‘আমি কখনো ভাবিনি এটা আমার সাথে ঘটতে পারে': নিজের নিপীড়নমূলক সম্পর্ক নিয়ে ফাতিমা ভুট্টো
ফাতিমা ভুট্টোকে যদি তার নিজের মতো ছেড়ে দেওয়া হতো, তবে তার হৃদয়বিদারক স্মৃতিকথাটি সম্ভবত তার কুকুর 'কোকো'কে নিয়েই লেখা হতো। তিনি হেসে বলেন, 'আমি জানি, শুনতে এটা পাগলামি মনে হতে পারে।' কারণ একজন লেখক, সাংবাদিক, কর্মী এবং পাকিস্তানের বিখ্যাত রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে ফাতিমা ভুট্টোকে যারা চেনেন, কুকুরপ্রেমিক হিসেবে তাদের কাছে এই পরিচয় বেমানান। কিন্তু মহামারির সময় তিনি যখন তার ভেতরের সৃজনশীল জট খুলতে শুরু করেন, তখন দেখলেন তিনি শুধু কোকোকে নিয়েই লিখতে পারছেন। তার এজেন্ট বিনয়ের সঙ্গে পরামর্শ দিলেন, স্মৃতিকথার জন্য আরও কিছু দরকার। দ্বিতীয় খসড়া তৈরি হলো, কিন্তু সেটিও বাদ দিলেন তিনি।
তিনি বলেন, 'আমি ভাবলাম, যদি আমি শুধু সত্যিটা বলি? ব্যস, এরপর লেখাটা যেন গড়িয়ে পড়ল—তাড়াহুড়ো করে নয়, বরং নিজে থেকেই বেরিয়ে এল।' মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে ফাতিমা তার খসড়াটি নতুন করে সাজালেন। আর এর মধ্য দিয়েই তিনি তার জীবনের এক ভয়ঙ্কর অধ্যায় প্রকাশ করে দিলেন, যা তিনি এতদিন সবার কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন।
ফলাফল হলো 'দ্য আওয়ার অফ দ্য উলফ' বইটি। এটি একটি অপমানজনক, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সম্পর্কের এক গল্প। সেই সময় ফাতিমা বিশ্বাস করতেন, এটাই বুঝি প্রেম। তিনি যাকে কেবল 'দ্য ম্যান' বলে উল্লেখ করেছেন, তাকে নিয়ে তিনি লিখেছেন—'আমার দেখা অন্য যেকোনো মানুষের চেয়ে সে আলাদা: বাঁধনহারা, নিজের সম্পর্কে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী... সুদর্শন, রুক্ষ, পুরনো ধাঁচের পুরুষালি... এক মুক্ত আত্মা।' সেই মানুষটি কীভাবে তাকে বোঝালেন যে তার সামান্য দয়া ও মাঝে মাঝে রোমাঞ্চকর কাজগুলোই আসল প্রেম, বইটি সেই বেদনাদায়ক উপলব্ধি তুলে ধরেছে।
তাদের দেখা হয়েছিল ২০১১ সালে নিউ ইয়র্কে। ফাতিমা তখন তার পারিবারিক স্মৃতিকথা 'সংস অফ ব্লাড অ্যান্ড সোর্ড' নিয়ে সফরে ছিলেন। এই বইটি ভুট্টো রাজবংশকে নতুন করে মূল্যায়ন করায় পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন ফেলেছিল। ফাতিমা তার বাবার মৃত্যুর জন্য খালা বেনজিরকে আংশিকভাবে দায়ী করেছিলেন।
ফাতিমা 'দ্য ম্যান'-এর সঙ্গে দূর-দূরান্তের একটি সম্পর্কে জড়ান। ১১ বছর ধরে তারা মাসে একবার দেখা করতেন। সাংবাদিকতার অ্যাসাইনমেন্ট বা সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি প্রায়ই ভ্রমণ করতেন। তাই এই সম্পর্ক তার জন্য সুবিধাজনক ছিল। তিনি উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখতেন। একবার 'উইমেনস প্রাইজ ফর ফিকশন'-এর জন্য মনোনীতও হন।
