যুদ্ধাবস্থার অবনতি, খারাপ পরিণতি ছাড়া জেলেনস্কির আর কোনো পথ খোলা আছে!
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর অতিবাহিত হয়েছে বছর-দুয়েকের বেশি সময়। এরমধ্যে রাশিয়ার বিমান হামলার সংখ্যা বেড়েছে, এবং সম্মুখভাগের কিছু জায়গায় ধীরে ধীরে সামনে এগোতে শুরু করেছে রুশ বাহিনী। যুদ্ধ অবসানের কোনো লক্ষণ তো দেখাই যাচ্ছে না। এই অবস্থায়, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদমির জেলেনস্কির সামনে পরবর্তী করণীয়– বা যুদ্ধ জয়ের উদ্যোগ নেওয়ার উপায়গুলো ক্রমেই কমে আসছে। সামনে অবশিষ্ট উপায়ও দিন দিন আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে।
জেলেনস্কি বলেছেন, ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়া যেসব ভূমি নিয়ন্ত্রণ করছে, সেগুলোসহ চলমান যুদ্ধে দখলীকৃত সকল ভূমি মুক্ত করতে চান তিনি। কিন্তু, গত বছরে তাঁর বাহিনী যুদ্ধের ময়দানে তেমন পরিবর্তন আনতে পারেনি। ইউক্রেনের দক্ষিণ ও পূর্বের যে বিপুল অঞ্চল রাশিয়ার দখলে– যা দেশটির মোট ভূমির প্রায় ২০ শতাংশ – রাশিয়ার দখলমুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে কিয়েভের সেনারা। আর তা মুক্ত করার সম্ভাবনাও দিনকে দিন অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
ইউক্রেনের ভূমিতে দখলদার রুশ সেনা থাকা অবস্থায় পুতিনের সাথে যুদ্ধ অবসানের আলোচনায় বসবেন না জেলেনস্কি, এমন পণই তিনি করেছেন। রাজনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টি চরম বিরোধপূর্ণ ও শত্রুতার বিষবাস্প ভরা। কারণ ইউক্রেনের বেশিরভাগ মানুষ রাশিয়ার কাছে নিজ দেশের ভূখণ্ড সমর্পণ করতে রাজি নয়। অন্যদিকে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চাইছেন, কিয়েভ তাঁর সমস্ত শর্ত মেনে রণেভঙ্গ দিক। এর বিন্দুমাত্র হেরফের হলেও যে তিনি মেনে নিবেন – এমন কোনো ইঙ্গিত দেননি।
পরিস্থিতি নেহাত শোচণীয়। লড়াইয়ের গতি স্থিতাবস্থায় চল আসলেও– প্রতিনিয়ত অনেক ইউক্রেনীয় সেনা মারা পড়ছে। এরমধ্যে যুদ্ধবিরতির চিন্তাও করছে না কিয়েভ। কারণ ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন, এতে রাশিয়া তাঁর বাহিনী পুনর্গঠনের বাড়তি সময় ও সুযোগ পাবে।
ইউক্রেনীয় ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা মনে করছেন, নিরুপায় দশায় আটকা পড়েছেন জেলেনস্কি। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান দলের আইনপ্রণেতারা গত কয়েক মাস ধরে ইউক্রেনের জন্য সামরিক সহায়তার প্রস্তাব পাস আটকে রেখেছেন। তার আগে অবশ্য ইউক্রেনকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান পাঠানোর প্রস্তাব পাস হয়েছিল– এই বছরের শেষদিকে অল্প কিছুসংখ্যক এফ-১৬ যুদ্ধে যোগও দেবে। কিন্তু এই বিমান যুদ্ধের মোড় বদলে দেওয়ার মতো প্রভাব ফেলতে পারবে না। ন্যাটো মিত্র অন্যান্য দেশও সামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে সংযম প্রদর্শন করছে। ঠিক একারণেই সম্প্রতি ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রয়োজনে ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর বিষয়টিও ইউরোপীয় দেশগুলোকে বিবেচনা করতে হবে। সম্ভাব্য সব উপায়েই তাদের ইউক্রেনের পাশে থাকতে হবে বলেও উক্তি করেন মাখোঁ।
