শুভেন্দু, শমীক নাকি অগ্নিমিত্রা? পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাকে বেছে নেবে বিজেপি?
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন রাজ্যের বর্তমান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের নির্বাচনী এলাকা ভবানীপুরে তাকে পরাজিত করেছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
রাজ্যের ২৯৩টি আসনের মধ্যে ২০৬টিতে জয়লাভ করে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পথে বিজেপি। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) মাত্র ৮১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে।
তবে বিজেপি নেতারা জানিয়েছেন, শুভেন্দু অধিকারী দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং সহ-সভাপতি অগ্নিমিত্রা পালের নামও বিবেচনা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। অগ্নিমিত্রা পাল সোমবার আসানসোল দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে জয়লাভ করেছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একবার নয়, বরং দুবার পরাজিত করার পুরস্কার পেতে পারেন শুভেন্দু অধিকারী। এবার ভবানীপুর আসনে তিনি ১৫,১০৫ ভোটের ব্যবধানে মমতাকে হারিয়েছেন। এর আগে ২০২১ সালের নির্বাচনেও নন্দীগ্রামে তিনি মমতাকে ১,৯৫৬ ভোটে পরাজিত করেছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পশ্চিমবঙ্গের এক জ্যেষ্ঠ বিজেপি নেতা বলেন, '২০২০ সালে তৃণমূল ছাড়ার পর থেকেই মমতার বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন শুভেন্দু।' এর প্রতিক্রিয়ায় তৃণমূল সরকার তার বিরুদ্ধে প্রায় ৩০০টি মামলা করেছিল বলেও ওই নেতা উল্লেখ করেন।
শুভেন্দু অধিকারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় বেশ কয়েকটি দপ্তরের দায়িত্ব সামলেছেন। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তিনি তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। একটি জনসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাকে দলে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
গত ২ এপ্রিল শুভেন্দু যখন কলকাতার ভবানীপুর আসন থেকে মনোনয়নপত্র জমা দেন, তখন অমিত শাহ তার সঙ্গে ছিলেন। এটি মূলত দলের শীর্ষ নেতৃত্বের তার ওপর আস্থারই বহিঃপ্রকাশ ছিল। শাহ তখন বলেছিলেন, 'গত নির্বাচনে মমতা (মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে) জিতলেও শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ব্যক্তিগতভাবে পরাজিত হয়েছিলেন। এ বছর মমতা ভবানীপুরের পাশাপাশি পুরো বাংলাতেই হারবেন।'
বিজেপির আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা উল্লেখ করেন, লোকসভা নির্বাচনের মতো বিধানসভা নির্বাচনে সাধারণত একই প্রার্থীকে দুটি আসন থেকে লড়তে দেয় না দল। কিন্তু শুভেন্দুর ক্ষেত্রে সেটি করা হয়েছিল। তার মতে, 'বিরোধী দলনেতা হিসেবে এটি শুভেন্দুর জনপ্রিয়তা ও দক্ষতার একটি বড় পরীক্ষা ছিল।'
ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারী পেয়েছেন ৭৩,৯১৭ ভোট, আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছেন ৫৮,৮১২ ভোট। অন্যদিকে, নন্দীগ্রাম আসনেও তৃণমূলের পবিত্র করকে ৯,৬৬৫ ভোটে পরাজিত করেছেন শুভেন্দু।
কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের গণনা কেন্দ্রের বাইরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'এটি একটি ঐতিহাসিক জয়... এটি হিন্দুত্বের জয়, বাংলার জয় এবং মোদিজির জয়।'
বিজেপি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে অগ্নিমিত্রা পালও রয়েছেন এবং দল যদি একজন নারী মুখ্যমন্ত্রী বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তিনি হতে পারেন আদর্শ প্রার্থী। তিনি ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত লোকসভার সাংসদ ছিলেন।
অন্যদিকে, শমীক ভট্টাচার্যের নামটিও বিবেচনায় থাকতে পারে, কারণ তার নেতৃত্বেই বিজেপি বাংলায় প্রথমবার বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। ভট্টাচার্য বর্তমানে রাজ্যসভার সদস্য।
বিজেপি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কলকাতায় নবনির্বাচিত সব বিধায়কদের নিয়ে একটি বৈঠক ডাকতে পারে। তবে মুখ্যমন্ত্রী বেছে নিতে কবে পরিষদীয় দলের বৈঠক ডাকা হবে, সে বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে এখনো স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি।
এক বিজেপি নেতা বলেন, 'আমরা আশা করছি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিষদীয় দলের বৈঠক আয়োজনের জন্য দল একজন পর্যবেক্ষকের নাম ঘোষণা করবে। সেটি হয়ে গেলে রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্তভাবে শুরু হবে।'
বিজেপি নেতারা জানান, গত দুই মাসে শুভেন্দু অধিকারী পুরো রাজ্যজুড়ে জোরালো প্রচার চালিয়েছেন। একজন বিজেপি নেতা বলেন, ২০২৫ সালে শুভেন্দু অধিকারীর প্রকাশ্য একটি ঘোষণাই বিজেপির প্রচারের মূল সুর নির্ধারণ করে দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, বিজেপির উচিত বাংলার ৭০.৫৪ শতাংশ হিন্দু ভোটারের দিকে নজর দেওয়া এবং প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোটারদের উপেক্ষা করা।
বাংলার ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে অন্তত ১২০টিতে মুসলিম ভোটাররা জয়-পরাজয় নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করেন। ২০২১ সালে বিজেপি এগুলোর মধ্যে মাত্র ৭৭টিতে জয়ী হয়েছিল। সেবার দল ৯ জন মুসলিম প্রার্থী দিলেও কেউ জিততে পারেননি।
গত বছরের জানুয়ারিতে পূর্ব মেদিনীপুরে এক জনসভায় শুভেন্দু বলেছিলেন, '২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আমরা ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েছি। এগুলো সবই হিন্দুদের ভোট। যদি আরও ১০ শতাংশ হিন্দু আমাদের ভোট দেয়, তবে আগামী বছর আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাচ্যুত করব।'
সোমবার বিজেপি মালদা, মুর্শিদাবাদ, হাওড়া, কলকাতা ও বীরভূমের মতো অনেক মুসলিম অধ্যুষিত আসনেও সহজে জয় পেয়েছে।