কিন্তু এর কোনো কিছুই 'দ্য ম্যান'-এর আগ্রহের বিষয় ছিল না। সে হয়ে উঠল নিয়ন্ত্রণকামী। তার অন্ধকার দিকটি ছিল রাগে ভরা। সে ফাতিমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করত, তারপর নীরবতা ও অবজ্ঞা দেখাত। ফাতিমার বর্ণনা অনুযায়ী, সে কোনো কারণ ছাড়াই উজ্জ্বল থেকে ভয়ংকর হয়ে উঠত। সে ফাতিমাকে তার বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এই স্মৃতিকথাটি সংক্ষিপ্ত হলেও একটি বিস্ময়কর বিবরণ। এতে শান্ত ও মৃদু গদ্য ব্যবহার করা হয়েছে, যা ফাতিমার সেই নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতাকে আরও বেশি মর্মান্তিক করে তুলেছে। বইয়ে কুকুর কোকো এখনো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জুড়ে আছে। কিন্তু বইটি আসলে একটি জরুরি বার্তা দেয়—'শক্তিশালী', সফল, প্রশংসিত ও প্রচণ্ড বুদ্ধিমান হওয়া সত্ত্বেও কোনো নারী নিয়ন্ত্রক পুরুষের মানসিক সহিংসতার শিকার হওয়া থেকে মুক্ত নয়। এই গুণগুলোর কোনোটিই কোনো নারীকে এই মানসিক আঘাত থেকে সুরক্ষা দিতে পারে না।
তিনি এই সম্পর্ক নিয়ে লেখা সম্পর্কে বলেন, 'আসলে আমি এটা করতে চাইনি। কারণ আমি লজ্জিত বোধ করছিলাম, বিব্রত ছিলাম। আমার ভেতর এই ধরনের অনুভূতি কাজ করছিল। তবে আমি এটাও জানি, আমি যদি এমন কিছু পড়তাম, তবে তা আমাকে সাহায্য করত।'
এই বইটি নিয়ে ফাতিমা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে কথা বলছেন। সম্পর্কটির ইতি ঘটে ২০২১ সালে। এত বছর ধরে তিনি সংসার গড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করছিলেন, এমনকি স্পেনে গিয়ে সন্তান ধারণের সক্ষমতা সংরক্ষণের চেষ্টাও করেছিলেন। এরপর ৩৯ বছর বয়সে ফাতিমা শেষমেশ বুঝতে পারলেন, 'দ্য ম্যান' তাকে কখনোই তার কাঙ্ক্ষিত জীবন দেবে না। তিনি তাকে ছেড়ে আসেন। এরপর ২০২২ সালে তিনি স্বামী গ্রাহামের সঙ্গে পরিচিত হন এবং তিন বছরের মধ্যে দুই সন্তানের জন্ম দেন।
তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া বান্ধবী আলেগ্রার চেলসীর বাড়িতে এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়। সেখানে ফাতিমার স্বামী, তাদের দুই ছেলে মীর ও কাস্পিয়ান এবং একজন আয়া উপস্থিত ছিলেন। আয়া তখন তাদের পার্কের জন্য পোশাক, জুতো আর স্ট্রলার গোছাতে ব্যস্ত।
পরিবারটি মূলত দেশের বাইরেই থাকে। তবে নিরাপত্তার কারণে তিনি নির্দিষ্ট করে বলতে চান না, তারা কোথায় থাকেন। 'দ্য ম্যান'-এর সবচেয়ে জঘন্য আচরণগুলো তিনি কীভাবে সহ্য করলেন—সরাসরি এমন প্রশ্ন করায় ফাতিমা বলেন, 'আমার বিষাক্ত অভ্যাস হলো আমি মনে করি আমি যেকোনো কিছু পার করতে পারি।' ফাতিমা শুধু একা সহ্যই করেননি, তিনি মনে করেন 'দ্য ম্যান' তাকে অন্যদের সামনে ছোট করে মজা পেত। রেস্তোরাঁ, দোকান বা ছুটিতে—সর্বত্র তাকে অপমান করত। (একটা ইলেকট্রনিক্সের দোকানে তাদের মধ্যে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা দেখে মনে হয়েছিল সম্পর্ক এবার শেষ হবে। কিন্তু তা হয়নি, আরও কয়েক বছর চলেছিল।)
তিনি বলেন, 'আমার মানসিক চাপ বা অস্বস্তি সহ্য করার ক্ষমতা খুব বেশি। তাই এতদিন আমি নিজেকে বুঝিয়েছি এটা তেমনই একটা বিষয়।' এই সম্পর্কে ভালো মুহূর্তগুলো থাকলেও ফাতিমা কীভাবে নিজের অনুভূতিগুলোকে বিকৃত করেছেন বা তার আচরণকে যৌক্তিক প্রমাণ করেছেন, তা ভাবলে কষ্ট হয়। তিনি প্রায় কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন, '১১ বছর এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায় হলো এটাকে ভালোবাসার গল্প মনে করা। আর নিজেকে বোঝানো যে এটা তোমাকে আরও কঠিন করে তুলছে, তোমার জন্য বড় সফলতা অপেক্ষা করছে। আমি নিজেকে এভাবেই বলতাম। আর আমি কাউকে কিছু বলিনি, তাই কেউ আমাকে ঘুরে জিজ্ঞেসও করেনি: তুমি এসব কী বলছ?'