এতে স্পষ্ট হয়– যুদ্ধের শোচনীয় মুহূর্তেই মিত্রদের সহায়তা লাভে পিছিয়ে পড়েছে ইউক্রেন। দেশটির একজন আইনপ্রণেতার মতে, 'জেলেনস্কি কীভাবে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠবেন?– আমি জানি না। অবশ্যই এটা নিয়ে আমি নিজেও উদ্বিগ্ন।'
জেলেনস্কি যে ইঁদুর কলে আটকা পড়েছেন– তা থেকে মুক্তির পথ নিয়ে ইউক্রেনসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের বেশ কয়েকজন কূটনীতিক ও আইনপ্রণেতার সাথে আলাপ করে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদক। বিষয়টি স্পর্শকাতর রাজনৈতিক প্রসঙ্গ হওয়ায় নাম না প্রকাশের শর্তেই কথা বলেন তাঁরা।
কিয়েভে নিযুক্ত একজন পশ্চিমা কূটনীতিক বলেছেন, নিজ দেশবাসীর প্রত্যাশার ব্যবস্থাপনা করাটাই হবে জেলেনস্কির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জনগণের মধ্যে তাঁর উচ্চ সমর্থন রয়েছে, কিন্তু টানা দুই বছরের যুদ্ধ ও অগুনিত হতাহতের ঘটনায় এই 'সংহতিতে ফাটল ধরছে'।
ইউক্রেনের সাবেক একজন মন্ত্রী এবং কিয়েভ স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক টিমোফি মাইলোভানভ মনে করেন, লড়াই আরো অনেক বছর চলতে পারে। তিনি বলেন, "এটা খুবই অস্বস্তিকর একটা চিন্তা, তবে কিছু লোক যখন বলে– দশক দশক ধরে চলবে, তখন কেউ তা চ্যালেঞ্জ করে না।"
যুদ্ধ না বাধলে এই বছরেই হওয়ার কথা ছিল ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তবে সামরিক আইনে দেশ পরিচালিত হচ্ছে, আর সামরিক আইনের অধীনে নির্বাচন করার অনুমতি দেয় না ইউক্রেনের সংবিধান। এই অবস্থায়, জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়তে থাকলে– অনির্বাচিত জেলেনস্কিকে রাশিয়া একজন অবৈধ শাসক হিসেবে উপস্থাপন করবে। এইক্ষেত্রে পুতিনের টানা ক্ষমতায় থাকার স্ববিরোধী দৃষ্টান্ত থাকলেও– রাশিয়ান প্রোপাগান্ডা জেলেনস্কিকে অবৈধ বলে প্রচারের জন্য সবকিছুই করবে। এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেন ইউক্রেনের কিছু কর্মকর্তা।
তাঁদের মতে, জেলেনস্কি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন– মাঝেমধ্যেই যা তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন– সেগুলো এখন তাঁকে পূরণ করতে হবে। এসব প্রতিশ্রুতির মধ্যে আছে– অধিকৃত ক্রিমিয়াসহ ইউক্রেনের ১৯৯১ সালের সীমানা পুনরুদ্ধার। প্রসঙ্গত, ১০ বছর আগে ক্রিমিয়া উপদ্বীপের দখল নেয় রাশিয়া।
ইউক্রেনের ওই আইনপ্রণেতা বলেন, "বুদ্ধিমান মানুষ মাত্রই জানেন- এটি বাস্তবসম্মত নয়। তাই একটা পর্যায়ে এসে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তাঁদের বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্যে লাগাম টানতে হবে, বা তাতে বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য আনতে হবে।"
লড়াইয়ে ইচ্ছেমতো উদ্যোগ নেওয়ার সুবিধা যার হাতে থাকে– তাঁর দিকেই ঝোঁকে যুদ্ধের পাল্লা। যেটা এখন রুশ বাহিনী পাচ্ছে, যার অন্যতম প্রধান কারণ গোলাবারুদ ও সেনা সংখ্যার স্বল্পতায় ভুগছে ইউক্রেন।
