শহরে যেভাবে সহজ হচ্ছে পোষা প্রাণী পালন
নাহিয়ান যখন প্রথমবার 'জেরি' নামের একটি বিড়াল পোষার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার পরিবারের কেউ এতে রাজি ছিলেন না। প্রাণীদের জায়গা তো ঘরের বাইরে, তাদের কেন ঘরের ভেতর রাখতে হবে! তাদের খাওয়ানো, ডাক্তারের কাছে নেওয়া, টাকা খরচ করা—এসব বিষয় তখনো বাংলাদেশের অনেক পরিবারের কাছে পশ্চিমা বিলাসিতা বা স্রেফ অবাস্তব একটা বিষয় মনে হতো। হাতে গোনা কয়েকটি ধনী পরিবার ছাড়া কেউ বিড়াল পুষত না।
জেরিকে আনার পর নাহিয়ানের মা সবচেয়ে বেশি আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, শেষ পর্যন্ত তিনিই জেরির সবচেয়ে বেশি যত্ন নিতে শুরু করেন। তবে একদিন জেরি বাইরে চলে যায় এবং আর কখনোই ফিরে আসেনি।
নাহিয়ান পরে 'টুকু' নামের আরেকটি বিড়াল আনেন। এখন তার পরিবার বিড়াল পোষায় এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে বিড়ালের খাবার, টিকা, পশুচিকিৎসকের কাছে যাওয়া কিংবা বিড়ালের নিরাপত্তার জন্য জানালায় নেট লাগানো—এসব এখন তাদের জীবনেরই অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাহিয়ান বলেন, 'কখনো আমি নিজের টাকা খরচ করি, কখনো কাজিনের কাছ থেকে ধার নিই, আবার কখনো বাবা-মা সাহায্য করেন। কিন্তু দিন শেষে যখন বাড়ি ফিরি এবং টুকু যেভাবে আমাকে স্বাগত জানায়, তার আদুরে আচরণ দেখি—তখন মনে হয় ওর জন্য এইটুকু খরচ বা মানিয়ে নেওয়া কিছুই না।'
গত কয়েক বছরে এ খাতে নীরবেই একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন দোকানের 'পেট ফুড' বা পোষা প্রাণীর খাবারের কর্নার, পাড়ায় পাড়ায় গড়ে ওঠা পশুচিকিৎসাকেন্দ্র বা ভেটেরিনারি ক্লিনিক এবং তরুণদের মাসিক বাজেটে পোষা প্রাণীর জন্য রাখা বরাদ্দ দেখলেই এই পরিবর্তনের আঁচ পাওয়া যায়। তারা এখন পোষা প্রাণীদের পরিবারের সদস্যের মতোই ভালোবাসেন।
এসিআই লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল সালেকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত তিন বছরে বাংলাদেশে পোষা প্রাণী পালনকারীর সংখ্যা ১৭০ শতাংশ বেড়েছে, যার মধ্যে ৯০ শতাংশই বিড়াল। কয়েক বছর আগেও যে বাজারের তেমন কোনো অস্তিত্ব ছিল না, সেটি এখন দেশের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ভোক্তা খাতের একটিতে পরিণত হয়েছে।
পশুচিকিৎসক সাবরিনা আক্তার চৌধুরী এই পরিবর্তন খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তার ক্লিনিকে কারা আসছেন এবং তারা তাদের পোষা প্রাণী নিয়ে কীভাবে কথা বলছেন, তা দেখলেই তিনি বিষয়টি বুঝতে পারেন।
সাবরিনা বলেন, 'সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের দেশে, বিশেষ করে শহরগুলোতে ভেটেরিনারি ক্লিনিক অনেক বেড়েছে। আগে মূলত সরকারি হাসপাতাল এবং হাতে গোনা কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিক ছিল। এখন বেসরকারি ক্লিনিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।'
একটি বেসরকারি ক্লিনিক খুলতে একজন নিবন্ধিত পশুচিকিৎসক এবং একটি জায়গার প্রয়োজন হয়, সরকারি কোনো ছাড়পত্রের দরকার হয় না। চাহিদা বাড়ায় এটি এখন একটি লাভজনক খাতে পরিণত হয়েছে।
সালেকের গবেষণা অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২২৫টির বেশি ভেট ক্লিনিক রয়েছে, যার বেশির ভাগই বেসরকারি এবং সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত। বিশেষ করে ঢাকায়, যেখানে আগে একজন পশুচিকিৎসক খুঁজে পেতে অনেক দূর যেতে হতো, সেখানে এখন মালিকেরা নিজেদের বাসার আশেপাশেই ক্লিনিকের সুবিধা পাচ্ছেন।
