খামেনির মৃত্যুর পর আলোচনায় খোমেনির নাতি হাসান
ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনি দেশটির পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছেন। ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হওয়ার পর পরবর্তী উত্তরাধিকারী কে হবেন—সেই দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নটি এখন নতুন করে সামনে চলে এসেছে।
আয়াতুল্লাহ খোমেনির ১৫ জন নাতি-নাতনির মধ্যে ৫৩ বছর বয়সী হাসান খোমেনি সবচেয়ে পরিচিত মুখ। তাকে ইরানি ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে অপেক্ষাকৃত 'মধ্যপন্থী' হিসেবে দেখা হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি ও হাসান রুহানির মতো সংস্কারপন্থীদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, যারা ক্ষমতায় থাকাকালীন পশ্চিমের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করেছিলেন।
দক্ষিণ তেহরানে তার দাদুর সমাধিসৌধের খাদেম হিসেবে হাসান খোমেনি এক প্রতীকী ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তিনি কখনও সরকারে সরাসরি কোনো পদে দায়িত্ব পালন করেননি। অনেক রাজনীতিক তাকে খামেনেইর ছেলে মোজতাবার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে ছড়িয়ে পড়া অস্থিরতার মুখে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে খামেনেইর উত্তরসূরি হিসেবে একজন মধ্যপন্থী নেতা নির্বাচনের দাবি জোরালো হয়েছে।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার প্রতি অনুগত থাকলেও হাসান খোমেনি বিভিন্ন সময়ে সংস্কারের দাবি তুলেছেন। ২০২১ সালে যখন সংস্কারপন্থী প্রার্থীদের নির্বাচনে লড়তে বাধা দেওয়া হয়, তখন তিনি 'গার্ডিয়ান কাউন্সিল'-এর তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। ওই সময় হার্ডলাইনার ইব্রাহিম রাইসির জয়ের পথ সুগম করা হয়েছিল, যিনি ২০২৪ সালে এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যান। খোমেনি তখন বলেছিলেন, "আপনারা আমার জন্য কাউকে পছন্দ করে দিয়ে আমাকে তাকে ভোট দিতে বলতে পারেন না!"
২০২২ সালে নীতি পুলিশের হেফাজতে মাহসা আমিনীর মৃত্যুর পর দেশব্যাপী বিক্ষোভ শুরু হলে তিনি এর স্বচ্ছ ও সঠিক তদন্ত দাবি করেছিলেন। তবে ব্যবস্থার প্রতি অনুগত থেকে তিনি খামেনেইর বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া বিক্ষোভকারীদের সমালোচনাও করেন। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারির অস্থিরতার সময় তিনি একে 'দাঙ্গা' আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, দাঙ্গাকারীরা ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করছে।
খামেনির মৃত্যুতে এক শোকবার্তায় খোমেনি তাকে 'ইরানি জনগণ ও মুসলিম বিশ্বের চিরস্থায়ী বীর' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, "ইরানের মহৎ জনগণ এই ঘটনা কাটিয়ে আবারও ইমামের (খোমেনি) পথে হাঁটবে।"
২০১৫ সালে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খোমেনির এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাকে সংগীত, নারীর অধিকার ও সামাজিক স্বাধীনতার প্রশ্নে একজন 'প্রগতিশীল ধর্মতাত্ত্বিক' হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এবং ইসলামি চিন্তাধারার পাশাপাশি পশ্চিমা দর্শনেও আগ্রহী।
হাসান খোমেনির স্ত্রী সায়্যিদা ফাতিমা একজন আয়াতুল্লাহর কন্যা এবং তাদের চার সন্তান রয়েছে। ২০১২ সালে সংস্কারপন্থীরা তাকে প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার অনুরোধ করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে তার সমর্থন ছিল। এছাড়া বছরের পর বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানি জনগণের যে অর্থনৈতিক দুর্দশা হয়েছে, তা নিয়ে তিনি বারবার সোচ্চার হয়েছেন।
এক দশক আগে হাসান খোমেনি 'অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস' বা বিশেষজ্ঞ পরিষদের নির্বাচনে লড়তে চেয়েছিলেন, যে পরিষদটি মূলত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করে। শুরুতে খামেনির সমর্থন পেলেও পরে তাকে গার্ডিয়ান কাউন্সিল অযোগ্য ঘোষণা করে। ধর্মীয় যোগ্যতার ঘাটতির কথা বলা হলেও অনেকে মনে করেন, সংস্কারপন্থী শিবিরের প্রভাব ঠেকাতেই তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
২০০৮ সালে তিনি পরোক্ষভাবে ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী 'আইআরজিসি'-এর সমালোচনা করে বলেছিলেন যে, সামরিক বাহিনীর রাজনীতি থেকে দূরে থাকা উচিত। তবে গত বছর ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের সময় তিনি খামেনেইর নেতৃত্বের প্রশংসা করে চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রকে ইসরায়েলের জন্য 'দুঃস্বপ্ন' বলে অভিহিত করেন। খোমেনি ইসরায়েলকে 'ক্যানসার টিউমার' এবং পশ্চিম সমর্থিত 'শয়তান জায়নবাদী শাসন' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে খোমেনি আরবি ও ইংরেজি ভাষায় সাবলীল। ২১ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি একজন উৎসাহী ফুটবলার ছিলেন, তবে পরবর্তীতে দাদুর ইচ্ছায় তিনি ফুটবল ছেড়ে কোম শহরে ধর্মতত্ত্ব পড়তে যান।