অস্ত্র ও গোলাবারুদের জন্য ইউক্রেন পশ্চিমা অংশীদারদের মুখাপেক্ষী। ৬ হাজার কোটি ডলারের একটি সামরিক সহায়তার প্রস্তাব গত ছয় মাস ধরে আটকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে। রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা এই প্রস্তাব পাসে রাজি নন। অস্ত্রের পাশাপাশি জনবল সংকটও এক বিরাট সমস্যা। দুই বছরের বেশি সময়কার যুদ্ধে ইউক্রেনের সক্ষম যুবকদের অনেকে নিহত হয়েছে, নাহয় ভর্তি এড়াতে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এই অবস্থায়, নতুন করে সেনাভর্তি নিয়ে বিভাজিত হয়ে পড়েছে ইউক্রেনীয় সমাজ।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে সহায়তা আসা বন্ধ হয়ে যাবে– এই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেবে বলেই মনে করছে কিয়েভ। চরম এই আঘাত আসারই ক্ষণ গণনা চলছে। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন বলেছেন, আগামী সপ্তাহে এই নিরাপত্তা প্যাকেজের বিলটি উত্থাপিত হতে পারে, তবে এটিতে বড় সংশোধনী আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে অনুমোদিত সহায়তার অঙ্ক কমতে পারে, বা এ সহায়তা প্যাকেজটি ইউক্রেনকে ঋণ হিসেবে দেওয়া হতে পারে। যুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে এরমধ্যেই আকন্ঠ দেনাগ্রস্ত ইউক্রেনের জন্য এমন ঋণ শুধু দেনার বোঝাই বাড়াবে।
প্রস্তাবটি যদি অচিরেই পাস হয়, তবু এটি একটি বার্তাই দেবে, আর তা হলো– ভবিষ্যতে এমন সহায়তা লাভের নিশ্চয়তা আর থাকছে না। বিশেষত যখন আসছে নভেম্বরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।
যুক্তরাষ্ট্র যদি ঘরোয়া রাজনীতির চাপে সহায়তা বন্ধ করে দেয়– তাহলে ওই শূন্যতা পূরণ করবে কে! ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের অবর্তমানে বিপুল হারে গোলাবারুদ ও অস্ত্র প্রস্তুত করে তা ইউক্রেনকে দেওয়ার মতো উৎপাদন সক্ষমতা হয়তো নেই ইউরোপীয় দেশগুলোর। অথচ প্রতিমাসে লাখ লাখ কামানের গোলা ও শত শত বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন ইউক্রেনের।
জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেন স্থানীয়ভাবে অস্ত্র উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো– নিজস্ব চাহিদার সামান্যতম অংশই এভাবে পূরণ করতে পারছে। বর্তমানে রণাঙ্গনে ইউক্রেনীয়দের চেয়ে অন্তত ছয়গুণ বেশি কামানের গোলা ছুঁড়ছে রুশ বাহিনী।
ইউক্রেনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, "প্রায় ছয় মাস হলে আমাদের কাছে যথেষ্ট গোলাবারুদ নেই। কিন্তু এই সংকট আরো বাজে রূপ নেবে। তাহলে এবার কী? আর কোন উপায় আছে? আমাদের মিত্ররা যদি প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরেও গোলাবারুদ না দেয়– তাহলে অবশ্যই পরিস্থিতি আরো বিষম রূপ নেবে। কিন্তু, একইসঙ্গে বিশ্বের সামনে আমেরিকার ভাবমূর্তিও চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হবে।"