ফাতিমা সবসময়ই তার ব্যক্তিগত জীবন আড়াল করে রেখেছেন। তাই তার এই বিবরণ আরও বেশি কঠিন ও স্পর্শকাতর। তবে এত বন্ধু থাকা সত্ত্বেও তিনি কাউকে তার প্রেমিক সম্পর্কে বলেননি, এমনকি তাদের সম্পর্কের কথা তো দূরের কথা—এটি মানা কঠিন। এর কারণ, 'দ্য ম্যান'-এর তৈরি করা ভালোবাসার প্রকৃতি। সে দাবি করত তাদের সম্পর্কটা গোপন থাকবে। বন্ধুদের বা পরিবারের সঙ্গে দেখা করা, একই শহরে থাকা, এমনকি একই বাড়িতে থাকা—এসব 'স্বাভাবিক' আচরণ তারা করবে না।
তিনি বলেন, 'আমি সারা জীবন এমন নারীদের গল্প পড়েছি বা দেখেছি, যাদের পুরুষরা বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ফেলেছে। কিন্তু আমি নিজেকে তাদের একজন মনে করিনি, কারণ এটি শারীরিক সহিংসতা ছিল না, বুঝলেন?' (যদিও বইয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, একবার সে তার আঙুল এমন জোরে কামড়ে ধরেছিল যে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।) তিনি বলেন, 'তাই আমি ভাবতাম এটা আমার সঙ্গে কখনোই হতে পারে না। যখন ঘটনাটা ঘটেই চলেছে, তবুও আমি সেটা মেলাতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম, এটা খুব সহজ উদাহরণ। হয়তো কেউ একজন শক্তিশালী নারীকে ভাঙতে চাইছে?' ফাতিমার মুখে তখনো প্রশান্তি, তবে তাতে তিক্ততা মেশানো। তিনি বলেন, 'আমার বয়স তখন এত কম ছিল না যে এটাকে ভুল বলে ক্ষমা করে দেওয়া যায়।'
স্বাবলম্বী হয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো, ক্যারিয়ার গড়ার সময়—তার কোনো অংশ কি কখনো ভেবেছিল, এই সম্পর্কই তার প্রাপ্য ছিল?
