ইরানের সাথে যুদ্ধে যেসব মার্কিন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কঠোর জবাব দিয়েছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়েছে তারা। এতে মার্কিন দূতাবাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন এবং সামরিক ঘাঁটি ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস অন্তত ১৭টি ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন স্থাপনা শনাক্ত করেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এর বেশ কয়েকটিতে একাধিকবার হামলা হয়েছে। উচ্চ-রেজ্যুলেশনের বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ছবি, যাচাই করা সামাজিক মাধ্যমের ভিডিও এবং মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের বিবৃতির ওপর ভিত্তি করে এই বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, এই তীব্র পাল্টা হামলা থেকে বোঝা যায়, ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণার চেয়েও ইরান এই যুদ্ধের জন্য অনেক বেশি প্রস্তুত ছিল।
সামরিক স্থাপনায় আঘাত
ইরান এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটিতে হাজার হাজার মিসাইল ও ড্রোন ছুড়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এর বেশিরভাগই ঠেকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। তারপরও অন্তত ১১টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বা স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা এই অঞ্চলে থাকা মোট মার্কিন স্থাপনার প্রায় অর্ধেক।
যুদ্ধের প্রথম দিন, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ইরান বেশ কয়েকটি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এর মধ্যে ছিল সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি, কুয়েতের আলী আল সালেম বিমানঘাঁটি ও ক্যাম্প বুহরিং এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি। স্যাটেলাইট ছবিতে বেশ কয়েকটি স্থানে ভবন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে।
১ মার্চের একটি ভিডিওতে কুয়েতের ক্যাম্প বুহরিংয়ে ক্রীড়া সুবিধার কাছে একটি ইরানি ড্রোনের বিস্ফোরণ দেখা যায়। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ইরানের পাল্টা হামলার মোট আর্থিক ক্ষতি অনুমান করা কঠিন। তবে পেন্টাগনের এক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে হওয়া একটি হামলায় প্রায় ২০০ মিলিয়ন (২০ কোটি) ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে কংগ্রেসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
১ মার্চ, কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরে সামরিক সদস্যদের থাকার একটি ভবনে ইরানি ড্রোন হামলায় ছয়জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হন। স্যাটেলাইট ছবিতে ওই ভবনের ছাদ আংশিক ধসে পড়তে দেখা যায়। এছাড়া সৌদি আরবে মার্কিন ঘাঁটিতে আরেকটি হামলায় আরও এক মার্কিন সেনা নিহত হন বলে পেন্টাগন জানিয়েছে। ফলে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় সাতে।
যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনের তুলনায় ইরানি হামলার গতি কিছুটা কমলেও আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। আল উদেইদ, আলী আল সালেম, আল ধাফরা বিমানঘাঁটি, ক্যাম্প বুহরিং এবং পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে একাধিকবার হামলা হয়েছে।
এমনকি ইরান থেকে ছোড়া মিসাইল তুরস্ক পর্যন্ত পৌঁছেছে। ৪ মার্চ তুরস্কের ইনসিরলিক বিমানঘাঁটির দিকে ধেয়ে আসা একটি ইরানি ব্যালিস্টিক মিসাইল ঠেকিয়ে দেয় ন্যাটো। এই ঘাঁটিতে মার্কিন বিমানবাহিনীর বড় একটি অংশ অবস্থান করছে। তবে ইরান এই মিসাইল ছোড়ার কথা অস্বীকার করেছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবার দ্বিতীয় আরেকটি ইরানি মিসাইল তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করলে ন্যাটো সেটি ভূপাতিত করে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় ক্ষতি
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দামি ক্ষতির তালিকায় রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ও মিত্রদের স্বার্থ রক্ষাকারী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো। ইরান সুপরিকল্পিতভাবে রাডার ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে, যার মধ্যে 'থাড' (THAAD) সিস্টেমের যন্ত্রাংশও রয়েছে। এই সিস্টেমটি রাডারের সাহায্যে আকাশপথে আসা হুমকি শনাক্ত ও ধ্বংস করে।
জর্ডানে মার্কিন বিমানবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটির ফেব্রুয়ারির স্যাটেলাইট ছবিতে রাডার সরঞ্জাম দেখা গিয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর দুই দিন পর তোলা ছবিতে সেখানে আকাশ প্রতিরক্ষা সেন্সর বলে মনে হওয়া একটি বস্তুর ব্যাপক ক্ষতি দেখা গেছে। সামরিক বাজেট ও চুক্তির তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের একটি রাডার ইউনিটের দাম প্রায় অর্ধ বিলিয়ন (৫০ কোটি) ডলার হতে পারে।
২৮ ফেব্রুয়ারির একটি ভিডিওতে বাহরাইনের মানামায় পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে একটি ইরানি ড্রোন আঘাত হানতে দেখা যায়। এতে একটি যোগাযোগ র্যাডোম (রাডার ও যন্ত্রপাতির সুরক্ষায় ব্যবহৃত আবরণের মতো কাঠামো) ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উপসাগরীয় দেশগুলোও মার্কিন কোম্পানি থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনে তেল শোধনাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছে বসিয়েছে। এই বিদেশি রাডার সিস্টেমগুলো মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করে। বিশ্লেষকরা একে মার্কিন সামরিক সেন্সর নেটওয়ার্কের একটি বর্ধিত অংশ বলেই মনে করেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল রুওয়াইসের মতো এমন জায়গাগুলোতেও ইরান হামলা চালিয়েছে, যেখানে সম্প্রতি আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেখা গিয়েছিল। গত বছরের স্যাটেলাইট ছবিতে সেখানে 'থাড' সিস্টেম দেখা গেলেও, হামলার পরের ছবিতে গুদামগুলোর ব্যাপক ক্ষতি দেখা গেছে। তবে হামলার সময় থাড সিস্টেমটি সেখানে ছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কাতারের উম্ম দাহালের কাছে একটি দীর্ঘ পাল্লার রাডার (AN/FPS-132) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই রাডারটি ৩ হাজার মাইল এলাকাজুড়ে আগাম সতর্কতা দিতে সক্ষম।
মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষতির পুরো মাত্রা এখনও অস্পষ্ট। তবে দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নেয়ার ইস্ট পলিসির পরিচালক মাইকেল আইজেনস্ট্যাড বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত রাডারগুলো মেরামত বা প্রতিস্থাপন করা কঠিন হবে।
অন্যদিকে, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট শেঠ জি. জোনস মনে করেন, এই ক্ষতি মার্কিন সামরিক সক্ষমতাকে খুব বেশি কমাবে না। তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য রাডার, বিমান বা মহাকাশভিত্তিক সিস্টেমের মতো অনেক বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে।'
কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলা
ইরান সামরিক নয় এমন মার্কিন স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুবাইয়ের কনস্যুলেট এবং কুয়েত সিটি ও রিয়াদের দূতাবাস। এর ফলে এগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। তবে এসব হামলায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
শনিবার রাতে বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে রকেট হামলা হয়েছে। এতে কেউ হতাহত হয়নি। এর পেছনে কারা ছিল বা কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার গত ৭ মার্চ জানিয়েছেন, যুদ্ধের প্রথম দিনের তুলনায় ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা ৯০ শতাংশ এবং ড্রোন হামলা ৮৩ শতাংশ কমেছে। তবে গতি কমলেও ইরান এই অঞ্চলজুড়ে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েই যাচ্ছে।
