আহত হলেও আড়ালে থেকেই ইরানের রণকৌশল সাজাচ্ছেন মোজতবা খামেনি: মার্কিন গোয়েন্দাদের প্রতিবেদন
জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে ইরানের যুদ্ধ কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য থেকে এমনটিই জানা গেছে।
বর্তমানে বিভক্ত ইরানি প্রশাসনে কার হাতে কতটা ক্ষমতা রয়েছে, তা এখনো অস্পষ্ট। তবে একাধিক গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, যুদ্ধ অবসানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা কীভাবে পরিচালিত হবে, তা হয়তো নেপথ্যে থেকে ঠিক করে দিচ্ছেন খামেনিই।
যুদ্ধ শুরুর পর যে হামলায় তার বাবা ও বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক নেতা নিহত হয়েছিলেন, সেই একই হামলায় গুরুতর আহত হন মোজতবা খামেনি। এরপর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তার স্বাস্থ্য এবং ইরানের নেতৃত্বের কাঠামোতে তার ভূমিকা নিয়ে তাই নানা জল্পনা চলছে।
বাবার মৃত্যুর কয়েক দিন পর মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত মার্কিন গোয়েন্দারা তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি।
একটি সূত্র জানায়, খামেনি যোগাযোগের জন্য কোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহার করেন না। যারা তার সঙ্গে সশরীরে দেখা করেন, শুধু তাদের সঙ্গেই তিনি কথা বলেন। অথবা বার্তাবাহকের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান করেন। আর এ কারণেই তাকে নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
শরীরের এক পাশে মারাত্মক দগ্ধ হওয়াসহ মুখমণ্ডল, হাত, বুক ও পায়ে চোট পাওয়ায় তিনি এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
খামেনির স্বাস্থ্য নিয়ে ইরানের দাবি
গত শুক্রবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের প্রটোকল প্রধান মাজাহার হোসেইনি জানান, খামেনি আঘাত থেকে সেরে উঠেছেন এবং এখন সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।
তিনি আরও বলেন, 'শত্রুরা নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যা ছড়াচ্ছে। তারা তাকে দেখতে চায়, খুঁজে পেতে চায়। কিন্তু মানুষকে ধৈর্য ধরতে হবে। সময় হলেই তিনি আপনাদের সঙ্গে কথা বলবেন।'
চলতি সপ্তাহে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানান, তিনি খামেনির সঙ্গে আড়াই ঘণ্টার একটি বৈঠক করেছেন। এটিই ছিল ইরানের কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে নতুন সর্বোচ্চ নেতার প্রথম সশরীর বৈঠকের খবর।
গোয়েন্দা তথ্য কী বলছে?
মার্কিন কর্মকর্তারা খামেনির অবস্থা সম্পর্কে যা কিছু জানেন, তা মূলত তার সঙ্গে যোগাযোগ করা ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। তবে গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মধ্যে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—ইরানের ক্ষমতার বলয়ে থাকা কেউ কেউ খামেনির সঙ্গে যোগাযোগের দাবি করে আসলে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছেন কি না।
মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধে ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমেছে ঠিকই, কিন্তু পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি। সিএনএন এর আগে জানিয়েছিল, মার্কিন হামলায় ইরানের প্রায় অর্ধেক মিসাইল লঞ্চার টিকে গেছে বলে ধারণা করছে গোয়েন্দারা। তবে সম্প্রতি এই সংখ্যা বাড়িয়ে দুই-তৃতীয়াংশ করা হয়েছে। কারণ, যুদ্ধবিরতির কারণে ইরান তাদের চাপা পড়া লঞ্চারগুলো উদ্ধার করার সময় পেয়েছে।
সিআইএর আলাদা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান মার্কিন অবরোধের মধ্যেও ইরানের অর্থনীতি পুরোপুরি ধসে পড়ার আগে অন্তত আরও চার মাস টিকে থাকতে পারবে। ওয়াশিংটন পোস্ট প্রথম এই খবরটি জানিয়েছিল।
সিআইএর এই মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে এক জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, 'প্রেসিডেন্টের এই অবরোধ ইরানের বাণিজ্যে ব্যাপক ক্ষতি করছে, রাজস্ব আয় ধ্বংস করছে এবং তাদের অর্থনৈতিক পতন ত্বরান্বিত করছে। ইরানের সামরিক বাহিনী মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে, নৌবাহিনী ধ্বংস হয়েছে এবং নেতারা আত্মগোপনে আছেন।'