দৃঢ় আত্মবিশ্বাস এবং তার সঙ্গে যা ঘটেছিল, তার সমন্বয় করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, আমার কোনো অংশই এমনটা ভাবেনি। বরং উল্টোটা। আমি তাকে বলতাম, আমার বাবা যদি অন্যরকম হতেন, তবে তুমি আমাকে নষ্ট করে দিতে পারতে। যদি আমার বাবা না থাকতেন, বা নিষ্ঠুর হতেন, কিংবা আমাকে বলতেন না যে আমি বুদ্ধিমান বা শক্তিশালী, তবে তুমি আমার ক্ষতি করতে পারতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আমাকে ভাঙতে পারেনি।'
ফাতিমার বাবা মুর্তজা ভুট্টো ছিলেন জুলফিকার আলি ভুট্টোর বড় ছেলে। জুলফিকার আলি ভুট্টো ছিলেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রতিষ্ঠাতা এবং সত্তরের দশকে দেশের প্রধানমন্ত্রী। ভুট্টোর পরিবারের গল্প বহুলাংশে পাকিস্তানেরই ইতিহাস। তাদের পারিবারিক ইতিহাস দেশের ইতিহাস। আর বিশাল নজরদারি ও সহিংসতার মধ্যেই ফাতিমার পুরো জীবন কেটেছে।
তিনি বলেন, 'বড় হওয়ার সময় আমার মধ্যে যে ভয় ছিল, তা এই সম্পর্কের মধ্যে খুব সুন্দরভাবে মিশে গিয়েছিল। গোপন রাখার সেই প্রয়োজন? আমি সেটা বুঝতাম, কারণ আমাকে সেভাবেই বাঁচতে হয়েছে, এমনকি এখনো।' ভুট্টো পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে নিরাপত্তার দিকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভবত এ কারণেই ফাতিমা সবসময় এমন অনিশ্চিত জীবনযাপন করেছেন।
তিনি মনে করেন, তার বাবা তাকে বলতেন ব্যাগ গুছিয়ে নিতে, আর মুহূর্তের নোটিশে তারা 'দুঃসাহসিক অভিযানে' বেরিয়ে যেতেন। ছোটবেলায় তিনি ফোনে বেশি কথা বলতেন। তখন বাবা তাকে বলতেন—বাড়িতে যারা ফোন করে, তাদের সঙ্গে কথা না বলতে। তারা কোথায় আছে, সেই তথ্য যেন ফাঁস না হয়। তিনি বলেন, 'আমি আমার বাবাকে ভালোবাসতাম কারণ তিনি আমাকে ভালোবাসতেন। তিনি বিষয়টা মজার করে তুলতেন। কিন্তু তবুও আপনি বুঝতেন যে কোথাও একটা ঝামেলা আছে।'
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল পারিবারিক জীবনের মূল অংশ। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বিপদ। তিনি বলেন, 'আমার পরিবারের বড়রা আমাদের কাছ থেকে কিছু লুকাতেন না। তারা কখনো বলেননি, "তোমরা ঘর থেকে যাও, আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।" তারা এভাবেই কথা বলতেন।'
তিনি বলেন, 'আমার খুব খারাপ লাগত যখন বাবা বলতেন, "তুমি জানো, যখন তারা আমাকে মেরে ফেলবে…"। ছোটবেলায় পারিবারিক মধ্যাহ্নভোজে যখন তারা এমন স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেন, আমি খুব মন খারাপ করতাম। তিনি কখনোই এসব নিয়ে—ওহ না, আমি দুঃখিত সোনা, আমি ওটা বলতে চাইনি—এমন কিছু করতেন না। পরিস্থিতি এমনই ছিল।'
ফাতিমা ও তার বাবা ১৯৯৩ সালে করাচিতে ফিরে আসেন। ততদিনে তার খালা বেনজির পিপিপির নেতৃত্ব নিয়েছেন এবং ৩৫ বছর বয়সে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন (১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সাল)। ভাই মুর্তজার সঙ্গে তার তিক্ত বিবাদ থাকা সত্ত্বেও বেনজির ১৯৯৩ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন। মুর্তজা জনসমক্ষে তার বোন ও ভগ্নিপতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দুর্নীতির অভিযোগ করেন এবং পিপিপির একটি আলাদা দল গঠন করেন। তিন বছর পর, পারিবারিক বাড়ির বাইরে পুলিশের গুলিতে মুর্তজা মারা যান। তখন ফাতিমার বয়স ১৪।
