোচনা করছেন, তা মধ্যস্থতাকারী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দেওয়া তাদের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে একেবারেই মিলছে না।
র্যাটক্লিফ ও রুবিও জানান, এই গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তাদের চরম সন্দেহ রয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের পারমাণবিক পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছে, ইরান শেষ পর্যন্ত তা মানবে কি না। একটি সূত্র জানিয়েছে, 'গোয়েন্দা তথ্য স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের আসল উদ্দেশ্য চুক্তির অধীনে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।'
এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেকোনো বিষয়ে সব ধরনের মতামত শোনেন—তবে সবাই বোঝেন যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেবল তারই।'
তিনি আরও বলেন, 'এই সমঝোতা স্মারকটি ট্রাম্প প্রশাসনের সেইসব আপসহীন নীতি বা রেডলাইন পূরণ করে, যার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা হয়েছে যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না, তারা অতিরিক্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম
নিজেদের কাছে রাখতে পারবে না এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে জিম্মি করতে পারবে না।' ট্রাম্প কেবল একটি 'ভালো' চূড়ান্ত চুক্তিতেই সম্মত হবেন বলে ওই কর্মকর্তা যোগ করেন। এ বিষয়ে সিআইএ এবং স্টেট ডিপার্টমেন্ট কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং পেন্টাগন কোনো সাড়া দেয়নি।
রবিবার সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের পারমাণবিক শর্তগুলো মূলত আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত ও বিস্তারিত চুক্তিতে পৌঁছানোর ওপর নির্ভর করছে। পারমাণবিক চুক্তির পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনা করতে আগামী শুক্রবার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, উইটকফ এবং কুশনারের ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ-বাগের গালিবফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পাকিস্তানি ও কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে।
১৪ দফার এই প্রাথমিক চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে একটি সূত্র দাবি করেছে, ইরান এই চুক্তির মাধ্যমে দেওয়ার চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা পাচ্ছে—যদি না তারা শেষ পর্যন্ত মার্কিন উদ্দেশ্য পূরণকারী একটি পারমাণবিক চুক্তিতে সই করতে সম্মত হয়।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বর্তমান আলোচনার সময়জুড়ে ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা (স্ট্যাটাস কু) বজায় রাখবে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না এবং মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করবে না। চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হলে, ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধকালীন মোতায়েন করা সেনা প্রত্যাহার করবে এবং নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ইরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে।
তবে মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম উদ্বেগ প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যম এক্সিওস-কে বলেন, 'চুক্তিটি নিয়ে ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মার্কিন আলোচনা দলের দাবির মধ্যে অমিল দেখে আমি কিছুটা শঙ্কিত।' তিনি অবিলম্বে এই নথিটি প্রকাশের দাবি জানান।
পারমাণবিক বিষয়টি শর্তসাপেক্ষ হলেও, হরমুজ প্রণালি দ্রুত উন্মুক্ত করার কথা বলা হয়েছে এই সমঝোতায়। চুক্তি অনুযায়ী, 'ইরান তার সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য কোনো ধরনের ফি ছাড়া বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করবে।' অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে তাদের নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেবে। এছাড়া ওমান এবং পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের সহযোগিতায় এই প্রণালির ভবিষ্যৎ নৌ-পরিষেবা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পরিচালনার জন্য সংলাপ চালাবে ইরান। অবশ্য ৬০ দিন পর ট্রানজিট ফি আদায়ের ইঙ্গিত দিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
পাশাপাশি, এই চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি ছিল ইরানের আটকে থাকা বা ফ্রিজ করা তহবিল ও সম্পদ অবমুক্ত করা। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, চুক্তি পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এই তহবিল ব্যবহারের সম্পূর্ণ সুযোগ করে দেবে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এটি একটি 'কাজের ওপর ভিত্তি করে অর্থ প্রদান' (পে ফর পারফরম্যান্স) মডেল হবে। অর্থাৎ, ইরান ইতিবাচক মনোভাব দেখালে কিছু তহবিল পর্যায়ক্রমে অবমুক্ত করা হতে পারে।
চুক্তিতে আরও উল্লেখ রয়েছে যে, ইরানের 'পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের' জন্য একটি ৩০০ বিলিয়ন ডলারের যৌথ তহবিল গঠনের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা চূড়ান্ত চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে চুক্তির সমর্থকেরা যুক্তি দিচ্ছেন, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাব এবং এটি তখনই বাস্তবায়িত হবে যখন ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বন্ধ করবে এবং তাদের দেশে বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ সংস্কার নিয়ে আসবে।
