সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল: স্কুল অভ ট্রপিক্যাল মেডিসিন থেকে ‘কুকুর কামড়া হাসপাতাল’
ঢাকার মহাখালী রেলগেট হয়ে 'সাত তলা' ব্যস্ত সড়ক পেরিয়ে একটু সামনের দিকে এগোলেই চোখে পড়ে জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট এর প্রবেশ গেইট। সেখান থেকে রিকশাযোগে কিছুটা ভেতরের দিকে গেলেই দেখা মেলে সাততলা ভবনটির। চারপাশে ঘিঞ্জি বসতি, সরু অলিগলি, কাঁচাবাজার, ছোট ছোট দোকানপাট আর মানু্ষের অবাধ চলাচলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই দালানটি স্থানীয়দের কাছে বেশ পরিচিত। তবে ঠিক নিজের আসল নামে নয়!
বরং 'কুকুর কামড়া হাসপাতাল', 'সাততলা', 'সাততলা বস্তি', কিংবা 'কুকুর-বিলাইয়ের মেডিকেল' নামেই প্রসিদ্ধ এটি। এমনকি রিকশাওয়ালা বা অন্য কোনো গাড়ির চালককেও যদি এই নামের বাইরে অন্যকিছু বলা হয় তবে ভুল পথে যাওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল।
স্থানীয় অনেক দোকানির মতে রেলগেট থেকে যে সাত তলা রাস্তা ধরে এই হাসপাতালে আসতে হয়, তার নামকরণও এই ভবনকে কেন্দ্র করে। এর কারণ পুরো মহাখালীজুড়ে সে সময়ে সবচেয়ে উঁচু ভবন ছিল এটি। ফলে মানুষের কাছে এই স্থানের নাম সাত তলা নামেই অধিক পরিচিত।
বলছিলাম মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কথা। ১৯৭২ সালে 'সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল' নামে যাত্রা শুরু হলেও এটির প্রতিষ্ঠাকাল ছিল আরও আগে। তবে তখন বর্তমান নামে নয়, বরং প্রসিদ্ধ ছিল অন্য নামে।
ব্রিটিশ আমলের দিকে মহাখালীর এই এলাকায় কোনো বসতি ছিল না। বরং চারপাশজুড়ে ছিল বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার গুরুত্বও বাড়তে থাকল। তখন অবশ্য ঢাকায় অনেক লোকের বসতি। বিভাজনের সময় বিপুল সংখ্যক মানুষের স্থানান্তর ও শরণার্থী আগমনের ফলেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময়ে বিশুদ্ধ পানির অভাব ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার সংকট হলো। এর ফলে ঢাকা সহ অনেক জায়গায় কলেরা, গুটিবসন্ত ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলো।
সে সময়ে মহাখালীর এই খোলামেলা, প্রশস্ত স্থানের কথা মাথায় রেখে একটি বিশেষ হাসপাতাল করার পরিকল্পনা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল কলেরা, গুটি বসন্ত, প্লেগ, টাইফয়েড, কালাজ্বরের মতো ভয়ংকর সংক্রামক রোগে আক্রান্ত মানুষদের আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া, যাতে রোগ বড় পরিসরে ছড়িয়ে না পড়ে।
তখন জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ ছিল সংক্রামক রোগ। তাছাড়া চিকিৎসা ব্যবস্থাও ছিল বেশ সীমিত। মিটফোর্ড হাসপাতালে সংক্রামক রোগের জন্য চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা থাকলেও তাতে বড় আকারের কোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ছিল বেশ কঠিনতর কাজ। ফলে ঢাকার জন্য আলাদা করে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীদের রাখার জন্য একটি হাসপাতাল নির্মাণের ভাবনাই ছিল অত্যন্ত যুগপোযোগী।
এমন চিন্তা থেকেই সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতলের প্রতিষ্ঠা হওয়া। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৬ সালে 'স্কুল অভ ট্রপিক্যাল মেডিসিন' নামেই মূলত এই হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত 'পূর্ব পাকিস্তানে স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ' বইয়ে সে সময়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থা-সংক্রান্ত কিছু বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হয়।