ফাতিমা সৎ মা ঘিনওয়া এবং ছোট ভাই জুলফিকার জুনিয়রের সঙ্গে একা হয়ে পড়েন। নিরাপত্তার জন্য তারা কিছুদিন গোপনে সিরিয়ায় ছিলেন। তিনি বলেন, 'তারা আমাদের কাছ থেকে কোনো কিছু লুকাতেন না। তারা বলতেন, "আমরা তোমাকে মধ্যরাতে ফ্লাইটে দামেস্কে পাঠাচ্ছি। কাউকে বলবে না যে তুমি যাচ্ছো। হ্যাঁ, কাল বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনাটা ঠিক রাখো, যেন সন্দেহ না হয়। কিন্তু মধ্যরাতের আগেই তোমাকে চলে যেতে হবে।" আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, "কেন আমাদের দামেস্কে যেতে হবে?" তারা বলেছিলেন, "আমরা জানি না, এরপর তারা হয়তো শিশুদের মারতে চাইবে।"' ফাতিমা এই সব স্মৃতি খুব স্বাভাবিকভাবে বলেছেন। তিনি বলেন, 'তারা উদ্দেশ্য করে করুন বা না করুন, আমাদের মানসিকভাবে আঘাত করেছিল।'
২০০৭ সালে বেনজির নির্বাচনী প্রচারণার সময় খুন হন। ফাতিমার চেহারায় তার খালার ছাপ স্পষ্ট। তাদের সম্পর্ক জটিল ছিল, বিশেষ করে বাবার মৃত্যুর কারণে। তবে আজও ভুট্টো পরিবারের প্রভাব পাকিস্তানে দেখা যায়। বেনজিরের স্বামী আসিফ আলি জারদারি দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে আছেন এবং ছেলে বিলাওয়ালকে নিয়ে পিপিপির সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফাতিমা এখনো রাজনীতিসচেতন। তিনি বলেন, 'রাজনীতি আমাকে ক্ষমতার প্রতি আকৃষ্ট না করে বরং ক্ষমতা থেকে দূরে থাকতে শিখিয়েছে। ক্ষমতার বিপদ সম্পর্কে আমি খুব ভালো জানি। আমি এত বোকা নই যে ভাবব—আমি রাজনীতিতে গেলে হয়তো অন্যরকম হতাম। আমি জানি কেউ অন্যরকম হয় না।'
পরিবারের ঐতিহ্য অনুসরণ করার প্রশ্নটি অনেক আগেই তার জীবন থেকে সরে গেছে। তবে মানুষের জন্য ভালো কিছু করার তাড়না এখনো তার মধ্যে আছে।
তিনি বলেন, 'মাঝেমধ্যে বিশ্বের পরিস্থিতি দেখে আমার খুব রাগ হয়। তখন মনে হয়, হয়তো আরও বেশি যুক্ত হওয়ার একটা দায়িত্ব আছে। কারণ বাইরে থেকে বা লেখালেখি করে হয়তো কিছু করা যায় না। কিন্তু রাজনীতিতে যাওয়ার কোনো আকর্ষণ আমার নেই। আমি কখনোই ভাবি না, নিজের যতটুকু ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আছে, তা বিসর্জন দিই।'
গত দুই বছর ধরে ফাতিমার লেখালেখি ও সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট দেখলে বোঝা যায়, তিনি গাজার পরিস্থিতি নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন। ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো বর্বরতার কথা তিনি তুলে ধরছেন। দুটি গর্ভাবস্থায়ও তিনি এই কাজ চালিয়ে গেছেন। এর ফলস্বরূপ গত অক্টোবরে তার সম্পাদনায় গাজা নিয়ে প্রবন্ধের একটি সংকলন 'গাজা: দ্য স্টোরি অফ আ জেনোসাইড' প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি বলেন, 'আমার যখন প্রসব ব্যথা হচ্ছিল, আমি হাসপাতালে ছিলাম। আমি অ্যানেস্থেশিয়া পেয়েছিলাম, ডাক্তাররা ছিলেন, আমার ওপর বোমা পড়ছিল না। আমি জানতাম আমি সেখানে নিরাপদে আছি।'
এত অল্প সময়ে তিনি এত কিছু সামলেছেন, তবুও তিনি কীভাবে নিজেকে স্থির রেখেছেন? তিনি বলেন, 'আপনাকে হয়তো এমন এক জগতে থাকতে হবে, যেখানে এসব কিছুই ঘটছে না। ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধ নথিভুক্ত করা থেকে শুরু করে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষত খুঁড়ে বের করা—সবকিছুই তিনি করছেন কোলের শিশু, স্বামী আর কুকুর নিয়ে।'
ফাতিমা বলেন, 'আমি নিজেকে আগে সংবেদনশীল মনে করতাম, কিন্তু অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন করে ক্ষতবিক্ষত করেছে।'