পশ্চিমা মিত্রদের পাঠানো আধুনিক ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান নিয়ে– এক বছর আগে ইউক্রেন যখন পাল্টা-আক্রমণ অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল– তখন কিয়েভে আশাবাদ ছিল তুঙ্গে। কিন্তু, সেই আক্রমণ সফল হয়নি, ভূমি মাইন, ড্রোন ও ট্যাংক-বিধ্বংসী মিসাইলের সামনে পশ্চিমা ট্যাংক যুদ্ধে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারেনি।
প্রচলিত যুদ্ধে নাকাল হয়ে এখন রাশিয়ার ভেতরের সামরিক অবকাঠামো ও তেলের ডিপোর মতো লজিস্টিকসের ওপর আঘাত হানছে ইউক্রেন। তবুও ফ্রন্টলাইনে প্রচণ্ড চাপের মধ্যেই আছে কিয়েভের বাহিনী। সাম্প্রতিক সময়ে বেশকিছু স্থান থেকে তাঁদের পিছু হটতে হয়েছে।
২০১৪ সালে রাশিয়ার সমর্থনে পূর্ব ইউক্রেনে বিদ্রোহী তৎপরতা শুরুর পর থেকেই এক দীর্ঘ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ইউক্রেনীয়রা। অনেক সেনাই তখন থেকে লড়ছে। তবে অভিজ্ঞ সেনাদের অধিকাংশই চলমান যুদ্ধে মারা পড়েছে।
পশ্চিমা একটি দেশের রাষ্ট্রদূত বলেন, "আরেকটি আক্রমণ অভিযান পরিচালনার শক্তি নেই ইউক্রেনের। এ অবস্থায় দুই ধরনের দৃশ্যপটের অবতারণা হতে পারে। এর একটি হচ্ছে, তাঁরা মিত্রদের সহায়তা পেয়ে প্রতিরোধ সারি রক্ষা করতে পারবে। আর অন্যটা হলো– যথেষ্ট সমর্থন না থাকার সত্ত্বেও ইউক্রেন মরিয়া হয়ে ও আরো কম জনবল নিয়ে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করবে।"
ওই রাষ্ট্রদূত মনে করেন, (মিত্রপক্ষের) যথেষ্ট সমর্থন ছাড়াই যদি এই বছরজুড়ে ইউক্রেনকে রুশ বাহিনীর মোকাবিলা করতে হয়, তাহলে তার বিপুল সেনা যেমন হতাহত হবে, তেমনি অনেক এলাকাও হাতছাড়া হবে। ফলে ইউক্রেন চরম অসুবিধাজনক অবস্থায় চলে যাবে।
তিনি আরো বলেন, ২০২৫ সালকে আরেকটি যুদ্ধের বছর হিসেবে ধরে নিতে হবে ইউক্রেন ও তাঁর মিত্রদের। "পশ্চিমারা যদি শান্তি চায়– তাহলে তাদের শুধু ইউক্রেনের বর্তমান চাহিদা পূরণ করাই নয়– বরং ২০২৫ সালে কিয়েভ যেন আক্রমণ অভিযানের জন্য প্রস্তত হতে পারে এবং বিপুল ভূমি দখলমুক্ত করতে পারে– সেজন্য দরকারি সব ধরনের সাজসরঞ্জাম এখন থেকেই দিতে হবে।"
তবে কিছু ঘাটতি ইউক্রেনকেই পূরণ করতে হবে, যেমন জনবল। ইউক্রেনের মাঠপর্যায়ের সেনা অফিসাররা সম্মুখভাগে কম সেনা থাকার অভিযোগ করছেন। বিশেষত, পদাতিক সেনার স্বল্পতা রয়েছে। এই অবস্থায়, সামরিক কর্মকর্তারা বড় আকারের সেনাভর্তি কার্যক্রমের দাবি তুললেও– সেটা আদৌ সম্ভব কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জেলেনস্কি। মস্কো আরো ৩ লাখ নতুন সেনা সমাবেশের উদ্যোগ নিচ্ছে জেনেও জেলেনস্কি এই বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দিতে বাধ্যই হয়েছেন।
তবে সম্প্রতি একটি আইনে সই করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট, যার আওতায় সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক ভর্তির বয়স কমিয়ে ২৫ বছর করা হয়েছে। তবে ইউক্রেনের সাবেক সেনাপ্রধান যেভাবে পাঁচ লাখ নতুন সেনাভর্তির দাবি করেছিলেন– ততোটা না করার কথাই সাফ জানিয়ে দেন জেলেনস্কি।