বইটিতে উল্লেখ করা হয়, 'পাকিস্তানের সৃষ্টির সময় এ-দেশের স্বাস্থ্যমান ছিল খুব নিচু। রোগের প্রাদুর্ভাব ছিল বেশি, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় ডাক্তার, নার্স ও হাসপাতালের সংখ্যা ছিল খুব কম। কাজেই রোগের চিকিৎসার উপযুক্ত ব্যবস্থা ছিল না। হিসাব করে দেখা গেছে যে, দুনিয়ার উন্নত দেশগুলির তুলনায় পাকিস্তানে বয়স্কদের মৃত্যুহার ছিল দ্বিগুণ, আর শিশুদের মৃত্যুহার ছিল পাঁচগুণ।
'...এ সম্বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবলম্বনের জন্য ১৯৪৭, ১৯৫১ এবং ১৯৫৬ সালে নিখিল পাকিস্তান স্বাস্থ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এইসব সম্মেলনের সুপারিশ অনুযায়ী সারা দেশে নতুন নতুন হাসপাতাল ও ডিসপেনসারী, চিকিৎসা কলেজ ও স্কুল, স্বাস্থ্য হাসপাতাল, মাতৃসদন ও শিশুকল্যাণকেন্দ্র, স্যানিটারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মেডিকেল গবেষণাগার ইত্যাদি গড়ে ওঠে। ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা ইত্যাদি রোগ-নিরোধের পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৫৫-৬০) এসব কার্যক্রমের উপর জোর দেওয়া হয় এবং এতে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হয়।'
প্রদত্ত তথ্য থেকে অনুমান করা যায় যে, অন্যান্য মেডিকেল গবেষণাগারের মত স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের পরিধি, সুযোগ-সুবিধাও আগের চেয়ে বাড়ানো হয়। ফলে সংক্রামক ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা, গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির ক্ষেত্রে এটি দেশের প্রধান কেন্দ্রগুলোর একটি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এই জৌলুস বেশি দিন টিকল না।
১৯৬৫ সালে 'স্কুল অভ ট্রপিক্যাল মেডিসিন'-এর শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও প্রসারিত ও উন্নত করার লক্ষ্যে ইনস্টিটিউট অভ পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিকেল রিসার্চ (আইপিজিএমআর) প্রতিষ্ঠিত হলো। লোকমুখে এটিই পরবর্তীতে পিজি হাসপাতাল নামে পরিচিত হতে লাগল।
একদিকে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল (আইডিএইচআই) ছিল মূলত রোগীর সেবা ও আইসোলেশন-কেন্দ্রিক একটি হাসপাতাল, যার ভিত্তি ছিল সংক্রামক রোগের চিকিৎসা।
অন্যদিকে আইপিজিএমআর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এসব ব্যাধির মতো বিষয়গুলির ওপরই গবেষণা ও উচ্চতর ডিগ্রি প্রদান। এতে করে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের একাডেমিক ভূমিকা পুর্বের তুলনায় কমতে থাকলো।
অথচ একটা সময় পর্যন্ত এই হাসপাতাল রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি সংক্রামক ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগবিষয়ক জ্ঞানচর্চার এক প্রাণকেন্দ্র ছিল। জানা যায়, হাসপাতালটির ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় ছিল সেই সময়, যখন দেশের নানা প্রান্ত থেকে চিকিৎসকেরা উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে সেখানে আসতেন। গবেষকেরা রোগের উৎস ও বিস্তার নিয়ে কাজ করতেন, আর নতুন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে চলত অনুসন্ধান।
