বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র নির্মাতাদের রাজস্ব ৬৭৯ বিলিয়ন ডলার, ইতিহাসে সর্বোচ্চ: সিপ্রি প্রতিবেদন
বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র প্রস্তুতকারী ও প্রতিরক্ষা–সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত আয় গত বছর প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে শীর্ষস্থানীয় একটি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষণ সংস্থা।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৪ সালে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ প্রতিরক্ষা কোম্পানির মোট রাজস্ব দাঁড়ায় ৬৭৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩ সালের তুলনায় এটি বাস্তবভিত্তিতে ৫.৯ শতাংশ বেশি।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
রাশিয়ার ২০২২ সালের শুরুতে ইউক্রেন আগ্রাসন এবং ২০২৩ সালের শেষভাগে শুরু হওয়া ইসরায়েল–গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গত কয়েক বছরে বহু দেশ—বিশেষ করে ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রগুলো—প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্রুত বাড়িয়েছে।
এ বছর প্রকাশিত সিপ্রির আরেক রিপোর্ট অনুযায়ী, মস্কো ২০২৪ সালে জিডিপির ৭ শতাংশেরও বেশি সামরিক খাতে ব্যয় করেছে। চীন তার বিশাল সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়নে গভীরভাবে বিনিয়োগ করছে। উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান অস্ত্র কর্মসূচি ঘিরে উদ্বেগের কারণে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানসহ ন্যাটো–ঘনিষ্ঠ দেশগুলোও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সিপ্রির বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৫ থেকে ২০২৪—এই এক দশকে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর অস্ত্র রাজস্ব ২৬ শতাংশ বেড়েছে।
সুইডেনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলোর বিক্রি বাড়াতেই মোট রাজস্বের এই উল্লম্ফন। ইউরোপের অধিকাংশ দেশই ন্যাটোর সদস্য।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি ন্যাটো সদস্য দেশগুলো প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা জিডিপির ৩.৫ শতাংশ 'কোর' প্রতিরক্ষা সক্ষমতায়—যেমন আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ে ব্যয় করবে। আরও ১.৫ শতাংশ ব্যয় করা হবে যুদ্ধকালীন প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো শক্তিশালীকরণে।
ন্যাটো সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, রাশিয়া আগামী কয়েক মাস থেকে কয়েক বছরের মধ্যে ন্যাটোর কোনো সদস্য রাষ্ট্রে সশস্ত্র আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি নিতে পারে। দীর্ঘ দশক ধরে ইউরোপ ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করেছে, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ওয়াশিংটন এখন ইউরোপ থেকে মনোযোগ সরিয়ে ইন্দো–প্যাসিফিকে জোর দেবে এবং ইউরোপকে নিজেদের পুনরায় সশস্ত্র হতে হবে।
ইউরোপীয় ও মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো ইউক্রেনকে দেওয়া কামান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও গোলাবারুদের মজুত পূরণ এবং নতুন চাহিদা মোকাবিলায় তীব্র চাপের মুখে পড়েছে।
সিপ্রি বলছে, ইউরোপের শীর্ষ ১০০ তালিকাভুক্ত অস্ত্র কোম্পানির কমপক্ষে ৬৫ শতাংশ ২০২৪ সালে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ৩৯টি কোম্পানির রাজস্ব ৩.৮ শতাংশ বেড়ে ৩৩৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে—যা শীর্ষ ১০০ কোম্পানির মোট বৈশ্বিক আয়ের প্রায় অর্ধেক।
