শুধু মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কি বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব?
নিরাপদে ইলিশের প্রজনন ও ডিম ছাড়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত নদ-নদীতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ, ক্রয়-বিক্রয়, মজুত ও পরিবহন নিষিদ্ধ করেছে সরকার।
উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে মেঘনা নদী ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে জেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর, নৌপুলিশ ও কোস্ট গার্ড।
সরকার দুই দশক ধরে ২২ দিনের এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে আসছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ২২ দিন কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইলিশের জীবনচক্রে।
ইলিশের প্রজনন ও জীবনচক্র নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন সাবেক মৎস্য কর্মকর্তা ও লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা সুনীল চন্দ্র ঘোষ।
তিনি বলেন, 'ইলিশ ডিম ছাড়ার জন্য সমুদ্র থেকে মিঠাপানির নদীতে আসে। পূর্ণবয়স্ক ইলিশ প্রজননের উদ্দেশ্যে নদীর উজানে ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিতে পারে।'
ইলিশের প্রধান প্রজনন ঋতু অক্টোবর থেকে নভেম্বর, তবে সারা বছরই কিছু পরিমাণে প্রজনন ঘটে। ফেব্রুয়ারি-মার্চ এবং জুলাই-আগস্টে ইলিশের গৌণ প্রজনন মৌসুম দেখা যায়।
সুনীল চন্দ্র ঘোষ বলেন, 'নিষিক্ত ডিম থেকে প্রায় ২২ থেকে ২৬ ঘণ্টার মধ্যে ইলিশের লার্ভা বের হয়। পরে ধীরে ধীরে তা কিশোর ইলিশে পরিণত হয়। এ সময় নদীর ভাটির দিকে, সাধারণত ঈষৎ লবণাক্ত পানিতে, তারা খাদ্য গ্রহণ করে বেড়ে ওঠে। প্রায় পাঁচ থেকে ছয় মাসে ইলিশ উপ-প্রাপ্তবয়স্ক বা জাটকা পর্যায়ে পৌঁছায়। এ সময় জাটকা নদী ও উপনদী ছেড়ে সমুদ্রের পানিতে চলে যায়। সেখানে প্রায় এক বছর থাকার পর প্রজননের জন্য আবার নদীতে ফিরে আসে।'
উৎপাদন কমছে
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত 'ইলিশ গবেষণা: অর্জিত সাফল্য, জাটকা সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ করণীয়' শীর্ষক কর্মশালায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জানিয়েছিলেন, বিশ্বে উৎপাদিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়।
তবে মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের উৎপাদন কমছে।
২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন ছিল ৫.৬৫ লাখ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে ৫.৬৭ লাখ টনে দাঁড়ায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন আরও বেড়ে ৫.৭১ লাখ টনে পৌঁছায়। এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৫.২৯ লাখ টনে নেমে আসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে এসেছে বলে মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
গবেষকরা ইলিশের প্রজনন ও আহরণের ক্ষেত্রে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, নদীর স্রোত, গভীরতা, বন্যা, খাদ্য সরবরাহ এবং পানির গুণমানকে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে পলি জমা ও বালুচরের কারণে গভীরতা কমে গেছে। অন্যদিকে শিল্পবর্জ্য পানিকে দূষিত করেছে এবং পানির তাপমাত্রা বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাতও অস্বাভাবিকভাবে কম হয়েছে।
ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্লাহ সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, শুধু ইলিশ নয়, সব প্রজাতির মাছের আহরণই হ্রাস পাচ্ছে। তার ভাষ্যমতে, অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে মাছের মজুত কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোহনার গভীরতা কমে যাওয়ায় ইলিশের পরিযান ব্যাহত হচ্ছে। যেখানে অবাধ চলাচলের জন্য ৩০ ফুট পানির গভীরতা প্রয়োজন, সেখানে ভাটার সময় অনেক মোহনার গভীরতা ৮-৯ ফুটে নেমে আসে। ইলিশের জীবনচক্র সমুদ্র ও নদী—দুই পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সমুদ্রের পাশাপাশি নদীর পরিবেশও সুস্থ রাখা জরুরি।
দাম হাতের নাগালের বাইরে
উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে বাজারেও।
লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন ঘাটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে ২৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি ১ হাজার টাকার বেশি এবং ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
লক্ষ্মীপুরের চর রমনী মোহন এলাকার মেঘনাপাড়ের কৃষক মো. আলম হোসেন বলেন, 'গত দুই বছরে কখনো এক কেজি ইলিশ কিনে খেতে পারিনি। অথচ আমার বাড়ির সামনেই ইলিশ ধরা হয়। দাম বেশি হওয়ার কারণেই ইলিশ কেনা হয় না।'
ইলিশের এমন চড়া দাম শুধু ভোক্তাদেরই ভোগাচ্ছে না, জীবিকার জন্য এই মাছের ওপর নির্ভরশীল জেলেদেরও কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলছে।
ইলিশ আহরণ ও এর সঙ্গে যুক্ত ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ৩০ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জীবিকা নির্ভরশীল বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
একসময় রপ্তানিকারক, এখন আমদানিকারক
বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে ভারতে ইলিশ রপ্তানি করে আসছে, বিশেষ করে দুর্গাপূজার সময়। তবে অন্যান্য মাছের মতো ইলিশ রপ্তানি নিয়মিত বা অবাধ নয়। সরকার বিশেষ অনুমতি দিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ ইলিশ রপ্তানির সুযোগ দেয়।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ২১১ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ হাজার ৩৭৬ টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৬৪ টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৩২ টন ইলিশ ভারতে রপ্তানি করেছে।
দেশে ইলিশের উৎপাদন কমার সঙ্গে সঙ্গে ভারতে রপ্তানির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তবে এ বছর চিত্রটি উল্টো। ২০ জুলাই থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে প্রায় ৫৫৩ টন ইলিশ বাংলাদেশে এসেছে।
দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় বাজারে ইলিশ সরবরাহ করে আসা একটি দেশের এখন ভারত থেকেই এই মাছ কিনতে হওয়া বাংলাদেশের ইলিশ উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
ভারতীয় কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (আইসিএআর) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আমদানি করা ইলিশের উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে গুজরাটের ভরুচ অঞ্চল থেকে। কিছু চালান এসেছে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া পাইকারি বাজারের মাধ্যমেও।
আইসিএআর-সিআইএফআরআইয়ের গবেষণায় পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীর মোহনা ও সুন্দরবনকেও ইলিশের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ও মৎস্য আহরণের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের ইলিশ মূলত একই প্রজাতির মাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম 'টেনুয়ালোসা ইলিশা' (Tenualosa ilisha)।
তবে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে একই প্রজাতির মাছের স্বাদ ও চেহারায় পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
নদী, মোহনা ও সমুদ্রের পার্থক্যের পাশাপাশি পানির লবণাক্ততা, খাদ্য, স্রোত, প্রজননক্ষেত্র ও সামগ্রিক জলজ পরিবেশের ভিন্নতা মাছের শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও স্বাদে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্বে ইলিশের প্রজাতি কয়টি?
ইলিশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় মাছ। এ মাছের সবচেয়ে বড় বিচরণক্ষেত্র বঙ্গোপসাগর।
গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ইনফরমেশন ফ্যাসিলিটি (জিবিআইএফ)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ইলিশের পাঁচটি প্রজাতি পাওয়া যায়। এর মধ্যে তিনটি বাংলাদেশে রয়েছে। প্রজাতিগুলো হলো— 'টেনুয়ালোসা ইলিশা' (Tenualosa ilisha), 'টেনুয়ালোসা টোলি' (Tenualosa toli) এবং 'হিলসা কিলি' (Hilsa kelee)।
এর মধ্যে পদ্মা-মেঘনা নদীব্যবস্থার 'টেনুয়ালোসা ইলিশা' সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমারসহ বেশ কয়েকটি দেশে সামুদ্রিক, লোনা ও মিঠাপানির পরিবেশে এ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়।
'টোলি শ্যাড' বা চন্দনা ইলিশ নামে পরিচিত 'টেনুয়ালোসা টোলি' ভারতের গুজরাট, পশ্চিমবঙ্গ ও ওডিশার উপকূলীয় জলসীমায় পাওয়া যায়। এ ছাড়া মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের উপকূলেও এ প্রজাতির মাছ রয়েছে।
'কিলি শ্যাড' বা গুর্তা ইলিশ নামে পরিচিত 'হিলসা কিলি'-এর বিস্তৃতি বঙ্গোপসাগর থেকে ইন্দো-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত।
অন্য দুটি প্রজাতি 'লং-টেইলড ইলিশ' নামে পরিচিত 'টেনুয়ালোসা ম্যাক্রুরা' (Tenualosa macrura) এবং 'টেনুয়ালোসা প্রিমভিসি' (Tenualosa primvisci)। এ দুটি প্রজাতি চীন ও পূর্ব এশিয়ার উপকূলীয় জলসীমায় পাওয়া যায়।
লক্ষ্মীপুরের সাবেক মৎস্য কর্মকর্তা আবদুল কুদ্দুস বলেন, বাংলাদেশের নদ-নদী, মোহনা ও সামুদ্রিক জলরাশি ইলিশের স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাঙালি সংস্কৃতিতে ইলিশ
বাংলাদেশে ইলিশ জাতীয় মাছ হিসেবে স্বীকৃত। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য মাছ ইলিশ।
বাংলাদেশ ও ভারতের বাঙালি সমাজে ইলিশের মর্যাদা প্রায় প্রতীকের মতো। পয়লা বৈশাখ, দুর্গাপূজা, সরস্বতীপূজা, জামাইষষ্ঠী, বিয়ে ও অন্যান্য শুভ অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যগতভাবে ইলিশ পরিবেশন করা হয়।
সরষে ইলিশ, ভাপা ইলিশ, ইলিশ পোলাও, ইলিশ পাতুরি, ইলিশ ভাজা ও পান্তা-ইলিশের মতো পদ বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে।
২০১৭ সালে বাংলাদেশের ইলিশ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়।
বাংলাদেশের ইলিশের ভবিষ্যৎ কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা ইলিশ সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে শুধু এ পদক্ষেপকে সমস্যার একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা যায় না।
ইলিশ রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে প্রজনন মৌসুমে পূর্ণবয়স্ক ইলিশের সুরক্ষা, জাটকা আহরণ বন্ধ, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার ঠেকাতে বিধিনিষেধ কার্যকর করা, নদীর গভীরতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, নদীদূষণ কমানো এবং জেলে সম্প্রদায়ের জন্য জীবিকার টেকসই বিকল্প নিশ্চিত করা।
শেষ পর্যন্ত ইলিশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কোনো একটি উদ্যোগের ওপর নয়; বরং এই মাছের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সহায়ক নদ-নদী, মোহনা ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সমন্বিতভাবে রক্ষা করা যায় কি না তার ওপর।