মোদ্দাকথা, এই দেশের জলবায়ু ও পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত রোগগুলোকে বুঝতে, নিয়ন্ত্রণ করতে এবং কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
তবে ১৯৯৮ সালে আইপিজিএমআরকে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিয়এসএমএমইউ) রূপান্তরিত করা হলো, তখন এটি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াল। এর কারণ ছিল শেখ মুজিব মেডিকেল হওয়ার কারণে এটি অনেক শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম হারিয়ে ফেলে।
তবুও এই দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা ছিল এই হাসপাতালের। এমনকি সংক্রামক রোগের জন্য এটি ধীরে ধীরে মানুষের জন্য ভরসার স্থান হয়ে দাঁড়ায়। এখনও দেশে চলমান হামের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে এটি। সীমিত শয্যার এই হাসপাতালে এ বছরই ২-৩ হাজারের অধিক হামে আক্রান্ত শিশু চিকিৎসাধীন ছিল।
অথচ এখনও দেশের বিশাল একটি জনসংখ্যার কাছে এই হাসপাতাল নিয়ে তেমনভাবে জানাশোনা নেই বলে মত হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা.আরিফুল বাসারের। চার বছর ধরে এই হাসপাতালে কর্মরত আছেন তিনি। এছাড়াও উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো বাংলাদেশে ইনফেকশাস ডিজিজে ফেলোশিপ করা ডাক্তারদের তালিকায় তিনিই প্রথম।
দেশের এই বিশেষায়িত হাসপাতালের ভেতর বাহিরের নানা বিষয়ে জানতে কথা বলেছিলাম তার সঙ্গে।
'সবাই জলাতঙ্কের হাসপাতাল মনে করে'
কথা প্রসঙ্গে আরিফুল বাসার জানালেন, 'শুরুর দিকে এখানে জলাতঙ্গের রোগীর সংখ্যা বেশি আসত বলে অনেকেই মনে করতে শুরু করেন এটি শুধু জলাতঙ্কের হাসপাতাল। তাছাড়া র্যাবিস ভ্যাকসিন দেওয়া হয় বলে মানুষের মধ্যে এমন ধারণা আরও পাকাপোক্ত হয়। সহজ করে বললে বেশিরভাগ মানুষ এটাকে কুকুরের হাসপাতাল নামেই চেনে। এর বাইরে এখানে কোন কোন রোগের ট্রিটমেন্ট হয়, তা অনেকের কাছে সেভাবে স্পষ্ট নয়।'
তিনি উল্লেখ করেন, হাম, এইডস, জলবসন্ত, ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া, কলেরা, কালাজ্বর, ডিথরেরিয়া, ধনুষ্টংকার, নিউমোনিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিস, রুবেলা, হুপিংকাশি, ভাইরাল হেপাটাইটিস ও মামস ছাড়াও কোভিডের মত নানান সংক্রামক রোগের চিকিৎসা হয় এই হাসপাতাল
যেমন এইচআইভি রোগীদের কথাই ধরা যাক। এই রোগের জন্য সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল আলাদা করে প্রসিদ্ধ। শুধু এখানেই তাদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দেওয়া হয়। এছাড়া হাসপাতালের তৃতীয় তলাটি এইচআইভি রোগীদের জন্য বিশেষভাবে বরাদ্দ। দেশের অন্য কোথাও এই সুবিধা নেই বলে মত ডা. বাসারের। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবার জন্যই আছে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা ।
সে বিষয়ে কিছুটা আন্দাজ করা গেল তিন বছরের শিশু মিতুমণিকে (ছদ্মনাম) দেখে। নানি হালিমা খাতুনের (ছদ্মনাম) কোলে নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে আছে সে। হাসপাতালের এক কোণে বসে থাকা এই বৃদ্ধার চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ।
কথা বলতে গিয়ে হালিমা জানান, মাত্র ১৪ দিন আগে এইডসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তার মেয়ে, অর্থাৎ মিতুমণির মা। এর আগে একই রোগে প্রাণ হারিয়েছে বড় নাতনি। এখন পরিবারের শেষ সম্বল ছোট্ট মিতুমণিও এইচআইভি সংক্রমণের সঙ্গে লড়ছে।
