প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমতি পেল রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া (ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি) শুরুর অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা)।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) এ অনুমোদন প্রদান করা হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে এই প্রক্রিয়াকে 'ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি' বলা হয়।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়রা) চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, 'রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য চূড়ান্ত বিদ্যুৎ অনুমোদন অর্থাৎ 'বি-টু' অনুমোদনের বিষয়টি এখন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বি-১ শেষ করে এখন বি-টুতে যাওয়ার সম্মতি দেওয়া হয়েছে এবং এটি শেষ হলে পরবর্তী 'সি' ও 'ডি' ধাপগুলো এগিয়ে নেওয়া হবে।'
সবকিছু মিলিয়ে বি-টু পর্বের কাজ দ্রুত শেষ হবে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'এই বি-টু পর্ব তাড়াতাড়ি শেষ হবে আশা করি। সব মিলিয়ে ধরেন দুই-তিন মাস। এরপর রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। তখন আমরা ৩০০ মেগাওয়াট পাব।'
এ বিষয়ে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান টিবিএসকে বলেন, 'বি-টু ইস্যু হয়েছে। বিষয়টি সহজভাবে বোঝাতে গেলে বলা যায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রথমে পানি গরম করে বাষ্পে পরিণত করা হয়। এরপর সেই বাষ্প দিয়ে টারবাইন ঘোরানো হয় এবং টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।'
তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, 'নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি গরম করার পদ্ধতি কিছুটা ভিন্ন। এখানে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া ঘটিয়ে তাপ উৎপন্ন করা হয়। সেই তাপ দিয়ে পানি গরম ও বাষ্প তৈরি করে টারবাইন ঘোরানো হয়। সহজভাবে বলতে গেলে, তাপ উৎপন্ন করার জন্য নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া শুরু করার যে অনুমোদন বি-টু সাব-স্টেজ হিসেবে চাওয়া হয়েছিল, তার কাজ এখন শুরু হয়ে গেছে। এরপর পরীক্ষা করে দেখা হবে বিক্রিয়াটি সঠিক জায়গায় ও নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী ঘটছে কি না।'
উৎপাদন পর্যায় নিয়ে তিনি স্পষ্ট করে জানান, বি-টু সাব-স্টেজ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর তাপ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং তা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশে পৌঁছালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া যাবে। এতে নির্দিষ্ট দিন বলা কঠিন হলেও আনুমানিক ছয় থেকে ১০ সপ্তাহের মতো সময় লাগতে পারে। এটিকে কেবল লাইসেন্স নয়, বরং পরমাণু শক্তি কমিশন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের প্রক্রিয়ার আওতায় একটি 'অথরাইজেশন' বা অনুমোদন হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রথম ইউনিটের অটোমেটিক প্রেশার রিলিফ সেফটি ভালভের (পিওআরভি/পিওএসভি) জটিলতার কারণে অনুমোদনটি আটকে ছিল। পরবর্তীতে রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল এসে সমস্যার সমাধান করে এবং বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। ফলে আগামী ডিসেম্বরের শেষে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সূত্র জানায়, রূপপুরের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল 'ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি'। বায়রার এই অনুমতির মাধ্যমে রিঅ্যাক্টরে একটি স্থিতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হবে, যা কেন্দ্রটিকে স্থির অবস্থা থেকে সক্রিয় অপারেশনাল পারমাণবিক স্থাপনায় রূপান্তর করবে। ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরকে তার পূর্ণ নির্ধারিত তাপীয় ক্ষমতার এক শতাংশেরও কম শক্তিস্তরে পরিচালনা করে 'ইনিশিয়াল ক্রিটিক্যালিটি'তে নেওয়া হবে। এ সময় রিঅ্যাক্টরের বিভিন্ন সিস্টেম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সরঞ্জাম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, যাতে ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে।
ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ সফল হলে প্রকল্পটি 'পাওয়ার স্টার্ট-আপ' পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এ জন্য বায়রা থেকে ট্রায়াল অপারেশনাল লাইসেন্স নিতে হবে। তখন ধীরে ধীরে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়িয়ে টারবাইন সিনক্রোনাইজেশন এবং জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এই পর্যায়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম ছাড়াও বাইরের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কঠোর প্রযুক্তিগত ও নিয়ন্ত্রক সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন শুরুর পর প্রাথমিকভাবে ৩ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে ২০-৩০ শতাংশে উন্নীত করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়া হবে। এরপর প্রায় ৭-৮ মাস পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলতে পারে।
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে বাংলাদেশ বিশ্বে ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে।
