তাঁতিবাজারের শেষ স্বর্ণকারেরা
বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল, কিন্তু বউনি হয়নি। এমন দুর্দিনের শুরু একুশ-বাইশ সালে, সোনার দাম যখন পঞ্চাশ হাজার ছিল, চালানো যাচ্ছিল তখনও। এরপর ভরি সত্তরে উঠে গেলে আকাশে মেঘ দেখতে পেলেন গোপাল চক্রবর্তী। কারিগরের জীবন তার ঊনষাট বছরের।
সীতাহার, মানতাশা হারিয়ে গেছে
১৯৬৮ সালে গোপালের বয়স ছিল এগারো। দুষ্টু ছিল, পড়ায় মন ছিল না। বাবা তাই বলেকয়ে তাঁতীবাজারের ৫ নং মার্কেটের এক দক্ষ গড়িত কারিগরের শাগরেদ বানিয়ে দিলেন। যারা গহনার মূল কাঠামোটা গড়ে তাদেরকে বলা হয় গড়িত কারিগর।
হাতের বালার কথা ধরা যাক। সোনাকে গলানোর পর তা চাক্কিতে ঘুরিয়ে পাত তৈরি হওয়ার পরে ভিতরে ছাঁচ ভরে গোল আকার যিনি দেন, তিনি গড়িত কারিগর। এর কাছ থেকে বালাটি যায় নকশা কারিগরের কাছে, তারপর ছিলা কারিগর, তারপর পালিশ কারিগর হয়ে গয়নাটি প্রস্তুত হয়ে যায়। মাঝখানে ঘষা, শুকানো, ঝাড়পোছ করা, মিনা করা, পাথর লাগানো ইত্যাদি আরো কিছু কাজ হয়ে থাকে।
আর এর সবই সেকালে হতো হাতে। চার-পাঁচ হাত ঘুরে আড়াই-তিন ভরির ভারি গয়না তৈরি করতে চার-পাঁচ দিনও লেগে যেত। যন্ত্রপাতিও ছিল সাদামাটা- চিমটা, সাড়াশি, প্লাস, ছেনি, ডালা, ড্রিল, টপনা, নিক্তি, কাঁসলা, খিল্লা, পান সিল, হাতুড়ি, কুঁচি ব্রাশ, যন্ত্রী, শান পাথর, ধোকা, ইত্যাদি।
সে আমলে গয়না যেমন ভারী হতো আবার রকমফেরও ছিল অনেক। মাথা থেকে শুরু করা যাক—টিকলি, টায়রা, মুকুট আর ঝাপটা; কানে ঝুমকা; গলায় সীতাহার, চিকহার, কণ্ঠচিক; হাতে হাতপাটা, মানতাসা, পাঞ্জা, ব্রেসলেট আর ময়ূরপঙ্খী বালা; বাহুতে বাউটি আর নাকে নথ।
এগুলোর মধ্যে সীতাহার ৭ ভরির করলে ভালো দেখাত। মানতাশা আড়াই ভরির কম হতো না। মুকুটও হতো ছয় থেকে সাত ভরির।
ইদ্রিস আলী বেনারসী
সেকালে ভরিতে দুই আনা বাটোয়ারা হতো কারিগরদের মধ্যে। দুই আনার পুরোটাই কিন্তু মজুরি ছিল না। ছয় রতিতে এক আনা হয়। আকার দিতে গিয়ে গড়িত কারিগরের হাত থেকে এক রতি ভাঙারি হয়ে যেত। এভাবে নকশা, ছিলা, পালিশ, গালায়, ঘষায় বাকি পাঁচ রতি ভাঙারি হয়ে হারিয়ে যেত। যে এক আনা বাকি থাকত, তা মজুরি হিসেবে বাটোয়ারা করে নিতেন কারিগরেরা।
এছাড়া মহাজন বেতন দিতেন প্রতি মাসের হিসাব করে তিন মাস বা ছয় মাসের একসঙ্গে। কখনো কখনো হালখাতার সময় পুরো বছরের বেতন দিতেন। এতে কারিগররা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ একসঙ্গে হাতে বেশ কিছু টাকা এলে ঘরের চাল সারানো বা মেয়ে জামাইকে ঘড়ি-সাইকেল দেওয়ার সুযোগ মিলত। সবচেয়ে বেশি বেতন পেতেন গড়িত কারিগর।