মা-হারা শিশুটিকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন নোয়াখালী থেকে। সঙ্গে রয়েছেন তার স্বামী। নানা-নানি মিলে গত ১০ দিন ধরে মিতুমণির চিন্তায় অস্থির।
তবুও সবকিছু হারিয়ে হালিমার চোখে এখনো আশার আলো। কারণ চিকিৎসকেরা তাকে জানিয়েছেন, নিয়মিত চিকিৎসা চললে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে মিতুমণি।
হালিমা বলেন, 'এই হাসপাতালে এইচআইভির চিকিৎসা অয়, এইডা আমরা আগেত্তে জানতাম না। প্রথমে মাইয়াডারে লই গেছিলাম কুমিল্লায়। হেইখানের এক ডাক্তার আমগো ঢাকার এই হাসপাতালের কথা কইছে। ওই ডাক্তারের কথাত্তেই শেষ ভরসা ধইরা এইহানে আইছি।'
এইচআইভি রোগীদের প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা দিয়েই চিকিৎসা করানো হয় বলে জানান আরিফুল বাসার।
এছাড়াও বর্তমানে র্যাবিস, টিটেনাস ও হামে আক্রান্ত রোগীরাই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। তবে এসবের বাইরে যেকোনো জ্বর, যেমন ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, টাইফয়েড, ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া ও চিকেনপক্সের রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থাও আছে এই হাসপাতালে। তবে হাম ব্যতীত বর্তমানে এইচআইভি রোগীরাই বেশি ভর্তি আছেন। তাদের বলা হয় পিএলএইচআইভি পেশেন্ট (পিপল লিভিং উইথ এইচআইভি)। এই হাসপাতাল ছাড়া দেশের আর কোনো হাসপাতালে এই ধরনের রোগী ভর্তি করানো হয়না
আবার কালাজ্বর ও ম্যালেরিয়া রোগীদের আসার কথাও উল্লেখ করেন ডা. বাসার। তিনি বলেন, যদিও বাংলাদেশে এ দুই রোগের প্রকোপ আগের তুলনায় বেশ কম বলা চলে। তবুও বছরে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ জন কালাজ্বর রোগী শনাক্ত হয়। আর প্রায় সময় ৪-৫ জন এমন রোগী থাকে। তাদের মধ্যে জটিল অবস্থার কালাজ্বর রোগীদের চিকিৎসা এই হাসপাতালেই দেওয়া হয়। একইভাবে জটিল ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীদেরও এখানে ভর্তি করে চিকিৎসা করা হয়।
আবার হাসপাতালের বিভিন্ন তলা নির্দিষ্ট রোগী ও চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য বরাদ্দ। এই যেমন, দ্বিতীয় তলায় রয়েছে আইসোলেশন ইউনিট, যেখানে উচ্চ সংক্রমণ ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের আলাদা রাখা হয়। বর্তমানে হামের রোগীদের সেখানে রাখা হচ্ছে।
তৃতীয় তলায় চলে এইচআইভি রোগীদের চিকিৎসা। চতুর্থ তলায় রয়েছে টিটেনাসে (ধনুষ্টংকার) আক্রান্ত রোগীদের জন্য ব্যবস্থা। পঞ্চম তলায় রয়েছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) আর ষষ্ঠ তলায় ভর্তি করা হয় যেকোনো ধরনের জ্বর নিয়ে আসা রোগীদের।
দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ রোগী
তবে প্রকৃত অর্থেই এই হাসপাতালে জলাতঙ্কের জন্য বেশ প্রসিদ্ধ । এই বিষয়টির একটি চিত্র দাঁড় করানো যায় এখানে ভ্যাকসিন নিতে আসা মানুষের সংখ্যা দেখে। ডা. বাসারের ভাষ্যমতে, প্রতিদিন ৭০০-৮০০ রোগী জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিতে আসে এই হাসপাতালে। এদের মধ্যে কেউ সরাসরি, কেউ আবার অন্য হাসপাতাল থেকে রেফার হয়ে।
তবে আশার কথা হলো, দেশে জলাতঙ্কে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগে যেখানে বছরে ১০০-র কাছাকাছি জলাতঙ্কে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫-৫০ জনে।
