যুদ্ধ গোপন রাখায় অভ্যস্ত আমেরিকা, ট্রাম্প হাঁটছেন উল্টো পথে
ইরানে আকস্মিক বিমান হামলার ৩২ দিন পর, ১ এপ্রিল জাতির উদ্দেশে হোয়াইট হাউস থেকে ভাষণ দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধ নিয়ে নতুন কোনো তথ্য না দিলেও তিনি অদ্ভুত এক ইতিহাসের পাঠ দেন।
ট্রাম্প বলেন, 'প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার অংশগ্রহণ ছিল এক বছর, সাত মাস এবং পাঁচ দিনের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলেছিল তিন বছর, আট মাস এবং ২৫ দিন। কোরীয় যুদ্ধের মেয়াদ ছিল তিন বছর, এক মাস এবং দুই দিন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলেছিল ১৯ বছর, পাঁচ মাস এবং ২৯ দিন! আর ইরাক যুদ্ধ চলেছিল আট বছর, আট মাস এবং ২৮ দিন।' তার মূল উদ্দেশ্য ছিল এটি বোঝানো যে, ৩২ দিন আসলে খুব বেশি সময় নয়।
ট্রাম্পের কথা শুনে মনে হতে পারে, যুদ্ধের একটি সুনির্দিষ্ট শুরু ও শেষ থাকে। কিন্তু গত কয়েক মাসে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করা, কিউবায় তেল অবরোধ, গ্রিনল্যান্ড দখলের আলোচনা এবং সবশেষে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এসব ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।
এগুলো প্রথাগত সংঘাতের চেয়ে বরং সোশ্যাল মিডিয়ার 'কনটেন্ট' বা উপাদানের মতোই আচরণ করছে, যা নতুন কোনো বড় খবরের নিচে চাপা পড়ে যায়।
হোয়াইট হাউসের সোশ্যাল মিডিয়া দল এটিকে রীতিমতো ব্যঙ্গাত্মক রূপ দিয়েছে। এক্সে (সাবেক টুইটার) বিমান হামলার ভিডিওর সঙ্গে সিনেমা বা গেমের ক্লিপ জুড়ে দিয়ে তারা উগ্রপন্থী গোষ্ঠী 'প্রাউড বয়েজ'-এর একটি অঘোষিত স্লোগান (যার অর্থ অনেকটা—যা কর্ম তা-ই ফল) প্রচার করেছে।
তবে আমেরিকা যখন এই 'যা করবে তা-ই ফলবে' পরিস্থিতির আসল পরিণতির মুখোমুখি হতে শুরু করে, তখন খোদ প্রেসিডেন্টের মিত্ররাই ঘাবড়ে যান। মিমের জায়গা দখল করে নেয় হরমুজ প্রণালীর মানচিত্র, আর জ্বালানির দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
ফক্স নিউজের সাবেক উপস্থাপক মেগান কেলি প্রশ্ন তোলেন, প্রেসিডেন্টকে কে এই যুদ্ধে নামতে প্ররোচিত করেছে। এরই মধ্যে যুদ্ধের জেরে পদত্যাগ করেন ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্ট।
পদত্যাগপত্রে তিনি ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দেন, প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প অন্তহীন যুদ্ধ এড়িয়ে সামরিক ক্ষমতার সফল প্রয়োগ করেছিলেন।
এবার যুক্তরাষ্ট্রকে শেষহীন সংঘাতে টেনে আনার জন্য তিনি 'ইসরায়েল এবং আমেরিকায় তাদের শক্তিশালী লবি'-কে দায়ী করেন।
কেন্ট যে 'অন্তহীন যুদ্ধ' নিয়ে আক্ষেপ করেছেন, তা পুরো একুশ শতক জুড়েই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। নাইন-ইলেভেন হামলার পর এটি এখন নীরবে মেনে নেওয়া একটি বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
সাধারণ মার্কিনিরা অন্তহীন যুদ্ধ পছন্দ না করলেও এর জোরালো বিরোধিতাও করে না। কারণ, অত্যন্ত গোপনীয়তা, পেশাদার সামরিক বাহিনী এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে এসব যুদ্ধের কোনো সরাসরি প্রভাব তাদের জীবনে পড়ে না।
২০১৬ সালের প্রচারণায় ট্রাম্প এই অন্তহীন যুদ্ধের সমালোচনা করে ফায়দা লুটেছিলেন। তবে প্রথম মেয়াদে তিনি আগের যুদ্ধগুলোর উদাসীন রক্ষক হিসেবেই কাজ করেছেন। ২০২০ সালের গ্যালাপ জরিপে দেখা যায়, খুব অল্পসংখ্যক মার্কিন ভোটারই পররাষ্ট্রনীতিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
তবে দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প এই চিত্র বদলাতে বদ্ধপরিকর।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক মাইকেল ও'হ্যানলন বলেন, '৪৫তম প্রেসিডেন্টের চেয়ে ৪৭তম প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায় সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষ।'