কিন্তু গোপালের গড়িত কাজ ভালো লাগছিল না। তার ভালো লাগত কাটিংয়ের কাজ। বাবাকে জানালে তিনি তখনকার কাটিং মাস্টার কুমারটুলির আবুল কাশেমের ছেলে ইদ্রিস আলীর কাছে নিয়ে গেলেন।
দেশ ভাগের কালে আবুল কাশেম পূর্ব পাকিস্তানে আসেন বেনারস থেকে। সূক্ষ্ম ও মিহি কাজ করতে পারতেন, বোম্বের (এখনকার মুম্বাই) কারিগররা যেমন পারেন। গোপাল তিন বছর প্রশিক্ষণ নেন ইসমাইলের কাছে। পরের তিন বছর আবার তাঁতিবাজারে। আর এবারই প্রথমবারের মতো খাবার খরচা বাবদ দিনে টাকা পেতে থাকলেন গোপাল, কারণ এখন তিনি আর শিক্ষানবীশ নন, কারিগরের সহকারী।
সাহা আর ঘোষেদের বিয়ে মানেই গয়না
তখন তাঁতিবাজারের স্বনামধন্য কারিগর ছিলেন পাঁচশনাথ পাল, অরুণ পাল প্রমুখ। স্টোন হাউজ, পোদ্দারের দোকান আর শো রুম মিলিয়ে পুরো তাঁতিবাজারে দোকান ছিল দুইশ থেকে তিনশ। অভিনেতা প্রবীর মিত্রের বাসভবন মিত্র ভবনের আশপাশে ছিল দোকানগুলো। নিম্নবিত্তের মানুষেরাও তখন দু-চার ভরি গয়না কিনে ঘরে রাখতেন।
গোপাল বললেন, "বিশেষ করে ঢাকাইয়া কুট্টিরা গয়না বানাত বেশি। জড়োয়া সেটের প্রতি তাদের আগ্রহ ছিল। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ে মানেই ছিল সোনার গয়না। বিশেষ সাহা ও ঘোষরা ১০-১৫ ভরি গয়না দিয়ে মেয়েকে সাজিয়ে দিত। আশি-নব্বইয়ের দশকে সদরঘাটের লঞ্চ মালিক, ইসলামপুরের কাপড় ব্যবসায়ী, শ্যামবাজারের হলুদ-মরিচ ব্যবসায়ীরা অনেক গয়না বানিয়েছে।"
তখন তাঁতিবাজার ছাড়া সোনার গয়নার শো-রুম ছিল মূলত বায়তুল মোকাররম আর নিউমার্কেটে। আরো ছিল ইসলামপুরের মুন সিনেমা হলের কাছ থেকে বাবুবাজার পর্যন্ত।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সোনার দাম বেড়েছে আস্তে আস্তে। আড়াই থেকে চার হয়েছে তারপর পাঁচ, আরো পরে সাত হাজার টাকা। নব্বই দশকের শেষ পর্যন্তও দাম মোটামুটি দশ হাজার টাকার মধ্যে ছিল। ২০০৫ সালে ছিল ১২ থেকে ১৩ হাজার। ২০১০ সালে একটি বড় জাম্প দেখা যায়, এক ভরি সোনার দাম তখন ৪২ হাজার টাকা, তারপর ২০১৫ সালে ৪৫ হাজার টাকা।
করোনার পর দাম বাড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে
করোনাকাল থেকে পরের দুই বছর সোনার ভরি ছিল ৭০ হাজার টাকা। এই সময়ে সোনার গয়না তৈরি ও সঞ্চয়ের প্রবণতায় বিরাট পরিবর্তন আসে। একটি ঐতিহ্যবাহী রীতি স্রেফ ব্যবসায় পরিণত হয়। গৃহিনীরা স্বর্ণ বিক্রি করে দিতে থাকেন, অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা সেগুলো কিনে নিতে থাকেন। জমির মতো স্বর্ণও হয়ে ওঠে বিনিয়োগের বড় মাধ্যম।
২০২৩ সালের জুলাইতে ১ লাখ টাকা অতিক্রম করে যায় স্বর্ণের দাম। এরপর থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে এখন ২২ ক্যারেট সোনার দাম আড়াই লাখ টাকা প্রায়।