তবে জলাতঙ্ক নিয়ে মানুষের আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ ডা. আরিফুল বাসারের। এসব রোগীদের ক্ষেত্রে কঠিন সত্য হলো একবার এই রোগ হলে বাঁচা প্রায় অসম্ভব।
'আমাদের এখানে ৩-৪ জন সারভাইভ করেছে। কিন্তু পরে ডিসেবল হয়ে গেছে। তবে আগে জলাতঙ্ক রোগী এখানে এত বেশি ছিল যে এখনো কোথাও এমন রোগী পাওয়া গেলে আমাদের এখানে রেফার করে দেওয়া হয়। অথবা কেউ নিজ দায়িত্বে খবর নিয়েই এখানে চলে আসে। কারণ এখানে আসলেই এদের জন্য ভালো চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা আছে,' বলেন তিনি।
সেবার সুব্যবস্থার কথা শোনা গেলো মো. রাফির মুখেও। তিনি এসেছেন জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিতে। সন্তুষ্ট চিত্তে তিনি বলেন, '১০ টাকা দিয়ে এত দ্রুত সমাধান পাওয়া যায়, সেটা হয়তো কেউ বিশ্বাস করবে না। আমিও আসলে জানতাম না এই হাসপাতালের ব্যাপারে। আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারি। দেখলাম আমার মতো আরও অনেকেই এখানে এসেছেন, যারা শুধু ভ্যাকসিন নেবেন।'
বাসারের মতে, মানুষ এখন র্যাবিস ভ্যাকসিন নিয়ে বেশ সচেতন। কারণ আক্রান্ত হওয়ার পরে কার্যকর চিকিৎসা প্রায় নেই বললেই চলে। বিশ্বজুড়ে যে অল্প কয়েকজন রোগী বেঁচে ফিরেছেন, তাদের অনেকেই আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি বলে জানান তিনি। এ কারণেই জলাতঙ্ক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এখন পর্যন্ত বড় চ্যালেঞ্জ।
হাসপাতালটি ১০০ শয্যাবিশিষ্ট। ফলে রোগীর তুলনায় হাসপাতালের ধারণক্ষমতা সেভাবে নেই। তাই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা অনেক রোগীকেই ফ্লোরিং করে নিতে হচ্ছে চিকিৎসা সেবা।
তবে মাত্র ১৫ টাকার টিকিটে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পাশাপাশি বিনামূল্যে খাবার ও ঔষধ প্রদানের কথাও জানা গেলো ডা. বাসারের কাছে। যদিও কিছু কিছু ঔষধ বাইরে থেকে কিনে নিতে হয় তাদের।
কথাপ্রসঙ্গে আরিফুল বাসার বলেন, একসময় সংক্রামক রোগবিষয়ক গবেষণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল এটি। সেই ঐতিহ্য এখনো বহমান। এই প্রতিষ্ঠানকে আবারও প্রশিক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। বর্তমানে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রকৃতি, বিস্তার ও চিকিৎসা পদ্ধিতি নিয়ে চলছে গবেষণা।
র্যাবিস নিয়ে একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রস্তুতির কথা জানান তিনি। এছাড়া এই রোগটি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ-এর (আইসিডিডিআরবি) সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। কীভাবে দ্রুততার সঙ্গে র্যাবিস শনাক্ত করা যায়, তার জন্য একটি নতুন ডায়াগনস্টিক টুল উন্নয়নের জন্য গবেষণা পরিচালনা করছে সংস্থাটি।
এছাড়া ভবিষ্যতে আইপিসি (ইনফেকশাস প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল), অর্থাৎ 'সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ' নিয়ে জাইকার একটি প্রকল্প চালু হওয়ার কথাও জানান তিনি। মূলত হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়ার সময় রোগী, দর্শনার্থী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যেন কোনো ক্ষতিকর জীবাণু বা রোগের দ্বারা সংক্রমিত না হন, তা নিশ্চিত করার জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা।
এছাড়া এইচআইভি, মিজেলস এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগের বার্ষিক রোগীর সংখ্যা, রোগের প্রবণতা ও বিস্তার নিয়ে নিয়মিত সার্ভে রিসার্চও চলমান।