পোষা প্রাণী পোষার এই আকস্মিক বৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে বলে মনে করেন সাবরিনা। তিনি বলেন, 'এর মধ্যে অন্যতম একটি কারণ হলো—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ড। সম্প্রতি বিড়াল পোষা একটা "কুল" ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ তাদের বিড়ালের আদুরে ছবি বা সুন্দর ভিডিও পোস্ট করে, যা দেখে অন্যরাও পোষা প্রাণী রাখতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।'
তবে এটি কেবলই কোনো ট্রেন্ড বা হুজুগ নয়। সাবরিনা বলেন, 'মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং একাকিত্বও এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'পোষা প্রাণীর মাধ্যমে মানুষ তাদের একাকিত্ব পূরণের চেষ্টা করে। প্রাণীদের সঙ্গে তারা এক ধরনের মানসিক সংযোগ স্থাপন করে।'
২০২০ ও ২০২১ সালে কোভিড-১৯ মহামারির লকডাউনের সময় মানুষ ঘরের ভেতর বন্দী হয়ে পড়েছিল। সামাজিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল এবং তরুণ অনেকেই, বিশেষ করে যারা একা বা ছোট অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন, তারা একাকিত্বে ভুগেছেন। ওই সময় অনেকের কাছেই বিড়াল পোষা কোনো শখ ছিল না, বরং এটি ছিল মানসিক শূন্যতা পূরণের একটি উপায়।
সাবরিনা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা উল্লেখ করেন—তা হলো প্রাণী অধিকার সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি।
তিনি বলেন, 'মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা হারিয়ে যাওয়া বিড়ালছানা, আহত কুকুর বা রাস্তার প্রাণীদের খাওয়ানো নিয়ে পোস্ট করে। এগুলো সবই এই পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে।'
পশুরাও যে যত্ন পাওয়ার যোগ্য—এই সচেতনতা এখন বেশ বাড়ছে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই সংক্রান্ত পোস্টগুলো ব্যাপক সাড়া ফেলছে এবং মানুষের অনুভূতিকে গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে।
অ্যাপার্টমেন্টের সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি। এখানকার অ্যাপার্টমেন্টগুলো সাধারণত ছোট এবং পরিবারগুলো গাদাগাদি করে বাস করে। কুকুর পোষার জন্য জায়গা, বাইরে ঘোরার সুযোগ এবং শারীরিক পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়, যা ছয়তলার একটি ফ্ল্যাটে দেওয়া সম্ভব নয়।
কিন্তু বিড়ালের জন্য এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। সালেকের গবেষণা অনুযায়ী, ছোট জায়গায় রাখার সুবিধার কারণেই মানুষ বিড়াল বেশি পছন্দ করছে।
তবে কুকুরের জনপ্রিয়তাও বেড়েছে, যদিও তা বিড়ালের মতো এত দ্রুত নয়। যাদের পর্যাপ্ত জায়গা আছে এবং খরচ বহন করতে পারেন, তারা কুকুরও পুষছেন।
যেমন—গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায়, যেখানে বাসিন্দাদের বাড়ি বড় এবং আয় বেশি, সেখানে গুলশান সোসাইটি লেক পার্ক কর্তৃপক্ষ পোষা প্রাণীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি করেছে। নিবন্ধিত সদস্যরা নির্দিষ্ট সময়ে পার্কে তাদের কুকুর নিয়ে হাঁটতে পারেন।
বাংলাদেশে কেবল বিড়ালের খাবারের (ক্যাট ফুড) বাজারই বর্তমানে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার। এর মধ্যে ৪০০ কোটি টাকার খাবারই আমদানি করা হয়।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে প্রায় ৩২ হাজার ১৫৬ টন ক্যাট ফুড আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে চীন থেকে (১৭,৭৩৮ টন)। এরপর রয়েছে থাইল্যান্ড (৭,৪১৮ টন) এবং তুরস্ক (৬,৭৪০ টন)। অল্প পরিমাণ খাবার ফ্রান্স ও ভারত থেকেও এসেছে।
