সুশান্ত সিং রাজপুতের ম্যানেজারের মৃত্যু মামলার তদন্ত নতুন করে হচ্ছে কেন
ভারত যখন কোভিড-১৯-এর প্রাণঘাতী ঢেউয়ে বিপর্যস্ত, তখন সেলেব্রিটি ম্যানেজার দিশা সালিয়ান তার বাবা সতীশ সালিয়ানকে পুলিশের একটি হেল্পলাইনে ফোন করে জেনে নিতে বলেছিলেন যে তার যাতায়াত করা নিরাপদ হবে কি না।
একটি বিজ্ঞাপন অভিযানের শুটিং নিয়ে তিনি খুব উচ্ছ্বসিত ছিলেন এবং অগ্রিম পারিশ্রমিক হিসেবে পাওয়া একটি চেকের ছবিও তার মা-বাবাকে দেখিয়েছিলেন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তিনি মা-বাবাকে বলেছিলেন, দুই দিনের মধ্যেই তিনি ফিরে আসবেন।
৮ ও ৯ জুনের মধ্যবর্তী রাতে সতীশ সালিয়ানকে পুলিশ একটি হাসপাতালে ডেকে পাঠায়, যেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন যে তার একমাত্র সন্তান আর বেঁচে নেই। পুলিশ জানায়, পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মুম্বাইয়ের একটি ভবনের ১২ তলা থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে তার।
হাসপাতালে উপস্থিত দিশার বন্ধুরা জানান, তিনি মদ্যপান করেছিলেন এবং দুর্ঘটনাবশত নিচে পড়ে যান।
পরে পুলিশ জানায়, তদন্তে দেখা গেছে এটি একটি আত্মহত্যার ঘটনা ছিল।
কিন্তু চলতি মাসের শুরুর দিকে, মুম্বােই হাইকোর্ট দেশটির কেন্দ্রীয় পুলিশ সংস্থা — সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (সিবিআই) মামলাটি পুনরায় চালু করে দিশার মৃত্যুর ঘটনাটি নতুন করে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছে।
দিশার বাবা সতীশ সালিয়ানের গত বছর দায়ের করা একটি রিট আবেদনের পর আদালতের এই নির্দেশটি আসে। তিনি শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন যে তার মেয়ের মৃত্যু আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনা ছিল না, বরং তাকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছিল।
উক্ত অভিযোগে জড়িত কিছু মন্ত্রী ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদকে বাঁচাতে পুলিশের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আলামত ধ্বংস করেছেন এবং আত্মহত্যার ভুয়া গল্প তৈরি করেছেন—তার এ দাবির কারণে এটি ভারতের অন্যতম আলোচিত মৃত্যুর ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
২ সেপ্টেম্বরের নির্দেশে, বিচারক সারং ভি কোটিয়াল এবং রঞ্জিতসিনহা রাজা ভোঁসলে পুলিশকে কঠোর সমালোচনা করে বলেন, দীর্ঘ ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে দুই ধাপে চালানো এই তদন্তে "অসংখ্য স্পষ্ট বৈপরিত্য ও অসংগতি" রয়েছে।
বিচারকদ্বয় জানান তারা কোনো "মিনি ট্রায়াল" বা বিচার প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন না, তবে "পুলিশের করা এই তদন্ত উত্তরের চেয়ে বরং আরও বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে"।
তারা পুলিশের কাগজপত্র তৈরিতে অহেতুক বিলম্বের বিষয়টি তুলে ধরেন। এছাড়া যে জায়গায় দেহটি পড়েছিল সেখানে কোনো রক্ত না পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে উল্লেখিত আঘাতের চিহ্নগুলো উপর থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার সাথে সংগতিপূর্ণ বলে মনে হয় না।
বিচারকগণ তাদের পর্যবেক্ষণে লেখেন, 'আমাদের পক্ষে এটি মেনে নেওয়া কঠিন।'
আদালতের সবচেয়ে বড় সমালোচনার একটি ছিল, পুলিশ ঘটনাটিকে কেবল একটি সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা হিসেবে তদন্ত করেছে এবং কোনো এফআইআর দায়ের করেনি।সতীশ সালিয়ানের অভিযোগগুলো এ পর্যন্ত কেবল দাবি পর্যায়েই রয়েছে, তবে এগুলোই সিবিআই-এর নতুন তদন্তের মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে। সংস্থাটি গত সপ্তাহে তার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে একটি এফআইআর নথিভুক্ত করেছে।
বিবিসি এ এফআইআর পর্যালোচনা করেছে এবং মামলাটির আদালত আদেশ পড়ে দেখেছে। সতীশ সালিয়ানের অভিযোগের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, মৃত্যুর সময় দিশা 'কোয়ান এন্টারটেইনমেন্ট' নামে একটি সেলেব্রিটি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিতে কাজ করছিলেন এবং বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন।
এতে আরও বলা হয়, 'তিনি কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির কিছু আপত্তিকর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন। তিনি সেই তথ্য সুশান্তকে দেন, যিনি অজান্তেই তা অন্যদের কাছে প্রকাশ করে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত সেই তথ্য পুনরায় ওই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে যায় এবং তাকে নীরব করতেই হত্যা করা হয়।'