পরিবর্তন এসেছে সোনার গয়না তৈরির উপকরণেও যেমন কাটিংয়ের জন্য এখন লেজার মেশিন ব্যবহৃত হচ্ছে, যা ২০ জন কারিগরের সমান কাজ একই সময়ে করতে পারে। নতুন আরো সব উপকরণের মধ্যে আছে রিং স্টিক, গোল্ড ওয়্যার কাটার, সাইজ মেজারিং স্কেল, ওয়্যার থিকনেস গেজ মিটার, হ্যান্ড লাইটার, মিলিমিটার মাপার ইনসাইজ, ওয়িং মেশিন, ইলেকট্রিক চুল্লি ইত্যাদি।
গোপাল বললেন, "শুনেছি দুবাই, সিঙ্গাপুরে পুরো গয়না তৈরি হয় মেশিনে। একদিকে সোনার বার দিয়ে দিলে গলে, পালিশ হয়ে, কাটিং শেষে একদম গয়না হয়ে বের হয়। আমাদের দেশের শো রুমগুলোতে এখন বাংলা (ঐতিহ্যবাহী) গয়নার চেয়ে বিদেশি গয়নাই বেশি রাখা হয়।"
আড়াই হাজারের বেশি স্বর্ণের দোকান এখন তাঁতিবাজারে। স্বর্ণ ভবন, নক্ষত্র টাওয়ার, আহাদ ভবনে অনেকগুলো করে স্বর্ণের দোকান।
বাংলা গয়নায় খরচ বেশি
কারিগরের সহকারী হয়ে গোপাল চক্রবর্তী যে দোকানে কাজ করতেন এখন তিনি সেটির মহাজন। তাঁতিবাজার মসজিদসংলগ্ন ৩৪ নম্বর ডনখানা গলিতে দোকানটি। ভবনের সম্মুখভাগে আগে কুস্তিগীরদের আখড়া ছিল, তাই নাম হয়েছে ডনখানা। আর পিছনদিকে ছিল আরজু বোর্ডিং।
স্বর্ণ বিক্রি বা কিনতে আসা দূর দূরান্তের লোকেরা এ বোর্ডিংয়ে রাত কাটিয়ে দিনের বেলা ফিরতি যাত্রা করতেন। এখন পুরো ভবনটি কারিগরদের। কারখানাও আছে অনেকগুলো। কারখানা হলো ওয়ান স্টপ সার্ভিস, যেখানে একজন মহাজনের অধীনে সব রকম কারিগর থাকেন। শো-রুমগুলো কারখানায় কাজ দিতে পছন্দ করে।
বিদেশি গয়নায় কেন বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন ক্রেতারা?
গোপাল চক্রবর্তী বললেন, "আমাদের মতো হাতের কাজ কিন্তু ওরা জানে না। ওদের সব নকশা একই রকমের। ক্রেতার পছন্দমতো নকশার গয়না তৈরি করে দিতে পারি আমরা। এতে সময় ও অর্থ দুটিই বেশি লাগে। এই কারণে অনেক কাস্টমার রেডিমেড গয়না কেনেন।"
"আরো কারণের মধ্যে আছে বিদেশি গয়নার ওজন ও গুণগতমান (হলমার্ক) অ্যাকুরেট থাকে। আমাদের এখানে কখনো কখনো কিছু এদিক-ওদিক হয়ে যায়," বললেন গোপাল।
ফাঁকির সুযোগ আছে
গোপাল চক্রবর্তীর পাশের দোকানের আরেক কারিগর নিখিল রায় যার ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতা এ পেশায়, স্বীকার করলেন, "কিছু ফাঁকি-ঝুঁকির সুযোগ থাকে সনাতন পদ্ধতিতে। এখন যেহেতু বিকল্প তৈরি হয়েছে, মজুরিও গুনতে হয় না, তাই বিদেশি গয়নায় আগ্রহ বাড়ছে।"
আরও করলেন, "এ পেশা থেকে অনেক কারিগরই অন্য পেশায় চলে গেছে, কারণ কাজ কমে গেছে। কেউ মুদি দোকান করে, কেউ কাপড়ের দোকানে সেলসম্যান, কেউ আবার বিদেশে চলে গেছে।"