টিকার বিষয়েও মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। এখন সচেতন মালিকেরা রেবিস (জলাতঙ্ক) এবং ফ্লুর মতো ভ্যাকসিনগুলো নিয়মিত দেন।
সাবরিনা জানান, 'কোর ভ্যাকসিন বা জরুরি প্রতিষেধক হিসেবে জলাতঙ্ক আর ফ্লু-এর টিকা দেওয়াটা একরকম বাধ্যতামূলকই।'
তিনি বলেন, 'ফ্লুর টিকাটি মূলত পাঁচটি টিকার সংমিশ্রণ, যা বছরে একবার বা দুবার দিতে হয়।'
একটি ফ্লু টিকার দাম ৮০০ থেকে ১,৫০০ টাকা এবং রেবিস টিকার দাম ২০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। সরকারি হাসপাতালে এগুলো কম দামে পাওয়া যায়।
বিড়ালকে স্পে বা নিউটার (প্রজননক্ষমতা নষ্ট করা) করার প্রবণতাও বেড়েছে। কারণ প্রজননচক্র এলে বিড়াল আগ্রাসী হয়ে ওঠে। সাবরিনা বলেন, 'এমনটি প্রতি মাসেই হয়।' শুধু আচরণের পরিবর্তনই নয়, একটি মা বিড়াল প্রতিবার ৩-৪টি বাচ্চার জন্ম দেয়। ঘন ঘন গর্ভধারণের ফলে বিড়ালের স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়ে। 'তাই এই পরিস্থিতি এড়াতে চাইলে পোষা বিড়ালকে স্পে বা নিউটার করিয়ে নেওয়াটাই সবচেয়ে ভালো সমাধান', সাবরিনা বলেন।
বেসরকারি ক্লিনিকে পুরুষ বিড়ালকে নিউটার করতে ১,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকা এবং স্ত্রী বিড়ালকে স্পে করতে ১,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকা খরচ হয়। সরকারি হাসপাতালে সাধারণত এ সেবা দেওয়া হয় না, ফলে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোই একমাত্র ভরসা।
বিড়ালকে ক্লিনিকে নেওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো কৃমিনাশক ওষুধ দেওয়া। বিড়ালের শরীরে কৃমির উপদ্রব খুব সাধারণ বিষয় হওয়ায় এটি একটি অত্যন্ত জরুরি প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা। এটি বিড়ালের শরীর থেকে কৃমি দূর করে খাবারের সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করে, স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং বিড়াল থেকে মানুষের শরীরে কৃমি ছড়ানোর ঝুঁকি কমায়।
সাবরিনার মতে, মানুষের চিন্তাভাবনায় এখন বড় পরিবর্তন এসেছে। শুধুমাত্র রোগ বা বিপদে পড়লে চিকিৎসার বদলে, বিড়ালের স্বাস্থ্যকে তারা এখন নিয়মিত দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, 'এটা খুবই ইতিবাচক যে মানুষের এখন পোষা প্রাণীর যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে যথেষ্ট ধারণা হয়েছে। তারা নিজের সন্তান বা পরিবারের সদস্যের মতোই বিড়ালের খেয়াল রাখছেন।'
তবে বিড়ালের খাবারের ব্যাপারে সতর্ক করে সাবরিনা বলেন, 'বাজারের রেডিমেড বিড়ালের খাবার কিন্তু খুব একটা স্বাস্থ্যকর নয়, বিশেষ করে বিড়াল যদি পুরোপুরি সেটির ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।'
বাজারে প্রচলিত মটরদানার মতো শুকনো খাবারগুলোতে ক্যালরি অনেক বেশি থাকে কিন্তু পানির পরিমাণ থাকে খুবই কম। ফলে দীর্ঘদিন এগুলো খাওয়ালে বিড়ালের স্থূলতা, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং মূত্রনালীর নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাই সাবরিনার পরামর্শ, 'বিড়ালকে সাধারণ ঘরের খাবার দেওয়াই উচিত, আর বাজারের প্যাকেটজাত খাবার মাঝেমধ্যে দেওয়া যেতে পারে।'