সুশান্ত সিং রাজপুত এক ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে দিশার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন। তিনি লিখেছিলেন, 'এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক সংবাদ। দিশার পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা। তোমার আত্মা শান্তিতে থাকুক।'
প্রথমদিকে দিশার মৃত্যুর বিষয়টি অনেকটাই অলক্ষিত থেকে যায়, যতক্ষণ না এর এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে স্বয়ং সুশান্ত সিং রাজপুতকে তার নিজের বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
পুলিশ সুশান্তের মৃত্যুকেও আত্মহত্যার ঘটনা হিসেবে ঘোষণা করে এবং জানায় যে তিনি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন, যার জন্য তার চিকিৎসাও চলছিল।
কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর, সুশান্তের বাবা তার প্রেমিকা অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে সুশান্তকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ তুললে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি তার ছেলের কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকার বিষয়টিও অস্বীকার করেন।
ব্যাপক ক্ষোভের মুখে সুশান্তের মামলাটিও সিবিআই-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। সিবিআই গত বছর মামলাটি বন্ধ ঘোষণা করে জানায়,, সুশান্ত সত্যিই আত্মহত্যা করে মারা যান এবং তার মৃত্যুতে রিয়া চক্রবর্তী বা তার পরিবারের কোনো ভূমিকা ছিল না।
সিবিআই-এর কাছে সতীশ সালিয়ান যে এফআইআর দায়ের করেছেন, তাতে তিনি দাবি করেছেন যে দিশা ও সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।
সতীশ সালিয়ান জানান, দিশা ওই অভিনেতার সঙ্গে সাবেক এক মন্ত্রী ও অন্য কয়েকজনের যুক্ত থাকার বিষয়ে "মাদক পাচার, শিশু নির্যাতন ও অন্যান্য বেআইনি কার্যকলাপ সংক্রান্ত অপরাধমূলক ও আপত্তিকর তথ্য" শেয়ার করেছিলেন এবং তারা দুজন এগুলো জনসমক্ষে আনতে একটি সংবাদ সম্মেলন করার পরিকল্পনা করছিলেন।
তিনি আরও জানান, তা প্রতিরোধ করতে এবং জড়িত ব্যক্তিদের রক্ষা করতে একটি সুপরিকল্পিত অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র করা হয়। ভুক্তভোগীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয় এবং পরবর্তীতে অপরাধ ঢাকতে ও অভিযুক্তদের বাঁচাতে আলামত গোপন/জালিয়াতি করে আত্মহত্যার একটি ভুয়া গল্প তৈরি করা হয়।'
আদালত তার আদেশে উল্লেখ করেছে যে, এফআইআর দায়ের করার অর্থ কারো বিরুদ্ধে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্ত রায় প্রদান করা বোঝায় না এবং কোনো তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের বিরুদ্ধে "যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ পোষণের পর্যাপ্ত ভিত্তি" না পাওয়া পর্যন্ত কাউকে অভিযুক্ত হিসেবে গণ্য করা হবে না।
তবে এফআইআর-এ রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় কিছু রাজনীতিক, পুলিশ কর্মকর্তা ও বলিউড অভিনেতাদের নাম থাকায় রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ, অস্বীকার ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দাবির মুখে মামলাটি ভারতের গণমাধ্যমজুড়ে প্রধান খবরের শিরোনাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সতীশ সালিয়ান, যিনি তার মেয়ের জন্য ন্যায়বিচার পেতে ছয় বছর ধরে লড়াই করে যাচ্ছেন, তিনি জানান যে আদালত তার মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পর তিনি "কিছুটা শান্তি" অনুভব করছেন।
তিনি বলেন, 'দিশা ছিল অত্যন্ত মেধাবী, সে পড়াশোনায় ভালো ছিল এবং প্রচুর বই পড়ত। তার হৃদয়টি সোনার মতো খাঁটি ছিল এবং সে ভীষণ পরোপকারী ছিল। সে ছিল আমাদের একমাত্র সন্তান এবং সে আমাদের খুব ভালোবাসত।'
তিনি জানান, তার স্ত্রী দিশার এই মর্মান্তিক মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে বিষণ্নতায় ভুগছেন।
তিনি বলেন, 'আমার মেয়েকে যারা কষ্ট দিয়েছে, আমি তাদের মৃত্যুদণ্ড চাই। যারা তাকে যন্ত্রণা দিয়েছে, তাদেরও এমন যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু হওয়া উচিত। আমার কাছে দিশার ন্যায়বিচার বলতে এটাই বোঝায়।'