বিশ্বের শীর্ষ চার অস্ত্র নির্মাতা—লকহিড মার্টিন, আরটিএক্স, নর্থরপ গ্রুম্যান এবং জেনারেল ডায়নামিকস—সবকটিই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক। ২০২৪ সালে এই চার কোম্পানির রাজস্ব অনেকটা বেড়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র প্রস্তুতকারী লকহিড মার্টিন এফ-৩৫ পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমানের প্রধান ঠিকাদার বা সরবরাহকারী। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া পশ্চিমা সামরিক বাহিনীগুলোর জন্য পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের একমাত্র কার্যকর বিকল্প এটি। সিপ্রি জানায়, ২০২৪ সালে লকহিড মার্টিনের ৩.২ শতাংশ রাজস্ব বৃদ্ধির একটি কারণ হলো ১১০টি এফ-৩৫ বিমান সরবরাহ, যেগুলোর সরবরাহ আগের বছর বিলম্বিত হয়েছিল।
গবেষকেরা বলেন, "বিশ্বব্যাপী সামরিক আধুনিকায়ন প্রকল্পগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিলম্ব ও অতিরিক্ত ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এ প্রবণতা বিশেষভাবে প্রকট।"
ইউরোপের ২৬টি দেশের অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, যেগুলো শীর্ষ ১০০ এর তালিকায় রয়েছে, তাদের সম্মিলিত রাজস্ব ১৩ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিএই সিস্টেমস গত বছর বিশ্বের চতুর্থ–বৃহত্তম অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ছিল।
ইতালিয়ান নির্মাতা লিওনার্দো সিপ্রির শীর্ষ ১০০–তে দ্বিতীয় বৃহত্তম ইউরোপীয় কোম্পানি, যার রাজস্ব ২০২৪ সালে ১০ শতাংশ বেড়েছে। লিওনার্দো, বিএই সিস্টেমস এবং জাপানের মিতসুবিশি যৌথভাবে ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান উন্নয়নে কাজ করছে।
গবেষকেরা জানায়, চেক প্রজাতন্ত্রের চেকোস্লোভাক গ্রুপ এবং ইলন মাস্কের স্পেসএক্স—এই দুই কোম্পানি ২০২৪ সালে রাজস্ব দ্বিগুণেরও বেশি করেছে।
২০২৪ সালের শুরুতে চেক সরকার ইউক্রেনের জন্য কামান গোলাবারুদ সংগ্রহ ও দানের একটি উদ্যোগ চালু করে। সিপ্রি জানায়, গত বছর চেকোস্লোভাক গ্রুপের মোট আয়ের অর্ধেকেরও বেশি ইউক্রেন–সংশ্লিষ্ট অর্ডার থেকে এসেছে।
এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদকরা ছিল ব্যতিক্রম। ওশেনিয়া ও এশিয়ার ২৩টি কোম্পানির মোট রাজস্ব ১.২ শতাংশ কমেছে—মূলত চীনের প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর বিক্রি হ্রাস এবং দেশটির সামরিক বাহিনীতে দুর্নীতির অভিযোগের বিরুদ্ধে সরকারের ব্যবস্থা নেওয়াকে এই প্রভাবের কারণ হিসেবে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
রাশিয়ার দুটি কোম্পানির পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের মোট রাজস্ব ২৩ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩১.২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক নয়টি কোম্পানি শীর্ষ ১০০–তে রয়েছে। গবেষকেরা জানান, যেগুলোর নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে—সেই আট কোম্পানির রাজস্ব ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১৪ শতাংশ বেড়েছে।
শীর্ষ ১০০–তে থাকা তিনটি ইসরায়েলি কোম্পানির রাজস্ব গত বছর ১৬ শতাংশ বেড়েছে—গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের প্রতি আন্তর্জাতিক চাহিদা বৃদ্ধির কারণে, সিপ্রি জানায়।
বিশ্লেষকেরা যা বলছেন
সিপ্রির গবেষক জেড গুইবার্তো রিকার্ড বলেন, "ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে নতুন উৎপাদন সক্ষমতায় বিনিয়োগ করছে। তবে কাঁচামাল সংগ্রহ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ওপর নির্ভরতা ইউরোপের পুনরায় সশস্ত্র হওয়ার পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলতে পারে।"
সিপ্রির জ্যেষ্ঠ গবেষক দিয়েগো লোপেস দা সিলভা বলেন, "নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি রুশ প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতির মুখে পড়েছে। এটি উৎপাদন ধীর করতে পারে এবং উদ্ভাবন সীমিত করতে পারে।"