দূরবর্তী সংঘাত নিয়ে একসময় দোদুল্যমান ট্রাম্প এখন জেমস পক বা জেমস মনরোর সাম্রাজ্যবাদ, আইজেনহাওয়ারের দাবার চাল এবং ডোনাল্ড রামসফেল্ডের বাধাহীন বিমান যুদ্ধের রূপ ধারণ করেছেন। ১ এপ্রিলের ভাষণ থেকে স্পষ্ট যে, তিনি সহসাই পথ বদলাচ্ছেন না।
অন্তহীন যুদ্ধের উত্থান
নাইন-ইলেভেনের পর জর্জ ডব্লিউ বুশ বলেছিলেন, আমেরিকা শান্তিকামী হলেও রাগান্বিত হলে ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
তবে ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। ১৯ ও ২০ শতকের বেশির ভাগ সময় এবং গত ২৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র কোনো না কোনো যুদ্ধে জড়িত।
এমআইটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যাডাম জে. বেরিনস্কির মতে, যুদ্ধ নিয়ে সাধারণ মানুষের মতামত আসলে যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনার চেয়ে রাজনীতিকদের দলীয় কাঁদা-ছোঁড়াছুড়ির ওপর বেশি নির্ভর করে।
আর এই সুযোগে ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের পর থেকে সব প্রেসিডেন্টই তথ্য গোপন করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কংগ্রেস আর আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। সরাসরি 'যুদ্ধ কর' আরোপের বদলে ঋণ গ্রহণ ও টাকা ছাপানোর নীতি চালু হওয়ায় যুদ্ধের আসল খরচ সাধারণের অগোচরেই থেকে যায়।
রিচার্ড নিক্সন বাধ্যতামূলক সেনানিয়োগ বাতিল করে যুদ্ধের প্রাণহানিকে নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেন। এমনকি কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই যুদ্ধ পরিচালনার রেওয়াজ পরিণত হয়েছে অলিখিত নিয়মে।
কর্নেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সারাহ ক্রেপসের মতে, দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট ১৭৯৫ সালে বলেছিলেন, যুদ্ধের খরচ সাধারণ মানুষকে মেটাতে হলে সরকার যুদ্ধ নিয়ে সতর্ক থাকে।
কিন্তু সেই খরচের হিসাব এবং প্রাণহানির ঝুঁকিই যদি না থাকে? সশস্ত্র ড্রোনের যুগে এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।
নিজেদের ঝুঁকি ছাড়াই মৃত্যু ডেকে আনার সক্ষমতা যুদ্ধের নৈতিকতাকেই বদলে দিয়েছে।
ওবামা প্রশাসন যখন ড্রোনের ওপর নির্ভরশীল এক অস্পষ্ট সন্ত্রাস দমন কর্মসূচি শুরু করে, তখন মার্কিনিদের প্রাণহানি না থাকায় অনেকেই একে সমর্থন জানিয়েছিলেন।
জরিপে দেখা যায়, আফগান যুদ্ধের বিরোধিতাকারীরাও ড্রোন হামলাকে সমর্থন করেছেন, যদিও তারা জানতেন না ঠিক কোথায় এই হামলা হচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান 'প্যালান্টির'-এর প্রধান নির্বাহী আলেকজান্ডার কার্প তার ২০২৫ সালের বই 'দ্য টেকনোলজিক্যাল রিপাবলিক'-এ এই বাস্তবতার সমালোচনা করেছেন।
ওবামা আমলে তাঁর প্রতিষ্ঠানই যুদ্ধক্ষেত্রের সফটওয়্যার তৈরি করেছিল, যা এখন ইরানে হামলা চালাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। কার্পের মতে, প্রযুক্তি নির্মাতা ও রাজনৈতিক এলিটরা যুদ্ধক্ষেত্রের ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।
তিনি চান, আমেরিকা শুধু তখনই যুদ্ধ করুক, যখন দেশের সবাই সেই যুদ্ধের ঝুঁকি ও ব্যয়ের ভাগীদার হবে। তবে বাস্তবে তাঁর তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই যুদ্ধকে মানুষ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে এবং মানুষের বিচার-বিবেচনাকে মূল্যহীন করে তুলছে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের যুদ্ধংদেহী মনোভাব মূলত এই বিচ্ছিন্নতারই এক চরম রূপ।
হোয়াইট হাউসের বানানো ইরান যুদ্ধের টিকটক বা ইউটিউব ভিডিওগুলো আসলে কোনো বীরত্বের প্রতীক নয়, বরং এটি এক অভিনব প্রহসন।
এটি এমন এক দেশের গল্প, যে দেশ তার নাগরিকদের কাছে ইউটিউবে একটি 'ক্লিক' ছাড়া আর কিছুই চায় না।
যখন নাগরিকের সঙ্গে সংঘাতের বাস্তব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়, তখন দেশ ও যুদ্ধ নিয়ে যেকোনো মনগড়া গল্পই সহজে বিশ্বাস করানো যায়।