ইউক্রেনের নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল ওলেক্সান্ডার সিরস্কি বলেছেন, ব্যক্তিগত এক সমীক্ষার পর এই পাঁচ লাখের সংখ্যা থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। বাধ্যতামূলক ভর্তির আওতা বাড়াতে ইউক্রেনের পার্লামেন্টে একটি আইনের খসড়াও পাস হয়েছে, তবে জনগণের সমালোচনার মুখে এটিতে পরে অনেক সংশোধনী আনা হয়।
কিয়েভে অবস্থানরত আরেক পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, বাধ্যতামূলক সেনাভর্তি নিয়ে 'রাজনৈতিক পিংপং খেলছে' জেলেনস্কি প্রশাসন ও ইউক্রেনের পার্লামেন্ট, কারণ এমন উদ্যোগ অজনপ্রিয়। যুদ্ধের শুরুতে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী সেনাবাহিনীতে নাম লেখালেও– এখন খুব কম মানুষই যুদ্ধে যেতে চান।
তিনি মন্তব্য করেন, "এই পর্যায়ে এসে কেউ আর এই দায়ভার (বাধ্যতামূলক বিপুল সেনাভর্তির) নিজের কাঁধে নিতে চায় না। তবে এটা করতেই হবে। এটা ফেলে রাখার মতো বিষয়ও নয়, যে যতদিন ইচ্ছে দেরী করা যাবে। সম্মুখভাগের অনেক সেনা ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। তাঁদের অনেকেই বলছেন টানা লড়াই চালিয়ে যাওয়া আর তাঁদের পক্ষে সম্ভব না। দিনকয়েকের ছুটি কাটাতে যখন তাঁরা আসে, তখন বহু তরুণকে দেখতে পায়– যারা এখনও যুদ্ধে যোগ দেয়নি। অথচ তাঁদেরও ফ্রন্টলাইনে থাকা উচিত ছিল। এই দৃশ্য তাঁদের পীড়া দেয়। ফলে অনেক সেনা বীতশ্রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই ক্ষোভ থেকে সামাজিক উত্তেজনাও ছড়াচ্ছে।"
বৃহৎ পরিসরের সেনাভর্তির উদ্যোগ নিলে অর্থনৈতিক প্রতিকূলতাও দেখা দেবে। প্রথমত বৈদেশিক সহায়তা থেকে সরাসরি সৈন্যদের বেতন দেওয়া সম্ভব না, পাশাপাশি কর্মী সংকটেও রয়েছে অনেক শিল্প। রাশিয়ার একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এরমধ্যেই ধবংস হয়েছে ইউক্রনের অনেক জ্বালানি অবকাঠামো ও কলকারখানা, তারমধ্যে নতুন করে কর্মী সংকট হবে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা' এর শামিল।
এই অবস্থায়, কতদিন যুদ্ধে টিকতে পারবে ইউক্রেন? ইউক্রেনের ওই আইনপ্রণেতা বলেন, আরো ১০ বছর এই অচলাবস্থা টানতে পারবে না তাঁর দেশ। যদিও অন্যরা মনে করেন, এর চেয়েও দীর্ঘসময় লড়াই চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
অর্থনীতির অধ্যাপক মাইলোভানভ বলেন, "ভূমির দখল কেউ ছাড়তে চায় না। কিন্তু, ইউক্রেনের মানুষ বুঝতে পারছে, হৃতভূমি পুনরুদ্ধারে দীর্ঘসময় লাগবে। সেটা ঠিক কেমন? এনিয়ে মতভেদ আছে ইউক্রেনীয়দের মধ্যে। সেটা কী দীর্ঘযুদ্ধের শেষে রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিজয়? বা যুদ্ধ অব্যাহত রাখলে হঠাৎ রাশিয়ার শাসনক্ষমতায় পরিবর্তন হবে? নাকি আরেকটি সফল পাল্টা-আক্রমণ করা হবে? কৌশল যাই হোক– সেগুলো অর্জনের জন্য ইউক্রেনের বর্তমান যে সামর্থ্য তার চেয়েও বড় ধরনের (বৈদেশিক) সমর্থনের দরকার হবে।
ইউক্রেনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, "সবাই চায় দ্রুত সমাধান। কিন্তু, সবাইকেই বুঝতে হবে, এক্ষেত্রে দ্রুত কোনো সমাধানের আশা আর নেই।"
অনুবাদ: নূর মাজিদ