হাসপাতালে চালু হয়েছে সংক্রামক রোগ নিয়ে পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণও। হাসপাতালের নিজস্ব চিকিৎসকদের পাশাপাশি আইসিডিডিআরবি, আইইডিসিআর ও দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের গবেষক ও চিকিৎসকেরা এখানে এসে গবেষণা ও থিসিসের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
ডা. বাসারের বরাতে জানা গেলো, ইনফেকশাস ডিজিজ বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য এটি দেশের একমাত্র স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে অন্য হাসপাতালের তিনজন চিকিৎসক এখানে সংযুক্ত থেকে সংক্রামক রোগ বিষয়ে পোস্টগ্র্যাজুয়েশন এর প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
তবে কথার এই পর্যায়ে তার কন্ঠেও শোনা গেল হতাশার সুর। তিনি বলেন, 'ইনফেকশাস ডিজিজ' বাংলাদেশে যেভাবে শক্তিশালী একটি বিষয় হয়ে দাঁড়ানোর কথা ছিল এখনো সেভাবে বিশেষায়িত শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। অথচ ভবিষ্যতের মহামারি মোকাবিলায় এই শাখাকে শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। কোভিড-১৯-ই তার প্রমাণ। এটি পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছে, কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে একটি অদৃশ্য ভাইরাস।
সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া হান্টাভাইরাসের কথাও উল্লেখ করেন ডা. বাসার। যদিও তার মতে, এটি ব্যাপক মহামারি হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবু জনস্বার্থে সচেতনতা জরুরি। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায়ও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা জরুরি বলে মত তার।
ট্রাভেল মেডিসিনের ভাবনা
এক্ষেত্রে ট্রাভেল মেডিসিন এর ভাবনা একটি কার্যকরী পদক্ষেপ হতে পারে বলে জানালেন তিনি। বিদেশ ভ্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে 'ট্রাভেল মেডিসিন' বা ভ্রমণ-পূর্ব স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনও বাড়ছে বর্তমানে। ফলে বিদেশ যাওয়ার আগে কোন ভ্যাকসিন প্রয়োজন, কোন রোগ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে, বিদেশি কেউ বাংলাদেশে এলে তার কী ধরনের স্বাস্থ্যসুরক্ষা দরকার এসব বিষয় নিয়ে বিশেষ সেবা চালুর পরিকল্পনাও এই হাসপাতালের রয়েছে বলে জানান ডা. আরিফুল বাসার।
অবশ্য হাসপাতালের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জনবল সংকট, পুরোনো ভবন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কথাও তিনি বলে গেলেন অপকটে। ২০ জন ডাক্তার, ৭৩ জন নার্স ও ২৬ জন স্টাফ নিয়ে শত শত রোগীর সহ হাসপাতাল পরিচালনা শুধু কঠিনতম কাজই নয়, অকল্পনীয়ও বটে। তবুও এত অপ্রাপ্তির ভীড়ে দেশের সংকটকালীন সময়ে এই হাসপাতালের অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠেছে এর আসল শক্তি!
'আমি মনেপ্রাণে মানি যে সংক্রমণ ব্যবস্থাপনায় এখানকার চিকিৎসকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি। যদি আধুনিক সুবিধা ও গবেষণা বাড়ানো যায়, তবে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংক্রামক রোগ গবেষণা ও চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে এই হাসপাতালটি। ঠিক ততটাই সম্ভাবনাময় একটি জায়গা এটি। কিন্তু সেভাবে যত্ন নেই,' বলেন ডা. আরিফুল বাসার।