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি সিএনএনকে বলেন, 'অপারেশন এপিক ফিউরির বিশাল সাফল্যের পর যুক্তরাষ্ট্র যখন আরও শক্তিশালী হচ্ছে, তখন সামরিক অবরোধ এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ইরান দিন দিন দুর্বল হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতেই এখন তুরুপের তাস।' তবে তিনি গোয়েন্দা বিষয় নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নেতৃত্বের সংকট ও আলোচনা
মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে খামেনির সম্পৃক্ততার কথা বলা হলেও, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে অবগত, এমন এক সূত্র সিএনএনকে বলেন, খামেনি মূলত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে বেশ দূরেই আছেন এবং খুব কমই তার নাগাল পাওয়া যায়।
ওই সূত্র জানায়, এর ফলে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) শীর্ষ কর্মকর্তা এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফই মূলত দৈনন্দিন কাজগুলো চালাচ্ছেন।
খামেনির স্বাস্থ্য এবং বিভক্ত ইরানি প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তারা এখনো নিশ্চিত নন যে সংঘাত অবসানের জন্য চূড়ান্ত আলোচনা করার ক্ষমতা আসলে কার হাতে রয়েছে।
শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, 'তাদের ব্যবস্থা এখনো অত্যন্ত বিভক্ত এবং অকার্যকর, যা (আলোচনায়) একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।'
ট্রাম্পের দাবি ও বাস্তব চিত্র
খামেনির বাবার মৃত্যুর পর থেকেই ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, ইরানে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। তেহরানের পক্ষে যারা এখন আলোচনা করছেন, তাদের 'যুক্তিবাদী' বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্প পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, 'প্রশাসন বড় ধরনের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য তাকে (খামেনি) ব্যবহার করছে, আলোচনার কৌশলের জন্য নয়।'
তিনি আরও বলেন, 'অভ্যন্তরীণ সমালোচনার হাত থেকে বাঁচতে প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবেই মোজতবার নাম ব্যবহার করছে। যেহেতু তিনি প্রকাশ্যে নেই, তাই তার নামে মতামত প্রচার করাটা ইরানি আলোচকদের জন্য সমালোচনার হাত থেকে বাঁচার একটা ভালো ঢাল।'
গত মাসে ইসলামাবাদে প্রথম দফার আলোচনার আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স কিছু উপসাগরীয় মিত্রের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ইরানের অবশিষ্ট নেতাদের মধ্যে কার সঙ্গে আলোচনা করা সবচেয়ে ভালো হবে। তখন একটি উপসাগরীয় দেশ ভ্যান্সকে জানায়, আইআরজিসি বা রাজনৈতিক শাখার অন্য নেতাদের চেয়ে স্পিকার গালিবাফই এই আলোচনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।
ইসলামাবাদে প্রথম দফার আলোচনায় গালিবাফই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আইআরজিসির সাবেক এই কমান্ডার একসময় সংস্কারপন্থী ছাত্রদের বিক্ষোভ দমনে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি ইরানের হাতে গোনা সেই রাজনীতিকদের একজন, যিনি স্যুট পরা কূটনীতিক এবং রণক্ষেত্রের সেনাসদস্য—উভয়কেই সামলাতে পারেন।
তবে সেই প্রাথমিক আলোচনা থেকে ভ্যান্স কোনো চুক্তি ছাড়াই ফিরে আসেন এবং পরে দ্বিতীয় দফার আলোচনাও বাতিল হয়ে যায়। ট্রাম্প এর জন্য ইরানের সরকারের 'বিভক্তিকে' দায়ী করেন এবং তাদের একটি 'সমন্বিত প্রস্তাব' তৈরির সুযোগ দিতে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও দুই সপ্তাহ বাড়িয়ে দেন।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে যে যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল রয়েছে। ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং ইরান সর্বশেষ মার্কিন প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে।