কিন্তু দোকানের সংখ্যা তো অনেক বেড়েছে, তাহলে কারিগরও বৃদ্ধি পাবার কথা, জানতে চাইলে নিখিল রায় বললেন, "দোকানে তো কাজ করে সেলসম্যানরা, আর দোকান মালিক হলেন ব্যবসায়ী। কিছু শিক্ষানবীশ কারিগর এসেছে সত্যি, তবে সংখ্যায় খুব বেশি নয়। আসলে এটা এখন পুরোদস্তর ব্যবসা, আগের মতো সৌখিনতা বা আচার-ব্যবহার নেই।"
মিরপুর-১০ নম্বর শাহ আলী মার্কেটের রুনা জুয়েলার্সের আবুল কালাম দুবাইয়ে ড্রাই ডকের সিনিয়র অফিসার ছিলেন। দেশে ফিরে গয়হার শোরুম দিয়েছেন।
তিনি বললেন, "দুবাইয়ের সব গয়না মেশিনে তৈরি হয়, সে কারণে ফিনিশিং ভালো। আর হলমার্ক করা বলে সেইফ। তবে আমাদের কাজ দেখে ওরা চমকে ওঠে। আমাদের কারিগররা আট আনায় যে কাজ তুলতে পারে, ওরা দশ আনায় সে কাজ তুলতে হিমশিম খেয়ে যায়।"
গার্মেন্ট কর্মীরা গয়না কিনতেন
মিরপুর-১০ নম্বর ফলপট্টি মসজিদের উল্টোদিকের ভবনে বেশ কিছু গয়না তৈরির কারখানা আছে। তারমধ্যে একটি ছোট্ট কারখানায় কাজ করেন রাম রাজবংশী। তিনি পানপাতা লকেট বানানোয় দক্ষ।
মিরপুর-১ নম্বরের মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের এক শোরুম থেকে ৩০টি লকেট বানিয়ে দেওয়ার ফরমায়েশ পেয়েছেন তিনি। এগুলো এক থেকে দেড় আনার হয়ে থাকে। এটুকুর মধ্যেই নকশা ফুটিয়ে ছিলাই ও পালিশ করে দিতে হয়।
রাম বললেন, "কাস্টমারের কাছ থেকে ডাইরেক্ট অর্ডার পেলে আমাদের আয় ভালো হয়। করোনার আগেও কাস্টমার ছিল। বিশেষ করে গার্মেন্টসের নারী কর্মীরা চার আনা, ছয় আনার গয়না বানাতেন। তারা চার মাস বা ছয় মাস ধরে কিছু কিছু সঞ্চয় করে টাকা শোধ করতেন। এখন দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় স্বর্ণ ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে।"
চলে যাওয়াই বুঝি গন্তব্য
এই পরিস্থিতিতে রামের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কতদিন টিকে থাকতে পারবেন? তিনি বললেন, "কাজ শিখতে সময় লেগেছে, কষ্টও করেছি। অন্য কাজ জানি না, যে করে হোক টিকে থাকতে হবে।"
একই প্রশ্ন করেছিলাম গোপাল চক্রবর্তীকেও, দাদা আর কতদিন চালিয়ে নিতে পারবেন? তিনি বলেছেন, "যে কোনোদিন চলে যেতে হতে পারে। বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল দিতে কষ্ট হয়। দোকান খুললেই কিছু না কিছু খরচ আছে। এই হলো পরিস্থিতি। আসলেই চলতে কষ্ট হচ্ছে।"
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির তথ্য অনুযায়ী (২০২৬), একসময় শুধু ঢাকাতেই প্রায় ১৫ হাজার স্বর্ণকার কাজ করতেন। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে সেটি নেমে এসেছে ৪ থেকে ৫ হাজারে। আর তাদের সাথে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী নকশা করা স্বর্ণ তৈরির ধারাও।
ছবি: রাজীব ধর/দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড